ছাদের ঠাকুরঘরে সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা।
দোতলায় তাঁর ক্যান্সারে আক্রান্ত বৌমা, পঞ্চাশ পেরোনো প্রৌঢ়া।
একতলায় নাতবৌ, বছর বত্রিশের এক তরুণী ও তাঁর আটমাসের শিশু।
পাশের বাড়ি থেকে ছাদ টপকে ঢুকে একের পর এক খুন করতে করতে নীচে নামছিল আততায়ী।
বৃদ্ধা রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন ছাদেই। প্রৌঢ়াকে মেরে তাঁর দেহ ঢুকিয়ে দেওয়া হয় খাটের নীচে। ধারালো অস্ত্রের কোপ খেয়েও বৃদ্ধার নাতবৌ সদর দরজা খুলে ছুটে বেরিয়ে যান বাইরে। আর্তনাদ শুনে পাড়ার লোকজন ছুটে আসেন। বেগতিক বুঝে আততায়ী ছুটে ফের ছাদে উঠে যায় এবং পালানোর আর রাস্তা না থাকায় সেখান থেকেই নীচে ঝাঁপ মারে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে উত্তরপাড়ার ভদ্রকালীর বি এন রোডে এই ঘটনায় গোটা এলাকা হতচকিত। পাড়ার লোকজন যখন পৌঁছন, বৃদ্ধা গীতা সেন (৭১) এবং তাঁর পুত্রবধূ কাবেরী সেন (৫২) নিথর হয়ে পড়ে রয়েছেন। কাবেরীদেবীর বৌমা, বছর বত্রিশের মৌমিতা কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে মাথায় গুরুতর চোট পাওয়ায় তাঁদের পড়শি ভাড়াটে, খুনে অভিযুক্ত গোপাল সীটকেও ওই হাসপাতালেই ভর্তি করানো হয়েছে। কিন্তু হামলার অস্ত্রটি পাওয়া যায়নি। কেন এই খুন-জখম, তাও রাত পর্যন্ত স্পষ্ট নয়।
ঘটনার সময়ে বাড়িতে ছিলেন না কাবেরীদেবীর ছেলে দেবাশিস সেন। সল্টলেকে একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন তিনি। তাঁদের বাড়ির পাশেই প্রতিবেশী নিত্যানন্দ দাসের তিনতলা বাড়ি। নিত্যানন্দবাবু বৃদ্ধ ও অশক্ত। মাসখানেক আগে তাঁদের একতলায় ভাড়া আসে গোপাল। হাওড়ার মালিপাঁচঘড়ায় কারখানায় কাজ করে বলে সে জানিয়েছিল। দুই বাড়ির মধ্যে ব্যবধান মোটে ফুট তিনেকের। দেবাশিস জানান, এর আগেও কয়েক বার গোপাল পাশের বাড়ি থেকে তাঁদের ছাদে দড়ি ফেলেছিল। এ জন্য তাকে সতর্কও করা হয়েছিল। এ ছাড়া তার সঙ্গে আর কোনও কথা হয়নি।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জেনেছে, বিকেল সওয়া ৪টে নাগাদ গীতাদেবী ছিলেন ছাদের ঠাকুরঘরে। তাঁকে টেনে বের করে কোপানো হয়। দোতলায় নিজের ঘরে বসে সম্ভবত টিভি দেখছিলেন কাবেরীদেবী (পরে পাড়ার লোকজন গিয়ে টিভি চলতে দেখেন)। ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ইদানীং তাঁর কেমোথেরাপি চলছিল। তাঁকেও রেয়াত করা হয়নি। তাঁর দেহ খাটের তলায় ঢুকিয়ে দিয়ে আততায়ী নেমে যায় একতলায়। দেবাশিসের স্ত্রী মৌমিতা তাঁর মাস আটেকের ছেলে সেখানেই ছিলেন। গোপাল শিশুটিকে কিছু না করলেও তাঁর উপরে চড়াও হয় বলে অভিযোগ। গলায় কোপ খেয়েও মৌমিতা রক্তাক্ত অবস্থায় ছুটে বাইরে বেরিয়ে যান। চিৎকার করে ছেলেকে বাঁচানোর আর্জি জানাতে থাকেন তিনি। সেই চিৎকার শুনে পাড়া-পড়শিরা ছুটে আসেন।
ইতিমধ্যে গোপাল ছুটে ছাদে উঠে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, পাড়ার লোক যখন সদর দরজা দিয়ে ঢুকছেন, তখন গোপাল উপর থেকে লাফ দেয়। মৌমিতা ও গোপালকে উত্তরপাড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে কলকাতা মেডিক্যালে স্থানান্তরিত করা হয়।