এ যেন বজ্র আঁটুনি, ফস্কা গেরো!
আদালতের নির্দেশ ছিল, আবর্জনা সাফ করে দূষণমুক্ত রাখতে হবে সাঁতরাগাছি ঝিল। সেই মতো কাজেও নামল হাওড়া পুরনিগম। হল সাফাই। গোটা কর্মকাণ্ড শেষে দেখা গেল, ঝিল থেকে সরেছে শুধুই কচুরিপানা। যা আসলে ঝিলে আসা পরিযায়ী পাখিদের বিশ্রামের মূল জায়গা। সেই পানা না থাকলে কোথায় বসবে ভিন্দেশি সব পাখি? সাঁতরাগাছি ঝিল যাদের জন্য দূষণমুক্ত রাখার এই উদ্যোগ, কচুরিপানার অভাবে তারাই কি আসা বন্ধ করবে এই পাখিরালয়ে?
ঝিলে এসে পড়া পুরসভার একাধিক নর্দমার নোংরা জল বন্ধের কোনও বিকল্প ব্যবস্থা না করে শুধুই কচুরিপানা সরিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে হাওড়া পুরনিগমের দায়সারা উদ্যোগ। অভিযোগ, আদালতের নির্দেশ ‘মানা’র পরেও সেই তিমিরেই রয়ে গেল এই ঝিলের অবস্থা।
সাঁতরাগাছি ঝিলের দূষণ নিয়ে পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্তের করা মামলার প্রেক্ষিতে গ্রিন বেঞ্চ গত ২ মার্চ হাওড়া পুরনিগমকে ওই ঝিল থেকে আর্বজনা পরিষ্কার করে দূষণ মুক্ত করার নির্দেশ দেয়।
আদালতের নির্দেশ পেয়ে পুরনিগম অবশ্য দ্রুত কাজ শুরু করে। প্রায় ২৪ লক্ষ টাকা খরচ করে ঝিলের পাড় থেকে সমস্ত আবর্জনা ও ঝিলের সমস্ত কচুরিপানা তুলে ফেলা হয়। নষ্ট করে দেওয়া হয় কাঠের তক্তা ও কচুরিপানা দিয়ে তৈরি পাখিদের বসার জন্য ছোট ছোট দ্বীপ। যে দ্বীপগুলি হল ভিন্ দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল পথ পেরিয়ে আসা পরিযায়ী পাখিদের প্রজননের অন্যতম জায়গা। সাঁতরাগাছি ঝিলটি মূলত রক্ষণাবেক্ষণ করে বন দফতর। ওই দফতরের এক পদস্থ কর্তা বলেন, ‘‘পুরনিগম এই কাজ করার আগে আমাদের সঙ্গে এক বারও কথা বলেনি। আমরা ঝিল পরিষ্কার করলে জায়গায় জায়গায় কচুরিপানা রেখে দিয়ে কাজটা করতাম। কচুরিপানা দিয়ে তৈরি দ্বীপও রাখা হতো। যাতে শীতের সময়ে আসা পরিযায়ীদের বিশ্রাম নিতে অসুবিধা না হয়।’’ পক্ষী বিশেষজ্ঞ সুমিত সেন বলেন, ‘‘কচুরিপানা না থাকলে পাখি আসে কি না, তা এ বার দেখা যাবে। কিন্তু ওই ঝিলে স্থানীয় পাখিরাও বিশ্রাম নেয়। কচুরিপানার জঙ্গলই হল তাদের বিশ্রামের জায়গা। তাই সব পানা তুলে ফেলাটা একেবারেই ঠিক হয়নি।’’
পরিবেশকর্মী সুভাষবাবুও পুরনিগমের এই কাজের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘এই ঝিলের আবর্জনা সরানোর আগে পুরনিগম কোনও বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করেনি। গ্রিন বেঞ্চও নির্দেশ দেয়নি সব পানা তোলার। কিন্তু যে কাজটা অনেক আগে করা উচিত ছিল, পুরনিগম এখনও তাতে হাত দেয়নি।’’
সুভাষবাবু জানান, ওই ঝিলে পুর-এলাকার তিন-চারটি নর্দমার জল দিনরাত এসে পড়ে ঝিলকে দূষিত করে চলেছে। সে কথা আদালতের কাছে তিনি জানিয়েছিলেন। তাই আদালত নির্দেশ দিয়েছিল, ওই নর্দমাগুলির জল ঝিলে না ফেলে অন্যত্র যাতে ফেলা হয়, তার ব্যবস্থা করতে। যদিও কার্যক্ষেত্রে দেখা যায়, সেই কাজে হাতই দেওয়া হয়নি পুরনিগমের তরফে। হাওড়া পুনিগমের পক্ষ থেকে অবশ্য জানানো হয়েছে, এলাকার নর্দমাগুলি সরানোর ব্যাপারে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি তৈরি করা হয়েছে। রেলকেও ওই কমিটিতে রাখা হয়েছে। কারণ ঝিলে রেলের জলও পড়ে।
হাওড়া পুরনিগমের মেয়র রথীন চক্রবর্তী বলেন, ‘‘আদালতের নির্দেশ মতো ঝিল পরিষ্কারের কাজ করা হয়েছে। তার রিপোর্টও আমরা জমা দিয়েছি। পরবর্তীকালে আদালত কী নির্দেশ দেয়, তা দেখে ব্যবস্থা নেব।’’