খণ্ডহর: রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে এমনই ভগ্নদশা ঐতিহ্যবাহী অল্ডিন হাউসের। উৎসবের সৌজন্যে পুরনো গরিমায় ফেরার অপেক্ষায়। নিজস্ব চিত্র
দোরগোড়ায় দ্বিশতবর্ষ। উৎসব উদযাপনের তোড়জোড়ও শুরু হয়েছে জোরকদমে। অথচ উৎসবের সেই আঁচ থেকে হয়তো বঞ্চিতই থেকে যাবে শ্রীরামপুর কলেজের আতুরঘর! গঙ্গার ধারে বনবাদাড়ে ঢেকে গিয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে যা আজও দাঁড়িয়ে আছে। অল্ডিন হাউস নামে এই ভবনেই গোড়াপত্তন হয়েছিল কলেজের। পরে বিশাল ভবন তৈরি হলেও দীর্ঘ সংস্কারের অভাবে অনাদরে, অবহেলায় আজ অস্তিত্বই হারাতে বসেছে প্রাচীন এই ভবন।
শ্রীরামপুর কলেজের দীর্ঘ ইতিহাস যাত্রায় মণিমানিক্য কম নেই।
১৮১৮ সালে কলেজ স্থাপনের নেপথ্যে ছিলেন শ্রীরামপুরের ত্রয়ী উইলিয়াম কেরি, জ্যেশুয়া মার্শমান এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড। নিজস্ব ভবন না থাকায় প্রথম কলেজ শুরু হয়েছিল অল্ডিন হাউসে। ১৮০৩ সালে গঙ্গার পাড়ে কয়েক বিঘা জমির উপর সুদৃশ্য সেই বাড়ি তৈরি করেছিলেন রেভারেন্ড ডেভিড ব্রাউন।
কেরি মিউজিয়াম ও রিসার্চ সেন্টারের প্রাক্তন কিউরেটর তথা কলেজের প্রাক্তন শিক্ষক তপনকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, মিশনারিদের সংস্পর্শে থাকার জন্য ব্রাউন শ্রীরামপুরকে বেছে নেন। কেরি, মার্শম্যান, ওয়ার্ডের সঙ্গে তাঁর ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক। ‘অল্ডিন হাউস’ নামটি তাঁরই দেওয়া। আরবি শব্দ ‘অল্ডিন’ কথার অর্থ ধর্ম বা বিশ্বাস। ১৮১২ সালে ব্রাউনের মৃত্যুর পরে মার্শম্যানের বোর্ডিং স্কুলের ছাত্রাবাস হিসেবে বাড়িটি ব্যবহার করা হত।
১৮১৮ সালে কেরি, ওয়ার্ড এবং মার্শম্যানের নেতৃত্বে ৩৭ জন ছাত্রকে নিয়ে অল্ডিন হাউসেই আত্মপ্রকাশ করে শ্রীরামপুর কলেজ। ১৮২২ সালে শ্রীরামপুর কলেজ নিজস্ব ভবনে তুলে আনা হয়। নিজস্ব ভবনে কলেজ সরে আসার পর থেকেই অবশ্য ইতিহাসের পাতায় ক্রমশ চাপা পড়তে থাকে অল্ডিন হাউস। ১৮২৭ সালে তৎকালীন ডেনমার্কের রাজা ষষ্ঠ ফ্রেডরিক শ্রীরামপুর কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি দেন। শিক্ষার পীঠস্থান হিসেবে ধীরে ধীরে পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছে শ্রীরামপুর কলেজ। যার সূত্র ধরে বইয়ের পাতায় উঠে এসেছে কলেজের ঐতিহ্যশালী মূল ভবনের ছবি। আর ক্রমশ কালের অন্তরালে চলে গিয়েছে অল্ডিন হাউস। দরজা-জানলা নেই। বাড়ির ভিতরে-বাইরে ঝোপজঙ্গলে ভর্তি। সাপখোপের নিশ্চিন্ত বাসস্থান আর সমাজবিরোধীদের অবাধ আনাগোনার জায়গা। একই অবস্থা হেনরি মার্টিনস প্যাগোডারও।
জাঁকজমক করে ষখন কলেজের দ্বিশতবর্ষ পালনের তোড়জোড় চলছে তখন ‘আঁতুরঘর’ নিয়ে কী পরিকল্পনা?
কলেজের অধ্যক্ষ ভ্যানস্যাংগ্লুরা বলেন, ‘‘অল্ডিন হাউসের সংস্কারের বিষয়ে আলোচনা করা হবে।’’ সোমবার দ্বিশতবর্ষে উৎসবের পরিকল্পনা নিয়ে কলেজের প্রাক্তনী সংসদের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে কলেজ সূত্রে খবর। সংগঠনের সভাপতি তথা কলেজের প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ অনুপকুমার সেনগুপ্ত এবং সম্পাদক অন্বয় চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘অল্ডিন হাউসের দশা সত্যিই কষ্ট দেয়। বাড়িটি পুরনো চেহারায় ফেরানো হলে উৎসব পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। এর জন্য সব রকম চেষ্টা করব।’’ প্রাক্তনী সংসদের আশ্বাস, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলা হবে। নাগরিক কনভেনশন করা হবে। শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের দ্বারস্থ হওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
উৎসবে আঁতুরঘরের চেহারা বদলায় কি না, এখন তারই অপেক্ষা।