শিশু শ্রমিকেরা থানাতেই, বিতর্ক

বাচ্চাগুলির পঠনপাঠনের ব্যাপারে উদ্যোগী হব আমরা।’’ আর রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটকও বলছেন, ‘‘এ রকম ঘটনা সম্পর্কে জানি না। খোঁজ নিয়ে দেখছি। থানার মধ্যে শিশু শ্রমিক থাকা কোনও ভাবেই অভিপ্রেত নয়।’’

Advertisement

মেহবুব কাদের চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭ ০৩:০৩
Share:

শ্রম: বালিগঞ্জ স্টেশনে আরপিএফ অফিসের সামনে কাজে ব্যস্ত এক বালক। নিজস্ব চিত্র

দৃশ্য ১: বালিগঞ্জ স্টেশনে আরপিএফ অফিসের মূল গেট। গেটের সামনেই দেখা গেল, রাজমিস্ত্রিকে জোগাড়ের কাজে সাহায্য করছে এক বালক। গেট পেরিয়ে রাস্তাতেই উর্দিধারী পুলিশকর্মী ডিউটি করছেন।

Advertisement

দৃশ্য ২: হেস্টিংসে কলকাতা পুলিশের বিদ্যাসাগর ট্র্যাফিক গার্ডের ভিতরের ক্যান্টিন। সেখানে ১৪ বছরের কম বয়সী দুই বালক থালা ধোয়া, টেবিল মোছা থেকে শুরু করে খাবার পরিবেশনে ব্যস্ত। গত দু’বছর ধরে ওই দুই শিশুই ট্র্যাফিক গার্ড ক্যাম্পাসের ভিতরে কাজ করছে।

দৃশ্য ৩: উত্তর বন্দর থানার ভিতরে ক্যান্টিনেও ছবিটা আলাদা কিছু নয়। সেখানেও দু’বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছে এক বালক।

Advertisement

শহর কলকাতাকে শিশু শ্রমিক-মুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা করাই সার! শহরের আনাচ-কানাচে দোকান, গ্যারাজ, হোটেল তো বটেই, এমনকী পুলিশের নাকের ডগায় আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শিশুদের দিয়ে কাজ করানোয় বিতর্ক দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, খোদ থানা বা ট্র্যাফিক গার্ডের মধ্যে শিশু শ্রমিক দেখলে পুলিশেরই তো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু উপরের তিনটি ক্ষেত্রেই ওই সব শিশু দীর্ঘ দিন কাজ করলেও পুলিশ কোনও ব্যবস্থাই নেয়নি বলে অভিযোগ।

বালিগঞ্জ আরপিএফ অফিসের সামনে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে গত ১৩ ডিসেম্বর। প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে এক শিশু শ্রমিককে কাজ করতে দেখা গিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বালিগঞ্জ আরপিএফ সেকশনের আইসি শুভজিৎ চৌধুরী বলেন, ‘‘এমন ঘটনার কথা জানি না। আগামী দিনে যাতে শিশু শ্রমিককে দিয়ে কাজ করানো বন্ধ করা হয়, সে ব্যাপারে সমস্ত রকম ব্যবস্থা নেব।’’

বিদ্যাসাগর ট্র্যাফিক গার্ড ও উত্তর বন্দর থানার ভিতরে ক্যান্টিনে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করা শিশু শ্রমিক প্রসঙ্গে কলকাতা পুলিশের যুগ্ম নগরপাল (সদর) সুপ্রতিম সরকার বলেন, ‘‘এরকম ঘটনা অনভিপ্রেত। খোঁজ নিয়ে দেখছি। বাচ্চাগুলির পঠনপাঠনের ব্যাপারে উদ্যোগী হব আমরা।’’ আর রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটকও বলছেন, ‘‘এ রকম ঘটনা সম্পর্কে জানি না। খোঁজ নিয়ে দেখছি। থানার মধ্যে শিশু শ্রমিক থাকা কোনও ভাবেই অভিপ্রেত নয়।’’

২০১১ সালের আদমসুমারি অনুযায়ী, গোটা পশ্চিমবঙ্গে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লক্ষের কিছু বেশি। যার মধ্যে কলকাতায় এর সংখ্যা ৩২,৫৮২। পার্শ্ববর্তী হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এই সংখ্যা যথাক্রমে ৩৩,৩৫৬, ৪৪,৪৩৭ এবং ৬৩,২৮০। মুর্শিদাবাদে এই সংখ্যা ৫৪ হাজার। রাজ্যের কোন অঞ্চলে কী ধরনের কাজে শিশু শ্রমিকদের ব্যবহার করা হয়, তার কোনও পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট নেই। রাজ্যে বেশির ভাগ শিশুশ্রমের ব্যবহার হয় মূলত অসংগঠিত ক্ষেত্রেই। কলকাতার বিভিন্ন ছোট-বড় হোটেল আর চায়ের দোকানে শিশু শ্রমিকের বাড়বাড়ন্ত। পুলিশ সূত্রের খবর, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বাজি তৈরির জন্য মূলত কাজে লাগানো হয় শিশু শ্রমিকদেরই। তবে পুলিশি ধরপাকড়ের ফলে এই প্রবণতা আগের তুলনায় কমেছে।

শিশু-অধিকার নিয়ে প্রায় চার দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের ২৩টি রাজ্যে কাজ করে চলা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পূর্বাঞ্চলীয় শাখার আধিকারিক মহুয়া চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘গত ছ’বছরে রাজ্য সরকার শিশুশ্রমের মোকাবিলায় যথেষ্ট ইতিবাচক পদক্ষেপ করলেও অবস্থা খুব উল্লেখযোগ্য রকম পাল্টেছে, তেমন বলা যাবে না।’’ তাঁর মতে, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গিয়েছে, শিশুশ্রম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকরী পথ হল ওই ছেলেমেয়েদের যথাসম্ভব স্কুলমুখী করে তোলা।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন