রামমোহনের ভিটেেত এখনও তিমিরে পর্যটন

সরকারি উদ্যোগে এখনও পর্যন্ত কাজ হয়েছে চার-পাঁচটি। তাঁর বাস্তুভিটের জমি অধিগ্রহণ হয়েছে। জাতীয় স্মারক হিসেবে তাঁর নামে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। স্মৃতি ও স্বত্ত্ব সংরক্ষণ কমিটি পার্ক গড়লেও তা এখন প্রায় শ্রীহীন।

Advertisement

পীযূষ নন্দী

শেষ আপডেট: ৩০ অগস্ট ২০১৫ ০১:২৯
Share:

রামমোহনের বসতবাড়ির বর্তমান অবস্থা। ছবি: মোহন দাস।

সরকারি উদ্যোগে এখনও পর্যন্ত কাজ হয়েছে চার-পাঁচটি।

Advertisement

তাঁর বাস্তুভিটের জমি অধিগ্রহণ হয়েছে। জাতীয় স্মারক হিসেবে তাঁর নামে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। স্মৃতি ও স্বত্ত্ব সংরক্ষণ কমিটি পার্ক গড়লেও তা এখন প্রায় শ্রীহীন। বাম আমলে তাঁর জন্মস্থান পর্যন্ত কলকাতা থেকে বাস পরিষেবা চালু হলেও বন্ধ হয়ে যায় কয়েক মাস পরেই।

বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়ের স্মৃতিকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরার জন্য সরকারি উদ্যোগে এখনও সে ভাবে গতি এল না— এই আফশোস এখনও করেন তাঁর জন্মস্থান খানাকুলের বাসিন্দারা। রাধানগরে তাঁর ভগ্নপ্রায় বাড়িকে সংস্কার করে এবং তাঁর হাতে লাগানো আমবাগানকে ঘিরে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্রের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু এখনও সেই দাবি পূরণে আশ্বাস মিললেও কাজ হচ্ছে না বলে তাঁদের অভিযোগ।

Advertisement

প্রবীণ বাসিন্দারা বলছেন, রামমোহনের স্মৃতি সংরক্ষণ নিয়ে সরকারি স্তরে ৩০ বছর ধরে অনেক পরিকল্পনা হলেও কাজ কিছু হয়নি। অথচ, মুখ্যমন্ত্রী যখন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ছিলেন, তখনই রামমোহনের জন্মভূমিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তাঁর কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল। স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিন চর্চা করছেন দেবাশিস শেঠ। তাঁর অভিযোগ, রামমোহনের জন্মভূমিতে অনেক কিছু করার ছিল। প্রচুর প্রতিশ্রুতি এসেছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী কাজ হয়নি। তিনি বলেন, ‘‘জেলা পরিষদের দাবি মতো আমরা ১১ দফা প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম প্রায় এক বছর আগে। কিন্তু সাড়া মেলেনি।’’ একই রকম আক্ষেপ শোনা গিয়েছে রায় পরিবারের বর্তমান সদস্য অনুপ রায়ের মুখেও।

রামমোহনের স্মৃতি বিজড়িত জায়গাগুলি দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে হুগলি জেলা পরিষদ। সভাধিপতি মেহবুব রহমানের দাবি, ‘‘টাকা নেই বলে কাজ হচ্ছে না। তবে, রামমোহনের স্মৃতি সংরক্ষণের পরিকল্পনা সবই সময়মতো হবে। বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নজরে রয়েছে।’’

রামমোহনকে নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরা জানাচ্ছেন, ১৮৩৩ সালে ব্রিস্টলে রামমোহনের মৃত্যুর পর ১৮৫৯ সালে পাদ্রি রেভারেন্ড জেমস্‌ লং রাধানগরে এসে রামমোহনের জন্মস্থান তথা ‘সূতিকাগৃহ’ চিহ্নিত করে সেখানে ছোট বেদি নির্মাণ করেন। ১৯০২ সালে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল দাবি তোলেন, ওই জায়গায় ‘জাতীয় মেলা’র আয়োজন করা হোক। ১৯১৬ সালে এলাকাবাসী এবং ব্রাহ্মসমাজ যৌথ কমিটি রাধানগরে ‘রামমোহন স্মৃতি মন্দির’ এবং অতিথিশালা নির্মাণে উদ্যোগী হয়। নকশা আঁকেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হলেও সেই নির্মাণ অসমাপ্ত। কমিটিও ভেঙে যায়।

১৯৬০ সালে সরকারি ভাবে রামমোহনের স্মৃতি সংরক্ষণের কিছু প্রচেষ্টা হয়। সরকার রাধানগর-নাঙ্গুলপাড়া ও রঘুনাথপুরে রামমোহনের পৈতৃক সম্পত্তি প্রায় ১৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে। ১৯৭২ সালে কেন্দ্র সরকার জাতীয় স্মারক হিসাবে রামমোহন লাইব্রেরি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু ‘জাতীয় মেলা’র দাবি না-মেটায় স্থানীয় বাসিন্দা নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ১৯৯০ সালে রামমোহনের নামে ছোট মেলা শুরু হয়। উদ্বোধনে এসে তত্‌কালীন ভূমি ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রী বিনয় চৌধুরী রামমোহনের জন্মভূমিতে তাঁর নামে পাঠাগারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে সেই পাঠাগার তৈরিও হয়।

২০০২ সালে জেলা পরিষদ ‘রামমোহন স্মৃতি ও স্বত্ব সংরক্ষণ কমিটি’ গঠন করে কিছু কাজের সূচনা করে। তার মধ্যে রয়েছে রঘুনাথপুরে রামমোহনের বাসভূমি এলাকায় (রামমোহন রঘুনাথপুরে বাড়ি করেছিলেন। ১৮১৭ সালে তিনি স্ত্রী, পুত্র এবং পুত্রবধূকে নিয়ে সেখানে ওঠেন) একটি পার্ক নির্মাণ করে তার সৌন্দর্যায়ন এবং রাধানগর স্মৃতিমন্দিরের দেওয়ালে রাজার জীবনের চিত্ররূপ তুলে ধরা। সেই পার্ক এখন শ্রীহীন। রঘুনাথপুরে রামমোহনের বাড়ি, উপাসনা-বেদি এবং তাঁর বৌদি অলকমঞ্জুরী দেবীকে যেখানে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, সেখানে নির্মিত স্মৃতি-বেদিও ভগ্নপ্রায়।

রামমোহনের স্মৃতি রক্ষার দাবিতে খানাকুলে কিছু সমিতি হয়েছে। তেমনই একটি সমিতি— ‘রাধানগর পল্লি সমিতি’র সম্পাদক বাসুদেব বসুর অভিযোগ, ‘‘রামমোহনের জন্মস্থান অবহেলিত। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি নিয়ে সরকারি উদ্যোগ নেই। যেটুকু ঐতিহ্য টিকে আছে তা-ও ধরে রাখার সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে না।’’

তবে, বেসরকারি ভাবে রামমোহনের নামে ব্যবসা কেন্দ্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হিমঘর, সমবায় সমিতি হয়েছে। ২০১৩ সালে রামমোহন গ্রামীণ পাঠাগার প্রাঙ্গণে ব্রিস্টল শহরের দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত রামমোহন সমাধির অনুরূপ একটি সমাধি-স্মারক স্থাপিত হয় রায় বংশের পারিবারিক উদ্যোগে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement