দেবরাজ চক্রবর্তী। — ফাইল চিত্র।
একটা সময় ছিল, যখন তিনি থানায় গেলে বড়বাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেন। আবার তাঁর দরবারে গিয়ে বড়বাবু ও তাঁর অধস্তনেরা দাঁড়িয়ে থাকতেন। সেই তিনি, দেবরাজ চক্রবর্তী, গ্রেফতার হওয়ার পরে ওই থানারই লক-আপে মাটিতে বসে কাগজের থালায় রাতের খাবার খেলেন। সাধারণ আসামির মতোই তাঁর রাত কাটল কম্বলে শুয়ে।
রাজারহাট-গোপালপুর বিধানসভা কেন্দ্র এলাকার মুকুটহীন ‘যুবরাজ’ দেবরাজকে বুধবার ঝাড়খণ্ড ও পুরুলিয়ার সীমানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে এসটিএফ। তোলাবাজির অভিযোগে তাঁকে ধরা হয়। বিধানসভা নির্বাচনের আগে হলফনামায় প্রকৃত তথ্য না দেওয়া, তোলাবাজি, শিক্ষা দুর্নীতি-সহ বহু অভিযোগে জড়িয়েছেন দেবরাজ।
দেবরাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হওয়ার পরে বিধাননগর কমিশনারেটের ডিসি পদমর্যাদার এক আধিকারিকের নেতৃত্বে একটি সিট গঠন করা হয়েছিল। পুলিশ সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার আদালতের নির্দেশে তাঁকে হেফাজতে পেয়ে সাধারণ অভিযুক্তের মতোই রাখা হয়েছে বাগুইআটি থানার লক-আপে। বৃহস্পতিবার সেখানে রাতে মাটিতে বসে কাগজের থালায় খাবার খেয়েছেন দেবরাজ। সাধারণ অভিযুক্তদের মতোই ভাত, ডাল ও তরকারি খেতে দেওয়া হয় তাঁকে। রাতে লক-আপের মেঝেয় কম্বল বিছিয়ে বিশ্রাম নেন।
পুলিশ সূত্রের দাবি, ভোট-পরবর্তী সময়ে তোলাবাজি সংক্রান্ত একাধিক মামলা রুজু হয়। তাতে বিধাননগর পুরসভার একাধিক প্রাক্তন পুরপ্রতিনিধি গ্রেফতার হন। তাঁরা সকলেই ‘টিম দেবরাজ’-এর লোক। পাশাপাশি, দেবরাজের ঘনিষ্ঠ এক সহযোগীকেও বিহার থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বিভিন্ন সূত্র মারফত খবর পেয়ে প্রাথমিক ভাবে পুলিশের ধারণা, তোলাবাজিতে অভিযুক্তেরা একটি সংগঠিত চক্র হিসেবে কাজ করেছেন। যাঁর অন্যতম মূল চক্রী দেবরাজ বলেই অভিযোগ উঠেছে। সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় এত দিন তাঁর কেশাগ্রও কেউ স্পর্শ করতে পারেনি। এমনটাই অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা থেকে বিজেপি কর্মীদের।
পুলিশ সূত্রের খবর, প্রাথমিক জেরায় জানা গিয়েছে, উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্বের একাধিক রাজ্যে ১৫ দিন ধরে বার বার আশ্রয় বদল করে নজরদারি এড়িয়েছেন দেবরাজ। পুলিশকে এড়াতে বাসে যাতায়াত করেছেন। লেনদেন করেছেন নগদ অর্থে। অভিযুক্ত নেতা ছোট ছোট হোটেলে ছিলেন বলেও প্রাথমিক ভাবে জানতে পেরেছে পুলিশ। সেই সব তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
যদিও শেষরক্ষা হয়নি। তাঁর এক সহযোগীর মোবাইলের অবস্থান খতিয়ে দেখে ঝাড়খণ্ড ও পুরুলিয়ার সীমানা এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আদালতের নির্দেশে আপাতত সাত দিনের জন্য তাঁর পুলিশি হেফাজত হয়েছে।
প্রাথমিক ভাবে তোলাবাজির মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করা হলেও একাধিক অভিযোগ উঠেছে ওই নেতার বিরুদ্ধে। গ্রেফতারির পরে অনেকেই মুখ খুলছেন। যেমন, সংবাদমাধ্যমের সামনে এক বৃদ্ধ অভিযোগে জানিয়েছেন, দক্ষিণ জ্যাংড়া এলাকায় একটি মন্দিরে দেবরাজের দলবলের তোলাবাজি সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে।
দেবরাজের ব্যবহৃত ল্যাপটপ, মোবাইলের তথ্য উদ্ধার করতে ফরেন্সিকের সাহায্য নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ক্ষেত্রে কোনও তথ্য মুছে দেওয়া হয়েছে কিনা, হয়ে থাকলে সেই তথ্য উদ্ধারের জন্য ফরেন্সিকের সাহায্য নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক ভাবে কিছু তথ্য এসেছে। যেখানে একটি সংস্থার নাম উঠে এসেছে। যাদের সঙ্গে অভিযুক্তের যোগসূত্র রয়েছে। সম্পত্তি হস্তান্তর, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য মিলেছে। একাধিক সংস্থার সঙ্গে লেনদেন, ভিন্ রাজ্যের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আর্থিক যোগ পাওয়া গিয়েছে। তবে, সে সবই যাচাই করে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি দেখা হচ্ছে, অভিযুক্তের তরফে নামে-বেনামে কোনও বিনিয়োগ হয়েছে কিনা। হয়ে থাকলে তোলাবাজির অর্থ সেখানে ব্যবহার হয়েছে কিনা, তা-ও দেখা হচ্ছে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে