স্কুলের সামনে ছোট্ট বাগানে ফলেছে ক্যাপসিকাম, ফুলকপি। টবে ফলেছে ব্রকোলি।-নিজস্ব চিত্র।
এক চিলতে জায়গা। দেখলেই চোখ জুড়োয়। মনে পড়ে যায় ‘লাল-নীল-সবুজের মেলা বসেছে...’ গানের কলি।
আকাশের দিকে অপলক চেয়ে ঈষৎ হলুদ ফুলকপি। তার কিঞ্চিত তফাতে হাত ধরাধরি করে আছে সবুজ, লাল ক্যাপসিকাম, কাঁচালঙ্কা। কিছুটা দূরে মাটি ফুঁড়ে মাথা তুলছে আলু। টকটকে লাল টম্যাটোয় ভরেছে গাছ। একপাশে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে সিঙ্গাপুরি প্রজাতির ছোট ছোট কলাগাছ। এ সবের ফাঁকে ইতিউতি উঁকি মারছে নানা রঙের ফুল। না। উদ্যানপালন দফতরের কোনও জায়গা বা নার্সারির ছবি নয়। শ্রীরামপুরে একটি স্কুলের সামনে গেলে চোখে পড়বে এমনই ছবি।
গঙ্গার ধারে ঐতিহাসিক শহরটা ক্রমশই কংক্রিটের জঙ্গলে ঢেকে যাচ্ছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্মল-টাটকা বাতাস এখন কার্যত দিবাস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশের এই দৈন্যতাই ভীষণভাবে নাড়া দেয় শ্রীরামপুরের ওই স্কুলের শিক্ষকদের। কচিকাঁচারা যেন ধীরে ধীরে কাঁচা সবুজের ছোঁওয়া থেকেই বঞ্চিত হতে চলেছে। আর তার ফলে চারপাশে যেটুকু সবুজ রয়েছে তাও যেন তাদের কাছে একেবারেই অচেনা। বাজারে গিয়ে বা বাড়িতে নানা সব্জি এলেও তারা জানে না আলু গাছটা কেমন দেখতে, কোন সময়ে আলু চাষ করা হয়। গাছে সবুজ টম্যাটো কী ভাবে ধীরে ধীরে লাল হয়ে যায়। মোচা কি, কাঁচকলা আর পাকা কলা আলাদা কেন?
কংক্রিটের জঙ্গলে বাস করা ছাত্রছাত্রীদের এ সব বিষয়ে জ্ঞান না থাকলে পরিবেশ সচেতনা বাড়বে কী করে? প্রশ্নটা গেড়ে বসেছিল শ্রীরামপুর ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনের শিক্ষকদের মনে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের এমন প্রকৃতি পাঠ দিতে গেলে তো তাদের গ্রামে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু সেটাও সব সময় সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে স্কুলের সামনে পড়ে থাকা এক ফালি জায়গাতেই তো গড়ে তোলা যেতে পারে প্রকৃতির পাঠশালা।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রথমেই নজর দেওয়া হয় পরিচ্ছন্নতায়। ক্লাসরুম থেকে শুরু করে করিডর, শৌচাগার পরিচ্ছন রাখতে চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের পাশাপাশি ছাত্রদেরও দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়। জীর্ণ দেওয়াল আর অপরিষ্কার স্কুল চত্বরে সাপখোপ বাসা বেঁধেছিল। সে সব সংস্কার করে জায়গায় মাটি ফেলে তা ফলনের উপযুক্ত করে ঔষধি গাছ এবং সব্জি চাষ আরম্ভ হয়। মিড-ডে-মিলের রান্নাঘরের পাশের জায়গায় ঔষধি গাছ লাগানো হয়। যেখানে এখন শোভা পাচ্ছে তুলসি, কালমেঘ, বাসক, অ্যালোভেরা। টিচার ইন চার্জ দেবাশিস কুণ্ডু বলেন, ‘‘ছোট ছোট জায়গা করে ভেষজ গাছ ছাড়াও ডাল, কন্দ, দানা শস্য জাতীয় গাছ লাগানো হবে। প্রকৃতি পাঠের পাশাপাশি হাতেকলমে নমুনা চোখের সামনে দেখতে পাবে ছাত্রছাত্রীরা।’’
তবে এ সবের জন্য স্কুলের তরফে একজন বাগান বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ করা হয়েছে। শ্যামল মুখোপাধ্যায় নামে ওই ব্যক্তি জানান, চাষে জৈব সারই ব্যবহার করা হয়। কী ভাবে ওই সার হয় তাও পড়ুয়াদের শেখানো হয়। এত রকমের গাছ আছে এখানে। কোনটা কি গাছ, ছেলেরা প্রশ্ন করে। উত্তরও পায়।’’ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের কথায়, ‘‘গ্রামের ছেলেমেয়েরা সবুজের স্পর্শে বেড়ে ওঠে। সেখানে শহরের ছেলেমেয়েরা বড় হয় ইট-কাঠ-পাথর আর পার্কের কৃত্রিমতার মধ্যে। ওরা যাতে প্রকৃতিকে চিনতে, জানতে পারে তাই আমাদের এই উদ্যোগ।’’
শুধু নিজেদের স্কুলের পড়ুয়ারাই নয়, অন্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও যাতে এখানে এসে গাছগাছালি দেখার সুযোগ পায়, সে বিষয়েও চিন্তা-ভাবনা করছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। জানা গেল, স্কুল চত্বরেই ছোট করে দু’টি জলাশয় তৈরি করে সেখানে বিভিন্ন ধরনের মাছ ছেড়ে তাদের জীবনচক্রও শেখানো হবে পড়ুয়াদের।
আর কী বলছে পড়ুয়ারা? স্কুলের বাগানে ফল, সব্জি ফলতে দেখে তাদের অনুভূতিই বা কেমন?
ক্লাস নাইনের সোহম চট্টোপাধ্যায়, ক্লাস এইটের দীপন সাহা, ক্লাস সেভেনের ঋক দত্ত প্রত্যেকেই স্কুলের এমন উদ্যোগে অভিভূত। তাদের কথায়, ‘‘এতিদন শুধু বাড়িতে, বাজারে নানা সব্জি, ফল দেখতাম। সেগুলির গাছ কেমন তা চিনতাম না। কেউ প্রশ্ন করলে খারাপ লাগত। মাস্টারমশায়রা আমাদের জন্য এটা যে করেছেন তাতে খুবই উপকার হবে।’’ কথাগুলো বলতে বলতে তিনজনেই পরম যত্নে হাত বুলিয়ে দেয় টম্যাটো গাছের গায়ে।