—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
একই দম্পতির দুই সন্তানের প্রসবের সময় ঘটল একই বিপত্তি। হাসপাতালও একই। ঘটনাচক্রে, বিপত্তি ঘটল একই চিকিৎসকের হাতে!
২০১২ সালে কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ভর্তি করিয়েছিলেন এক যুবক। সিজ়ারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন হাসপাতালের এক চিকিৎসক। কন্যাসন্তানের জন্ম দেন ওই মহিলা। দম্পতি যখন কন্যার মুখ দেখেন, তখন লক্ষ্য করেন, তাঁদের সন্তানের মাথার এক পাশে কানের উপরের অংশে একটি কাটা দাগ রয়েছে। কী ভাবে ওই দাগ হল? অস্ত্রোপচারের সময় কোনও ভুল হয়েছে, না কি জন্মগত কোনও ত্রুটি, তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয় দম্পতির মধ্যে।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টা জানতে চান দম্পতি। সেই সময় তাঁদের জানানো হয়, অস্ত্রোপচারের সময় ছুরির আঘাত লেগে গিয়েছিল। ক্ষতচিহ্নটি পরে ঠিক হয়ে যাবে। শিশুটির মাথার ওই স্থানে চুল গজাবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। তাঁর কন্যার মাথার ওই অংশে একটি চুলহীন দাগ রয়ে গিয়েছে বলে দাবি যুবকের। তার পরে চার বছর কাটে। ২০১৬ সালের মার্চে একই হাসপাতালে একই চিকিৎসকের অধীনে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ভর্তি করেন ওই যুবক।
সেই বছর ১১ মার্চ ওই মহিলার সিজ়ারিয়ান অপারেশন করেন চিকিৎসক। পুত্রসন্তানের জন্ম দেন মহিলা। পরে দম্পতি দেখেন, তাঁদের সদ্যোজাত সন্তানের মাথার এক পাশে দাগ রয়েছে। ঠিক যেমন তাঁদের কন্যার মাথার এক পাশে ছিল। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা জানান, সেটি শিশুর ছোটখাটো আঘাত। সিজ়ারের সময় ছুরির আঘাত লেগেছে এবং কয়েকটি সেলাই করলেই সেরে যাবে।
প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটার চার বছর পরে দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আঘাত নিছক দুর্ঘটনা? প্রশ্ন তুলছে পরিবার। তাদের মতে, চিকিৎসকের গাফিলতির কারণেই ঘটেছে। বিষয়টি গড়ায় কলকাতা হাই কোর্টে। ওই যুবক আদালতে জানান, চিকিৎসক নিজেই তাঁকে বলেছিলেন ১২ বছরের পেশাগত জীবনে এটি দ্বিতীয় এমন ঘটনা এবং প্রথম ঘটনাটিও তাঁর কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রেই ঘটেছিল। এক জন পিতা হিসাবে দুই সন্তানের ক্ষেত্রে একই ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হওয়ায় মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন অভিযোগকারী।
বিষয়টি নিয়ে আলিপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করেছিলেন অভিযোগকারী। পাশাপাশি, স্বাস্থ্য ভবন, পেশেন্টস বেনিফিট ট্রাস্ট এবং পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলের কাছেও অভিযোগ জমা পড়ে। বিষয়টি নিয়ে আইনি এবং প্রশাসনিক স্তরে তদন্তের দাবি করে পরিবার। সেই অভিযোগ নিয়ে শোরগোল শুরু হতেই সংশ্লিষ্ট ওই চিকিৎসক আদালতের দ্বারস্থ হন। তাঁর দাবি, শিশুর মাথায় আঘাত অস্ত্রোপচারের সময় অনিচ্ছাকৃত ভাবে হয়েছে। হাসপাতাল থেকে ছাড়ার সময় শিশুটি সুস্থই ছিল।
সিজ়ারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় নবজাতদের মাথায় আঘাত লাগার ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা নাকি চিকিৎসায় অবহেলা? ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৩৮ ধারার অধীনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে কি? শুনানিতে এই দুই প্রশ্ন ওঠে হাই কোর্টে। মেডিক্যাল কাউন্সিলের রিপোর্ট বলছে, ঘটনাটি কাকতালীয়। চিকিৎসক ইচ্ছাকৃত ভাবে শিশুকে আঘাত করেননি। ভুল করেই ওই ঘটনাটি ঘটেছিল।
অন্য দিকে, এই ঘটনার তদন্তে মেডিক্যাল কাউন্সিলের রিপোর্টকে এড়িয়ে গিয়েছে পুলিশ, এমনই মত হাই কোর্টের। আদালত জানায়, চিকিৎসাবিজ্ঞানে ঝুঁকি থাকতেই পারে। চিকিৎসায় কাঙ্খিত ফলাফল হল না, তার অর্থ এই নয় যে এটা অপরাধ। এ ক্ষেত্রে আঘাতের পরে শিশুর চিকিৎসা করা হয়েছিল। পরে চিকিৎসার অভাব বা ক্ষত না সারার বিষয়ে কোনও অভিযোগ করা হয়নি। তাই আদালত ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা খারিজ করার নির্দেশ দেয়।