প্রচণ্ড গরমে ট্রাকের নীচেই চলছে আহারের আয়োজন। বাগনানের কাছে মুম্বই রোডে সুব্রত জানার তোলা ছবি।
যাঁরা রান্নাবান্না করেন তাঁরা পাকা রাঁধুনি নন। রান্নাতেও যত্ন নেন না। এমন ‘অজুহাত’-এর ভিত্তিতে মাস চারেক ধরে বন্ধ রয়েছে মিড ডে মিল। যাঁর বিরুদ্ধে এমন ‘অজুহাত’ তোলার অভিযোগ উঠেছে তিনি স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতির শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ ও তৃণমূল নেতা। প্রায় চার মাস ধরে হাওড়ার শ্যামপুর-২ ব্লকের সেঁকো সুলতানপুর শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে এমন অবস্থা চললেও প্রশাসনের তরফে কোনও ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ তুলেছেন অভিভাবকেরা। যাঁরা সেখানে রান্না করতেন তাঁদের অভিযোগ, ওই তৃণমূল নেতা নিজের পছন্দমতো লোক নেওয়ার জন্যই এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছেন।
যদিও ওই তৃণমূল নেতা শেখ সাহিদুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর যুক্তি, ‘‘ওই শিশু-শিক্ষাকেন্দ্রে রাঁধুনি নিয়োগ নিয়ে একটা সমস্যা ছিল। তা ছাড়া তাঁরা ঠিকমতো কাজ করছিলেন না। তাই পড়ুয়াদের কথা ভেবেই ওঁদের পরিবর্তে নতুন রাঁধুনি নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।’’
বিডিও সুদীপ্ত সাঁতরা ওই শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে মিড ডে মিল বন্ধ থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘ওখানে রাঁধুনিরা ঠিকমতো কাজ করছেন না বলে একটা অভিযোগ এসেছে। শীঘ্রই যাতে ওখানে মিড ডে মিল রান্না শুরু হয় সে ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে পরীক্ষার মাধ্যমে রাঁধুনি নিয়োগ করা হবে।’’
শ্যামপুর ২ পঞ্চায়েত সমিতি ও ব্লক প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, শশাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে ২০০০ সালে ওই শিশু শিক্ষাকেন্দ্র চালু হয়। ২০০৫ সালে এখানে মিড ডে মিল চালু হয়। তখন পঞ্চায়েতে কংগ্রেস ও তৃণমূলের জোট ছিল। সেই সময় স্কুলের পরিচালন সমিতি ও প্রশাসনের সহায়তায় সাকিলা বিবি ও মুর্শিদা খাতুন নামে দুই মহিলাকে মিড ডে মিল রান্নার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই থেকে তাঁরাই রান্না করছিলেন। ২০১৩ সালে পঞ্চায়েতে এককভাবে ক্ষমতা দখল করে তৃণমূল। সমস্যার শুরু তখন থেকেই। স্থানীয় তৃণমূল নেতা সাহিদুল ইসলাম খান পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে শ্যামপুর-২ পঞ্চায়েত সমিতির শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ। অভিযোগ তিনিই সাকিলা ও মুর্শিদাকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। স্কুল ও স্থানীয় সূত্রে খবর, গত ডিসেম্বর মাসে মিড ডে মিলের খাবারে টিকটিকি পড়েছে এবং সেই খাবার স্কুলের বাচ্চাদের খাওয়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এমনকী এও বলা হয় যে সাকিলা, মুর্শিদার রান্না করা খাবার আর বাচ্চাদের দেওয়া যাবে না। যদিও দু’জনেরই অভিযোগ, এটা একেবারেই তাঁদের কাজ থেকে সরানোর জন্য সাহিদুলের চক্রান্ত। তাঁদের যুক্তি, টিকটিকি পড়া খাবার দেওয়ার কথা যে মিথ্যা তার প্রমাণ, কেউ অসুস্থ হয়নি বা কাউকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়নি।
এর পর প্রায় দু’মাস স্কুলে মিড ডে মিল বন্ধ ছিল। স্কুলের শিক্ষিকারা সমস্যার কথা বিডিওকে জানান। ফের সাকিলা ও মুর্শিদাকেই রান্নার দায়িত্ব দিতে উদ্যোগী হন স্কুল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু স্থানীয় কিছু লোকজন তাতে বাধা দেয়। এ ক্ষেত্রেও অভিযোগ ওঠে সাহিদুলের বিরুদ্ধে। এই অবস্থায় প্রশাসনের দ্বারস্থ হন স্কুল কর্তৃপক্ষ। বিকল্প রাঁধুনির জন্য প্রশাসনিক উদ্যোগের মধ্যেই গত ৭ এপ্রিল স্কুলে এসে শিক্ষিকারা দেখেন রান্নাঘরে আলাদা করে তালা মেরে দেওয়া হয়েছে। অভিভাবকদের একাংশের অভিযোগ নিজের লোক ঢোকানোর জন্য সাহিদুলই এ সব করাচ্ছেন। আবার সাকিলা ও মুর্শিদাই ক্ষমতা ধরে রাখতে এসব করাচ্ছেন বলে পাল্টা অভিযোগও উঠেছে। এই অবস্থায় শিক্ষিকারা ফের ব্লক প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছেন। স্কুলের এক শিক্ষিকা স্বপ্না বাগানি বলেন, ‘‘রান্নার দায়িত্ব কে পাবেন এটা আমাদের বিষয় নয়। আমরা চাই অবিলম্বে রান্না শুরু হোক। সে জন্য প্রশাসনকে জানিয়েছি।’’
স্থানীয় সিপিএম নেতা ও পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য কাজী মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘‘যে সমস্যাই হোক না কেন তা দ্রুত মেটা প্রয়োজন। পড়ুয়াদের স্বার্থে অবিলম্বে ওই শিশু-শিক্ষাকেন্দ্রে মিড ডে মিল চালু করতে ব্যবস্থা নিক প্রশাসন।’’