নাবালকদের সিগারেট বিক্রি, কড়া হবে কি শহর

মুম্বই পেরেছে। কলকাতাও কি পারবে? ১৮ বছরের কম বয়সী এক স্কুলপড়ুয়াকে সিগারেট বিক্রির দায়ে এক পান-বিড়ির দোকানদারকে বুধবার গ্রেফতার করেছে মুম্বই পুলিশ। পুলিশকর্তারা জানিয়েছেন, জুভেনাইল জাস্টিস (কেয়ার অ্যান্ড প্রোটেকশন অব চিলড্রেন) অ্যাক্ট ২০১৫-কে কাজে লাগিয়ে এমন ধরপাকড় চলতেই থাকবে।

Advertisement

সোমা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০১:০৫
Share:

মুম্বই পেরেছে। কলকাতাও কি পারবে?

Advertisement

১৮ বছরের কম বয়সী এক স্কুলপড়ুয়াকে সিগারেট বিক্রির দায়ে এক পান-বিড়ির দোকানদারকে বুধবার গ্রেফতার করেছে মুম্বই পুলিশ। পুলিশকর্তারা জানিয়েছেন, জুভেনাইল জাস্টিস (কেয়ার অ্যান্ড প্রোটেকশন অব চিলড্রেন) অ্যাক্ট ২০১৫-কে কাজে লাগিয়ে এমন ধরপাকড় চলতেই থাকবে। এখনও পর্যন্ত দেশে এই প্রথম এই আইনে কাউকে গ্রেফতার করা হল। ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পুলিশের পদক্ষেপ খুবই কাজে লাগবে বলে আশাবাদী ক্যানসার বিশেষজ্ঞেরা। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, মুম্বই যদি পারে, তা হলে এই ‘ধর্মযুদ্ধে’ কলকাতাও বা পা বাড়াবে না কেন?

আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী কাউকে সিগারেট বিক্রি করা চলবে না। কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পদার্থ বিক্রি করাও পুরোপুরি নিষিদ্ধ। মুম্বইয়ে এক নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের পাশের একটি দোকানেই বিক্রি চলছিল বিড়ি-সিগারেট। ওই স্কুলের বহু পড়ুয়াও নিয়মিত সেখান থেকে সিগারেট কেনে বলে খবর পেয়েছিল পুলিশ। সেই খবরের ভিত্তিতেই পুলিশের ওই অভিযান।

Advertisement

কলকাতার কী অবস্থা? দেশপ্রিয় পার্ক একটি স্কুলের সামনে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় দেখা গেল ছ’-সাত জন ক্রেতা দাঁড়িয়ে। অদূরে দুই কিশোর। বড়জোর বছর ১৫ বয়স। দোকান একটু ফাঁকা হতেই দোকানির দিকে টাকা বাড়িয়ে দিল তাদের মধ্যে এক জন। মুখে কিছু বলতে হল না। বিক্রেতা নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের প্যাকেট এগিয়ে দিলেন।। এ ভাবে বিক্রি করা নিষিদ্ধ তা জানেন? দোকানি বললেন, ‘‘ওরা রোজ কেনে। ওদের মতো আরও অনেকে কেনে। কেউ কোনও দিন বারণ করেনি।’’ কিন্তু আপনার দোকানের সামনে তো ১৮ বছরের কম বয়সীদের সিগারেট বিক্রির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার কথা লেখা বোর্ড ঝুলছে? দোকানি এ বার আর কথা বাড়ালেন না।

দুপুর ১টা। ধর্মতলা এলাকার একটি সিগারেটের দোকান থেকে দু’টি সিগারেট কিনল স্কুলের পোশাক পরা দুই কিশোর-কিশোরী। সিগারেট ধরিয়েও ফেলল রাস্তায় দাঁড়িয়েই। অদূরেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন কর্তব্যরত পুলিশকর্মী। কিন্তু তিনি ওই দৃশ্যকে গুরুত্বই দিলেন না। একই পরিস্থিতি দক্ষিণ কলকাতার এক নামী শপিং মল-এ। সেখানে মদ-সিগারেট বিক্রির দোকানের সামনে ১৮ বছরের কমবয়সীদের ঢোকা নিষিদ্ধ জানিয়ে বোর্ড ঝোলে ঠিকই, কিন্তু তাকে অগ্রাহ্য করে বহু কম বয়সীই অবাধে ঢুকে পড়ে সেখানে।

ক্যানসার চিকিৎসকদের মতে, সমাজের সমস্ত স্তরে এই নিস্পৃহতাই কমবয়সীদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর অনেকাংশে তার জেরেই ছড়িয়ে পড়ছে ক্যানসারের মতো মারণ রোগ। সমীক্ষা অনুযায়ী, এ দেশে যত মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হন তার মধ্যে ৪০ শতাংশের ক্ষেত্রে দায়ী তামাক। পূর্বাঞ্চলে ক্যানসার আক্রান্তদের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই মুখের ক্যানসারে আক্রান্ত। এ রাজ্যে তামাক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় দু’কোটি। প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশেরও বেশি। শুধু ক্যানসার নয়, তামাক সংক্রান্ত বিভিন্ন রোগে প্রায় ২৭ লক্ষেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করছেন ক্যানসার চিকিত্‌সকেরা।

ক্যানসার চিকিৎসক গৌতম মুখোপাধ্যায়ের মতে, টোব্যাকো অ্যাক্ট তেমন জোরদার করা যায়নি। বড়জোর ২০০ টাকা জরিমানা দিয়ে রেহাই পেয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। নতুন আইন অনেকটাই জোরালো। সাত বছর পর্য়ন্ত কারাবাস বা এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। তিনি বলেন, ‘‘কম বয়সে ধূমপান শুরু করলে ক্যানসার ঠিক তখনই হয় না। বেশ কিছু বছর সময় লাগে। একটি ছেলে বা মেয়ে দীর্ঘ চেষ্টায় যখন কেরিয়ার শুরু করে, বহু ক্ষেত্রেই দেখছি, রোগটা তখন ধরা পড়ছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।’’

তবে মুম্বইয়ের ঘটনায় ততটা আশাবাদী হতে পারছেন না বক্ষরোগ চিকিৎসক পার্থসারথি ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, ‘‘এমনিতেই ভারতীয়দের ফুসফুসের অবস্থা ভাল নয়। যে কোনও পরিস্থিতিতেই ইউরোপীয়দের তুলনায় ভারতীয়দের ফুসফুসের অবস্থা অন্তত ৩০ শতাংশ খারাপ। তিনি বলেন, ‘‘সচেতনতা বাড়ানোর পক্ষে হয়তো খুবই ভাল দৃষ্টান্ত। কিন্তু এক বার যারা নেশাটা শুরু করেছে, তাদের দমানো কঠিন। তারা অন্য কোনও না কোনও পন্থা ঠিক বার করে ফেলবে। তবে যারা এখনও নেশাটা শুরু করেনি, তাদের পক্ষে এটা ভাল।’’

বহু ক্ষেত্রেই আবার অভিভাবকদের দিকেও অভিযোগের আঙুল তুলেছেন চিকিৎসকেরা। তাঁদের বক্তব্য, অনেকেই বাড়ির ছোটদের দোকানে পাঠিয়ে সিগারেট কেনান। ‘প্যাসিভ স্মোকিং’ যেমন ক্ষতিকর, তেমনই একটা নেশার দিকে পরোক্ষ ভাবে ঠেলে দেওয়াটাও সমান ক্ষতিকর।

এই ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে হাল ধরবে কি প্রশাসন? কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (সদর) সুপ্রতিম সরকার বলেন, ‘‘এই ধরনের নজির সামনে এলে সচেতনতা বাড়ে। তবে কলকাতায় এখনও বিষয়টি তেমন উদ্বেগজনক চেহারা নেয়নি। নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement
Advertisement