প্রতীকী ছবি।
তাঁরা কেউ চিকিৎসক বা নার্স নন। প্রথাগত চিকিৎসা শিক্ষাও তাঁদের নেই। কেউই কোনও দিন হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত থাকেননি। ওষুধের দোকানের সঙ্গে যুক্ত থাকার ন্যূনতম অভিজ্ঞতাও নেই। তবুও এই অতিমারি পরিস্থিতিতে তাঁরাই বড় সহায় হয়ে উঠছেন অনেকের। স্রেফ পরিবারের শয্যাশায়ী রোগীকে বছরভর দেখভালের অভিজ্ঞতার জোরেই!
বেলেঘাটা মেন রোডের বাসিন্দা সুনিমা ঘোষ যেমন শয্যাশায়ী স্বামীর জন্য বাড়ির একটি ঘরকেই ছোটখাট হাসপাতাল বানিয়ে ফেলেছেন। ফাউলার বেড (হাসপাতালের শয্যা), অক্সিজেন সিলিন্ডার, অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর, সর্বক্ষণের হৃদ্স্পন্দন মাপার যন্ত্র— কী নেই সেখানে! গুরুতর পথ দুর্ঘটনার পরে গত পনেরো বছরেরও বেশি শয্যাশায়ী সুনিমাদেবীর স্বামী তপনবাবু। শিরদাঁড়া ভেঙে গিয়েছে।
স্বামীর দেখভালের মধ্যেই সর্বক্ষণ বেজে চলেছে সুনিমাদেবীর মোবাইল। তাতেই কাউকে পরামর্শ দিচ্ছেন, অক্সিজেন স্যাচুরেশন মাপার ঠিক পদ্ধতি কোনটা, কাউকে আবার বলে দিচ্ছেন, উল্টো হয়ে কী ভাবে শুলে শ্বাস নিতে সুবিধা হবে! সুনিমাদেবী বললেন, “এই মুহূর্তে রোগের চেয়েও বেশি করে চেপে বসছে ভয়। এই ভয় থেকেই ছোট ছোট জিনিসে ভুল হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই ওষুধপত্র নিয়ে ঘাবড়ে যান। স্বামীকে নিয়ে বছরভর পড়ে থাকতে হয়, জানি এই সময়গুলোয় কাউকে পাশে পেলে কতটা আশ্বস্ত লাগে।”
এই ঘাবড়ে যাওয়ার পরিস্থিতির কথাই শোনাচ্ছিলেন বছরভর শয্যাশায়ী মেয়েকে নিয়ে লড়াই করা অরিন্দম ব্রহ্ম। বললেন, “সর্বক্ষণ কারও না কারও ফোন আসছে। আমরা স্বামী-স্ত্রী যে হেতু সর্বক্ষণ মেয়েকে নিয়ে পড়ে থাকি, তাই আমাদের কথায় অনেকেই ভরসা পাচ্ছেন।” জানালেন, গত ২৫ এপ্রিল রাত দুটো নাগাদ তাঁর স্ত্রী তাঁকে ডেকে তোলেন। তাঁদের বাড়ি থেকে পাঁচশো মিটার দূরের একটি বাড়ির বাসিন্দা ফোন করেছেন। কারণ, তাঁর বাবার ৭৫ বছর বয়স। এ দিকে অক্সিজেন ৮০-এর নীচে নেমে গিয়েছে। রাতেই মেয়ের অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ওই বাড়িতে ছোটেন অরিন্দমবাবু। যদিও বৃদ্ধের অক্সিজেন লাগেনি। অক্সিমিটারে কম দেখালেও বৃদ্ধের শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল না। বললেন, “হাল্কা পোশাক পরিয়ে বৃদ্ধের মাথার কাছে সিলিন্ডারটা রেখে আসাতেই কাজ হল। পরদিন থেকে আর বৃদ্ধের সমস্যাই হয়নি। তাঁর মেয়ে বলেন, “মাথার কাছে সিলিন্ডার পেয়েই বাবার ভাল ঘুম হয়েছে।”
অরিন্দমবাবুই জানালেন আরও একটি ঘটনা। এক সকালে খবর আসে তাঁর এক বন্ধু বাড়িতেই মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছেন। তাঁর তো বটেই, পরিবারের আরও দুই সদস্যেরও জ্বর ছিল। বন্ধু ফোনে জানান, তাঁর অক্সিজেন ৬০-এর নীচে নেমে গিয়েছে! অরিন্দমবাবু বললেন, “কিন্তু ভিডিয়ো কলে দেখে ওকে অতটা অসুস্থ বলে মনে হল না। মাঝের আঙুলের বদলে অনামিকায় অক্সিমিটার লাগাতে বললাম। তাতেই কাজ হল। দেখা গেল, বন্ধুর স্যাচুরেশন ৯৫-এর উপরে। আসলে, ওর মধ্যমা মোটা হওয়ায় ঠিক করে অক্সিমিটার লাগাতেই পারছিল না। বন্ধু সুস্থ হওয়ার তিন-চার দিন পরে বলেছিল, “বাড়ির সকলে অসুস্থ ছিল। তখন চিন্তাতেই মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল।”
একই রকম ঘটনা শোনালেন যাদবপুরের সুলগ্না হাজরা। তাঁরও সারা বছর লড়াই চলে হৃদ্রোগে আক্রান্ত, শয্যাশায়ী বাবাকে নিয়ে। তিনি বললেন, “পাড়ারই এক ব্যক্তিকে করোনার চিকিৎসার পরে ছুটি দিয়েছে কলকাতার এক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। প্রেসক্রিপশনের লেখা পড়ে তাঁর ছেলে কিছুই বুঝতে পারেননি। ওষুধের দোকানে গেলে সেখান থেকে ওষুধ বুঝিয়ে বলে দেওয়া হয়। ভদ্রলোকের ইনসুলিনও শুরু হয়। কিন্তু ১০ দিন ওষুধ খাওয়ার পরেও কেন বাবার সুগার কিছুতেই কমছে না, সে জন্য আমায় ফোন করেন সেই ছেলে। দেখলাম, যে ইনসুলিন রাতে ঘুমনোর আগে দেওয়ার কথা সেটাই ছেলে এত দিন রাতে খাওয়ার আগে দিচ্ছিলেন! বাবাকে নিয়ে সারা বছর লড়াই করতে করতে এ সব জেনে গিয়েছি। উনিও হয়তো ধীরে ধীরে শিখে যাবেন। কিন্তু এই জরুরি সময়ে ভুল হয়ে গেলেই মুশকিল!”
ক্যানসার আক্রান্ত বাবাকে নিয়ে সারা বছর লড়াই চালানো উল্টোডাঙার সুমেধা দত্ত আবার নিজের সঙ্গেই চারটে অক্সিমিটার, ছ’টি থার্মোমিটার, দুটো রক্তচাপ মাপার যন্ত্র আর তিনটে সুগার মাপার যন্ত্র নিয়ে ঘুরছেন। সাহায্য চেয়ে ফোন এলেই জানাচ্ছেন, যাঁর যে যন্ত্রের প্রয়োজন এসে নিয়ে যেতে পারেন। রোগীর পরীক্ষা করে ফিরিয়ে দিয়ে গেলেই হবে। কখনও কখনও আবার নিজেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে জ্বর, রক্তচাপ বা সুগার মেপে দিয়ে আসছেন। বললেন, “বাবা আর কত দিন আছেন জানি না। বাবার ইচ্ছেতেই করছি। বাবা যখন হাসপাতালে ভর্তি, তখনও রোগীর রিপোর্ট এনে দিতাম, পরীক্ষা করাতে নিয়ে যেতাম।” এর পর তিনি বলেন, “করোনার লড়াই তো আমাদের সকলের। সকলকেই সেরে উঠতে হবে। যাঁরা পরিবারের লোকেদের নিয়ে একটু আগে থেকে লড়াই করছি, তাঁদের আরও দায়িত্ব নিতে হবে। এতেই ঠিক জিতে যাব আমরা। জয় হবেই।”