আদালতে চত্বরে সাজাপ্রাপ্ত লক্ষ্মীকান্ত। নিজস্ব চিত্র।
গলার নলি কাটা অবস্থায় রক্তাক্ত মা ঘরের মেঝেয় পড়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন। সেই আর্ত চিৎকারে ঘুম ভাঙে ছ’বছরের ছেলের। খাটে শুয়েছিল সে। এ দিকে, ছেলে জেগে যাওয়ায় বিপদের গন্ধ পায় বাড়ির কর্তা। যে কিছুক্ষণ আগে নিজের স্ত্রীর গলায় বঁটি চালিয়ে কেটে ফেলেছে নলি। সাক্ষী লোপাট করতে শিশুপুত্রকেও রেয়াত করেনি সে। একই বঁটিতে কোপায় নিজের ছেলেকেও।
‘বিরলের মধ্যেও বিরলতম’ বলে উল্লেখ করে এই মামলাতেই দোষী যুবককে ফাঁসির সাজা শুনিয়েছেন বিচারক। শনিবার, এই প্রথম কোনও ফাঁসির সাজা হল আরামবাগ আদালতে। সাজা শুনিয়েছেন আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সাজাপ্রাপ্তের নাম লক্ষ্মীকান্ত অধিকারী। পেশায় ট্রাক চালক এই ব্যক্তি হুগলির পুড়শুড়ার ধাড়াপাড়ায় বাসিন্দা। প্রায় ন’বছর আগে তার সঙ্গে খানাকুলের বালিপুরের সুলেখা কোটালের বিয়ে হয়। বিয়ের বছর কয়েক পরে লক্ষ্মীকান্ত তার বিবাহবিচ্ছিন্না শ্যালিকাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। শ্যালিকা প্রতিবাদ করেন। ঘটনাটি তার পরিবারেও জানাজানি হয়। যার জেরে লক্ষ্মীকান্ত জানিয়ে দেয়, স্ত্রীকেই ‘চরম শিক্ষা’ দেবে সে।
২০১২ সালের ৫ অগস্ট স্থানীয় একটি হিমঘরে আলু বোঝাই করে কলকাতায় ট্রাক নিয়ে যেতে হবে জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল লক্ষ্মীকান্ত। রাতে হিমঘরে আলু বোঝাই হওয়ার মাঝে দু’জন খালাসিকে নিয়ে পুড়শুড়া মোড়ে একটি চোলাইয়ের ঠেকে যায় সে। খালাসিদের মদ খেতে বলে মিনিট পনেরো পথ হেঁটে বাড়ি চলে যায় ওই যুবক। বাড়িতে ঢুকে দরজায় টোকা দিলে স্ত্রী দরজা খুলে দেন। বাড়ির বঁটি দিয়েই স্ত্রীর উপরে চড়াও হয় লক্ষ্মীকান্ত। গলার নলি কেটে দেয়। মায়ের চিৎকারে বছর সাতেকের ছেলে ঘুম থেকে ওঠে পড়লে তাকেও গলার নলি কেটে দরজার বাইরে থেকে শিকল তুলে পালায় লক্ষ্মীকান্ত।
পর দিন সকালে সুলেখা এবং তাঁর ছেলে ঘুম থেকে উঠছে না দেখে প্রতিবেশীরা দরজার শিকল খুলে ঘরে ঢোকেন। তাঁরাই দু’জনের রক্তাক্ত দেহ মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। বধূর মা, খানাকুলের বালিপুরের শেফালি কোটাল জামাইয়ের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ করেন পুলিশের কাছে। লক্ষ্মীকান্তের বাবা পুলিশকে জানান, তিনি ছেলেকে রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ ঘরে ঢুকতে দেখেছেন। এরপর ওই দিনই দুপুরে লক্ষ্মীকান্ত লরি নিয়ে চাঁপাডাঙা পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরে ফেলেন আত্মীয়স্বজন-প্রতিবেশীরা। পুলিশ গ্রেফতার করে বছর ছত্রিশের ওই যুবককে। তাকে জেরা করে বাড়ির সামনের পুকুর থেকে খুনে ব্যবহৃত বঁটি উদ্ধার করে পুলিশ।
শনিবার রায় শোনার পরে আরামবাগ বার অ্যসোসিয়েশনের সম্পাদক অলক কুণ্ডু বলেন, “এই রায় সমাজের উপর ভাল প্রভাব ফেলবে বলেই আশা করছি।” আদালতের প্রবীণ আইনজীবী তপন হাজরা বলেন, “এই রায় অপরাধীদের জন্য কড়া বার্তা।” আরামবাগ ল’ক্লার্ক সংগঠনের পক্ষে রামমোহন রায়ের আশা, ‘‘এই রায়ের পরে অপরাধীরা একটু হলেও ভয় পাবে।’’
এই খুনের ঘটনার সময়ে পুড়শুড়া থানার ওসি ছিলেন বরুণ মিত্র। তিনি এবং মামলাটির তদন্তকারী অফিসার সমর দে জানান, অপরাধীকে ধরার পর থেকেই চরম শাস্তির দাবি তুলেছিলেন স্থানীয় মানুষজন। মামলার সরকারি আইনজীবী নবকুমার মজুমদার বলেন, “এই মামলায় মোট ১২ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। আসামির মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্য ছিল, সেটাই মিলেছে। ১৯৯৯ সালে আরামবাগ সেশন কোর্ট চালুর পরে কয়েকটি যাবজ্জীবন সাজার রায় হলেও অবশ্য ফাঁসির আদেশ এই প্রথম।” আসামি পক্ষের আইনজীবী পঙ্কজ পাল বলেন, “আদালতের রায় নিয়ে কিছু বলার নেই। এই রায়ের বিরুদ্ধে মক্কেল উচ্চ আদালতে যাবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত তাদের।”
লক্ষ্মীকান্তর দাদা প্রদীপ অধিকারী বলেন, “এই রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে উচ্চ আদালতে আবেদন করা যাবে বলে বিচারক জানিয়েছেন। অন্তত ফাঁসিটা রদ হয়ে যাতে যাবজ্জীবন হয়, সেই চেষ্টা করব।”
নিজের মৃত্যুদণ্ডের রায় শোনার পরেও অবশ্য ভাবলেশহীন লক্ষ্মীকান্ত। রায় শোনার পরে বেলা সাড়ে ১২টা নাগাদ তাকে আদালত চত্বরের গরাদে দুই হাত হাঁটুর উপরে রেখে অন্য বন্দিদের সঙ্গে গল্প করতে দেখা গিয়েছে।
এ দিন রায় শুনতে আদালতে এসেছিলেন মৃতার মা শেফালি কোটাল, দুই বোন চন্দনা মণ্ডল এবং বন্দনা হালদার। শেফালিদেবী বলেন, ‘‘মেয়ের মৃত্যুর সুবিচার হয়েছে। অনেক দুঃখের মধ্যেও তাই স্বস্তি পাচ্ছি।”