শুক্রবার হাইকোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি রবিকৃষণ কপূরের ডিভিশন বেঞ্চ বেকসুর মুক্তি দিয়েছে দুই ব্যক্তিকে।
প্রায় দু’শো কেজি গাঁজা পাচারের দায়ে ২০১২ সালে দুই ব্যক্তিকে ১৫ বছর কারাবাসের নির্দেশ দিয়েছিল নার্কোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো (এনসিবি)-র বারাসতের বিশেষ আদালত। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টে আপিল মামলা দায়ের করেন দুই অভিযুক্ত গোপাল রায় ও প্রসূন চক্রবর্তী। শুক্রবার হাইকোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি রবিকৃষণ কপূরের ডিভিশন বেঞ্চ তাঁদের বেকসুর মুক্তি দিয়েছে।
এনসিবি জানায়, ২০০৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় গোপন সূত্রে খবর আসে, বারাসতের কাছে হেলাবটতলায় ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক দিয়ে প্রচুর পরিমাণ গাঁজা-সহ একটি গাড়ি কলকাতায় ঢুকবে। ওই রাতেই এনসিবি-র অফিসারেরা সেখানে যান এবং সারা রাত অপেক্ষা করার পরে ২৭ তারিখ ভোরে নির্দিষ্ট একটি গাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ১৯১ কেজি গাঁজা বাজেয়াপ্ত করেন। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন গুয়াহাটির কামরূপের বাসিন্দা গোপাল। তাঁর পাশের আসনে ছিলেন হাওড়ার রামরাজাতলার রামচরণ শেঠ রোডের বাসিন্দা প্রসূন। এনসিবি আদালতে দাবি করে, গোপাল স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, তিনি কামরূপ থেকে গাঁজা নিয়ে প্রসূনের বাড়ি যাচ্ছিলেন। প্রসূনও সে সময়ে স্বীকার করেছিলেন, তিনি গাঁজা পাচারের কারবার করেন। এনসিবি-র তথ্যপ্রমাণের উপরে ভিত্তি করে বারাসতের বিশেষ আদালত ২০১২-র ১৯ জুন ওই দু’জনকে ১৫ বছর কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয় ও দেড় লক্ষ টাকা জরিমানা করে।
প্রসূন ও গোপালের আইনজীবী কল্লোল মণ্ডল এবং অমৃতা চেল আপিল মামলার শুনানিতে জানান, বিশেষ আদালতে তাঁদের মক্কেলদের হয়ে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন হাওড়ার শিবপুর থানার তিন অফিসার ও প্রসূনবাবুর বাড়িওয়ালা। শিবপুর থানার অফিসারেরা বিশেষ আদালতে জানিয়েছিলেন, ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে প্রসূনবাবুর ফোন পেয়ে তাঁরা রামচরণ শেঠ রোডের বাড়িতে যান। গিয়ে তাঁরা দেখেন, এনসিবি-র অফিসার পরিচয় দিয়ে কয়েক জন ব্যক্তি সেখানে ঢুকেছেন। ওই ব্যক্তিরা পুলিশ অফিসারদের সামনেই প্রসূন ও তাঁর সঙ্গে থাকা গোপালকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। একই সাক্ষ্য দেন প্রসূনবাবুর বাড়িওয়ালা। কল্লোলবাবু আদালতে জানান, সে ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়, হেলাবটতলা থেকে প্রসূন ও গোপালকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে এনসিবি যে দাবি করেছিল, তা মিথ্যা।
ওই আইনজীবী আরও যুক্তি দেন, গ্রেফতারির পরে ২৭ সেপ্টেম্বর যখন অভিযুক্তদের বিশেষ আদালতে হাজির করানো হয়েছিল, তখন তাঁদের আইনজীবীরা একটি আবেদন জমা দিয়ে অভিযোগ করেন, ওই দুই ব্যক্তিকে ভয় দেখিয়ে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে। তার ভিত্তিতে বিশেষ আদালতের বিচারক অভিযুক্তদের চিকিৎসকের কাছে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পাঠান। পরীক্ষার রিপোর্টে দেখা যায়, অভিযুক্তদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
কল্লোলবাবু আদালতে আরও জানিয়েছেন, এনসিবি-র নিয়ম অনুযায়ী, গোপন সূত্রে কোনও অফিসার কোনও খবর পেলে তাঁকে সেই খবর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে তবেই অভিযানে বেরোতে হয়। হেলাবটতলায় মাদক বোঝাই গাড়ি আসার খবর এনসিবি-র অফিসারেরা তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন, এমন কোনও প্রমাণ বিশেষ আদালতে তদন্তকারীরা পেশ করতে পরেননি। তা ছাড়া এনসিবি-র যে সব অফিসার গাঁজা বাজেয়াপ্ত করেছেন বলে বিশেষ আদালতে দাবি করেন, তাঁরাই বা কী ভাবে তদন্ত করলেন, সেই প্রশ্নও আদালতে তোলেন প্রসূনবাবুদের আইনজীবীরা। তাঁরা জানান, সে কারণেই তদন্ত নিরপেক্ষ হয়েছে তা বলা যায় না।
এনসিবি-র আইনজীবী রঞ্জন রায় পাল্টা আদালতে জানান, ১৯১ কেজি গাঁজা বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনা মিথ্যা নয়। তা ছাড়া দু’জনেই তদন্তকারীদের কাছে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দিয়ে গাঁজার কারবারের কথা জানিয়েছিলেন। দু’পক্ষের বক্তব্য শুনে প্রসূন ও গোপালকে বেকসুর মুক্তি দেয় ডিভিশন বেঞ্চ।