—নিজস্ব চিত্র।
চোখের সমস্যা ছোট থেকেই ছিল। একটা সময় চেনা পৃথিবীতে পুরোপুরি আঁধার নামে। তিনি থেমে যাননি। প্রতিবন্ধকতার চোখে চোখ রেখে নিজেকে মেলে ধরেছেন অন্য উচ্চতায়। চাকরি করছেন। চলছে নাচের তালিম। গানেরও।
বছর ঊনত্রিশের ওই যুবতীর নাম সপ্তপর্ণী ঘোষ। বাবা-মায়ের সঙ্গে উত্তরপাড়ার শান্তিনগরে থাকেন। ছোটবেলা থেকেই চশমার সাহায্য নিতে হত। তবু, কমছিল দৃষ্টিশক্তি। চিকিৎসার জন্য মেয়েকে ভিন্ রাজ্যেও নিয়ে গিয়েছিলেন ঘোষ দম্পতি। লাভ হয়নি। উত্তরপাড়া প্যারীমোহন কলেজে পড়ার সময় সমস্যা বাড়ে। দৃষ্টিশক্তি চলে যেতে বসে। শেষ পরীক্ষা দিতে হয় ‘রাইটার’ নিয়ে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন। ২০১৮ সালে পাশ করেন।
চোখের সমস্যায় পড়ার উপায় থাকত না। বাবা-মা পড়ে দিতেন। শুনে মুখস্থ করতেন সপ্তপর্ণী। অঙ্কের প্রতিটা ধাপও মাথায় রাখতে হত। এ সবের মধ্যেই কম্পিউটার, ব্রেইলও শেখেন। ক্রমে দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি চলে যায়। এখন চোখের সামনে আলোছায়াটুকু ঘোরাফেরা করে শুধু। আর কিছু ঠাওর হয় না। ২০২০ সালে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে চাকরি পান। ব্যাঙ্কের ‘হেল্প ডেস্ক’ সামলান। বিশেষ সফটওয়্যারের সাহায্যে দিব্যি টাইপ করেন। প্রয়োজনে সাহায্য করেন সহকর্মীরা। যাতায়াত করেন একাই। এর আগে উত্তরপাড়ায় দৃষ্টিহীনদের স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন।
মেয়েবেলা থেকেই নাচের প্রতি আগ্রহ ছিল। পরে পড়ার চাপে ছেড়ে দিতে হয়। বছর তিনেক ধরে আবার নাচের অভ্যাস শুরু করেছেন সপ্তপর্ণী। হিন্দমোটরের একটি প্রতিষ্ঠানে ভরতনাট্যম শিখছেন। পায়ে পা ঠেকিয়ে, হাতে ধরে মুদ্রা শিখিয়ে দেন শিক্ষিকা শর্বরী হালদার। ছাত্রীর একাগ্রতা তাঁকে মুগ্ধ করে। শর্বরীর কথায়, ‘‘ধরুন, সপ্তপর্ণীর নাচ হয়ে গিয়েছে। ওঁকে হয়তো জিজ্ঞাসা করলাম, বাড়ি যাবে কি না। ও নির্ঘাৎ বলবে, ‘অন্যদেরটাও একটু দেখি’। প্রতিবদ্ধকতাকে এমনই হেলায় হারাতে পারে মেয়েটা। ওঁকে নিয়ে গর্ব না করে পারা যায়!’’
একটি সংস্থার হয়ে দুঃস্থ মানুষজনকে সাহায্যেও হাত বাড়িয়ে দেন সপ্তপর্ণী। দিন কয়েক আগে সকলের সঙ্গে গিয়েছিলেন দুঃস্থ ছেলেদের একটি হোমে সাহায্য পৌঁছে দিতে। সংস্থার জন্মদিনে নাচ দেখালেন।
বাবা সুবীরকুমার ঘোষ বেসরকারি বিদ্যুৎ সংস্থায় চাকরি করতেন। অবসর নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘পনেরো বছর আগে চিকিৎসার জন্য মেয়েকে হায়দরাবাদে নিয়ে গিয়েছিলাম। ডাক্তার বলেছিলেন, একটা পর্যায়ের পরে সমস্যা বাড়বে না। কিন্তু সেটা হল না। অপটিক্যাল নার্ভের সমস্যা। তাই, অস্ত্রোপচার বা কর্নিয়া বদল করেও দৃষ্টি ফিরবে না। মেয়ের সবচেয়ে বড় ব্যাপার, মনের জোর। কোনও দিন ভেঙে পড়েনি। ওর গানের গলাও খুব ভাল। নজরুলগীতি শিখছে।’’ মেয়েকে প্রতিনিয়ত লড়াইয়ের সাহস জুগিয়েছেন মা মৌসুমি ঘোষ। দৃষ্টি যখন রীতিমতো ক্ষীণ, তখন মায়ের ইচ্ছেতেই মেয়ের অর্থনীতিতে অনার্স নেওয়া। সবেতেই সফল হয়েছেন সপ্তপর্ণী।
বাবা-মা চান, ভবিষ্যতেও প্রতিবন্ধকতার সব বেড়া ভেঙে এগিয়ে চলুক মেয়ে।