দমদম জংশন স্টেশনের বাইরেও চলেছে হকার উচ্ছেদ অভিযান। রবিবার। — নিজস্ব চিত্র।
স্টেশনের বাইরে-ভিতরে যেন ঝড় বয়ে গিয়েছে। দমদম স্টেশনে ঢোকার মুখের রাস্তা থেকে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, সর্বত্র ছড়িয়ে দোকানের ধ্বংসস্তূপ। অস্থায়ী কাঠামো কোথাও আস্ত নেই। দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে থাকা কাঠামোর নীচে গড়াগড়ি খাচ্ছে বিস্কুটের বয়াম, টিফিন কেকের প্যাকেট, চায়ের ভাঁড়। পড়ে রয়েছে ফলের দোকানের ঝুড়ি, ভাঙা বেঞ্চ থেকে ছাউনির অবশেষ। আচমকা ধেয়ে আসা ঝড়ের তাণ্ডবের মতোই শনিবার বেশি রাতের উচ্ছেদের ধাক্কা রবিবার সকালেও সামলে উঠতে পারেননি দমদমের রেল এবং মেট্রো স্টেশন লাগোয়া হকারেরা। কেউ বিশ, কেউ ত্রিশ, কেউ বা চল্লিশ বছরের দোকান হারিয়ে এতটাই দিশাহারা যে, বুঝে উঠতে পারছেন না এর পরে কোথায় যাবেন।
বহু সত্যিকারের ঝড়েও এ ভাবে ঠাঁই-নাড়া হতে হয়নি তাঁদের। অনেক কাকুতি-মিনতি করেও দোকান সরিয়ে নিয়ে যাওয়া তো দূর অস্ত্, অধিকাংশ হকার কষ্ট করে কেনা জিনিসপত্রটুকুও বাঁচানোর সময় পাননি বলে অভিযোগ। রবিবার সকালে ভাঙা কাঠামো সরিয়ে পড়ে থাকা সম্বলের খোঁজে ব্যস্ত এক ব্যবসায়ী কাঁদতে কাঁদতেই বলললেন, ‘‘যে দোকানের ভরসায় পরিবারের এতগুলো পেট চলত, সেটাই তো ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। এ বার যাব কোথায়?’’
শনিবার গভীর রাতে পুরো স্টেশন চত্বর রক্ষী দিয়ে ঘিরে ফেলেন রেল কর্তৃপক্ষ। মাছি গলার পরিসরও রাখা হয়নি বলে জানাচ্ছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এর কিছু ক্ষণের মধ্যে চলে আসে রাজ্য পুলিশও। রাত দেড়টার কিছু পরে মেট্রো স্টেশনের সামনে থাকা দোকানপাট এবং এক থেকে পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মের মধ্যে থাকা দোকান ভাঙার পর্ব শুরু হয়। দমদম স্টেশন চত্বরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫০০ দোকান বুলডোজ়ার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বলে খবর। শুধুমাত্র রেলের কাছ থেকে লিজ়ে নেওয়া কিছু দোকান রেহাই পেয়েছে।
‘বেপরোয়া’ কায়দায় দোকান ভাঙা ঠেকাতে সিটু নেতৃত্ব শনিবার স্টেশনে হাজির হয়েছিলেন। সংগঠনের তরফে সোমনাথ ভট্টাচার্য, ময়ূখ বিশ্বাস, গার্গী চট্টোপাধ্যায়েরা উপস্থিত হয়ে হকারদের নিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করলেও রেল কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ চালিয়ে যান। গভীর রাতে ব্যারাকপুরের প্রাক্তন সাংসদ, ৮৬ বছর বয়সি তড়িৎ তোপদার নিজে উপস্থিত হয়ে রেল কর্তৃপক্ষকে আলোচনার জন্যসময় চেয়ে আবেদন জানালেও কর্তৃপক্ষ তাতে কান দেননি বলে অভিযোগ।
রবিবার দিনভর প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দমদম স্টেশন চত্বর পাহারা দিয়েছেন পুলিশ এবং আরপিএফ কর্মীরা। এ দিন স্টেশনের বাইরে ভাঙা দোকানের স্তূপের উপরে মাথায় হাত দিয়ে বসে ছিলেন অশোক হাইত। স্টেশনের বাইরে তাঁর আনাজের দোকান ছিল। অশোক বললেন, ‘‘যে দিন থেকে মেট্রো চলা শুরু হয়, সে দিন থেকে দোকান দিচ্ছি। এত বছর পরে এই প্রথম এ ভাবে দোকান ভাঙা পড়ল। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা রয়েছেন। সবাইকে নিয়ে পথে বসা ছাড়া গতি নেই।’’
একই কথা শোনালেন বনগাঁ থেকে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে ফল বিক্রি করতে আসা বৃদ্ধা পূর্ণিমা অধিকারী। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘‘ছেলেরা দেখে না। এই দোকানের ভরসায় দু’বেলা খেতে পেতাম। এ বার কী করব জানি না। এক রাতে সব শেষ হয়ে গেল।’’
ঘটনার প্রতিবাদে সিটু নেতৃত্ব রবিবার দমদমে মিছিল করেন। রাজ্য জুড়ে সব রেল স্টেশনে বিক্ষোভ এবং দাবিপত্র দেওয়ার কর্মসূচি নিয়েছে সিটু অনুমোদিত পশ্চিমবঙ্গ রেলওয়ে হকার্স ইউনিয়ন। একাধিক কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠন আজ, সোমবার এন্টালি থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত মিছিলের ডাক দিয়েছে।
রেল কর্তৃপক্ষ অবশ্য ঘটনা নিয়ে সম্পূর্ণ চুপ। সর্বোচ্চ স্তর থেকে এ নিয়ে মন্তব্য করতে নিষেধ করা হয়েছে বলে জানান এক আধিকারিক। তবে, রেলের আধিকারিকদের একাংশ জানিয়েছেন, দমদম-সহ শহরতলির বহু স্টেশনে বহু বার উচ্ছেদের নোটিস দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, রাজনৈতিক স্তরে বাধা ছাড়াও রাজ্য পুলিশের অসহযোগিতায় ওই অভিযান কার্যকর করা যায়নি।
রাজ্যে ডাবল ইঞ্জিন সরকার হওয়ার পরে এ নিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতা মিলছে। রেল তাই এত দিনের ‘বকেয়া কাজ’ দ্রুত শেষ করতে উঠে-পড়ে লেগেছে। আধিকারিকদের একাংশের দাবি, দখলদারির কারণে বহু স্টেশনের প্রবেশপথ এবং প্ল্যাটফর্মে হাঁটার জায়গা নেই। স্টেশন উন্নয়নের পরিকল্পনা কার্যকর করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের কথা ভেবেই উচ্ছেদের পদক্ষেপ করা হচ্ছে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে