এই চল্লিশ-ডিগ্রি ছুঁই-ছুঁই গরম হয়তো সেকালের শহরবাসীকে নিয়মিত কাবাব বানায়নি, তবে গরম আর দহন— সেকেলে কলকাতায় দু’টোই ছিল পুরোদমে। তবুও সেকালের মানুষের মেজাজটাই ছিল আলাদা, তাই গ্রীষ্মকালও হয়ে উঠত বিলাসের মরসুম।
দ্বারকানাথের পুত্র গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেলগাছিয়ার বাগানবাড়িতে গ্রীষ্মকালীন আমোদের আয়োজন করতেন বন্ধুদের নিয়ে। অনেক সময় সঙ্গে থাকতেন কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। ঠান্ডা জল আর কচি ডাবের সঙ্গে চলত কাব্যচর্চা।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে কলকাতায় বরফ ও গ্রীষ্ম-বিলাস প্রায় সমার্থক হয়ে গেল। অনেক রাত পর্যন্ত পাড়ায় পাড়ায় বরফওয়ালার সুরেলা ডাক— ‘চাই বরফ’— শোনা যেত। রামবাগানের বিখ্যাত দত্তবাড়ির সদস্য শশীচন্দ্র ‘রাস্তার সঙ্গীত’-এ গ্রীষ্মের দহনের সঙ্গে বিরহজ্বালা প্রশমনের উপকরণও খুঁজে পেয়েছিলেন বরফ দিয়ে তরল-অগ্নি, অর্থাৎ মদিরা ঠান্ডা করার মধ্যে। কলকাতার বরফ-বিলাস যেমন সাহেবদের দান, তেমনি কুলফির উৎসে জড়িয়ে আছে মোগল সংস্কৃতির প্রভাব। বইপাড়ার শ্রীগোপাল মল্লিক লেনের মেসে বসে নানা রকম ফলের শাঁস ও রস মিশিয়ে তৈরি কুলফি খাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল অধ্যাপক ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের, সেই উনিশ শতকেই। বিংশ শতক গড়িয়ে গেলেও কলকাতায় দুই বা তিন আনায় বড় বড় কুলফি খেয়েছেন কল্যাণী দত্তরা। তবে পেস্তা-সিদ্ধির কালো কুলফির দাম বেশি হত। রাতের দিকে সেই ডাক খুঁজে নিত নেশাখোরদের।
নির্দোষ শৈশবের আনন্দ নিয়ে লিখেছেন রাধাপ্রসাদ গুপ্ত। বরফওয়ালা কাঠ-ঘষা বাটালি-আঁটা যন্ত্রের উপর বরফ ঘষে গুঁড়ো করে, তার মধ্যে একটা কাঠি গুঁজে, লাল সিরাপ দিয়ে তৈরি করত সেই আইসক্রিম। শিবনারায়ণ দাসের গলির বরফওয়ালার সিরাপের অনেক রকম রং ছিল— যেমন ‘বাইবেলোক্ত পাপের মতো’ টকটকে লাল, টিয়াপাখির নরম বুকের মতো সবুজ, ক্যানারি পাখির রঙের মতো হলদে। সেই রঙিন বরফের চাকতি স্বাদের কাছে আইসক্রিমও হার মানত।
দেশের সাংস্কৃতিক পীঠস্থান হিসেবে ঠাকুরবাড়ির অনন্য স্থান খাদ্য-সংস্কৃতিতেও অটুট থেকেছে। জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই তৈরি হত আইসক্রিম। বহু সন্ধ্যায় বাবুর্চি তালিব আলির হাতে ঘোরানো কাঠের কলে আইসক্রিম তৈরি শেষ হওয়ার জন্য বাটি হাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত বাড়ির খুদেরা। তবে আইসক্রিম এসে জায়গা দখল করার আগে পর্যন্ত একচেটিয়া বহুদিন চিনিপাতা সাদা দই আর দইয়ের ঘোল বাঙালির মাথা ও পেট ঠান্ডা রেখেছে গরমকালে। তার সঙ্গে যথাযোগ্য সঙ্গত করেছে নানা ধরনের শরবত।
সময়ের সঙ্গে ফ্রিজ কুলার এসির দৌলতে জীবন স্বেচ্ছা-শীতল হয়তো। নানা ব্র্যান্ডের আইসক্রিম, নরম পানীয়ের পসরায় ছেয়েছে বাজার। তবু আজও শহরের অলিগলিতে সাধারণ ঘরের শিশুরা ছেঁকে ধরে সেই কুচো বরফের চাকতি আর কাঠি-কুলফির গাড়ি। আর সব পেরিয়ে রয়ে গেছে তৃষ্ণার জল, যেমন উপরের ছবিতে!
একশো পেরিয়ে
চলচ্চিত্রের সফল শিল্পনির্দেশক শুধু কারিগর বা কুশলী চিত্রকর হলেই তা যথেষ্ট হবে না— সমাজ ইতিহাস মানবচরিত্র, নানা বিষয়ে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিচেতনাও তাঁর থাকা দরকার, মনে করতেন বংশী চন্দ্রগুপ্ত। ব্যক্তি ও শিল্পীর এই অন্তর্দৃষ্টির দৌলতেই, শিল্পনির্দেশনায় তাঁর সমকক্ষ অন্তত তাঁর সমকাল পর্যন্ত ভারতবর্ষের চলচ্চিত্র ইতিহাসে আর কেউ হয়নি বলে মত ছিল সত্যজিৎ রায়ের। ১৯২৪-এ অবিভক্ত পঞ্জাবে জন্ম, জম্মু কাশ্মীরে বড় হওয়া বংশী ক্রমে হয়ে ওঠেন ভারতীয় সিনেমার শিল্পনির্দেশনায় অগ্রপথিক। ১৯৮১-তে প্রয়াণের অব্যবহিত পরে ‘নর্থ ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি’র পত্রিকা চিত্রভাষ তাঁকে নিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য সংখ্যা করেছিল, জন্মশতবর্ষ পেরিয়ে তারাই এ বার প্রকাশ করল বই, বংশী চন্দ্রগুপ্ত: একশো পেরিয়ে। রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার, সত্যজিৎ রায় মৃণাল সেন তরুণ মজুমদার হরিসাধন দাশগুপ্তের মতো পরিচালক ও সুধেন্দু রায় রবি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ শিল্পনির্দেশকের মূল্যায়ন, আরও নানা জরুরি লেখা। ছবি, প্রচ্ছদ থেকে।
প্রতিষ্ঠাদিবসে
১৯৭২-এর ৩০ মে ‘প্রতিকৃতি’ নাট্যদলের প্রতিষ্ঠা। সে-কাজে অগ্রণী ভূমিকা দীপা চট্টোপাধ্যায়ের, তাঁর সূত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে গুরু হিসেবে পায় দল। তৈরি হয় কয়েকটি একাঙ্ক: বিধি ও ব্যতিক্রম, ছোটবকুলপুরের যাত্রী, সমুদ্র সওয়ার, উৎপল দত্তের হিমালয়ে জীবন্ত মানুষ; পরবর্তী কালে আলোক দেবের নির্দেশনায় পূর্ণাঙ্গ প্রযোজনা মনোজ মিত্রের কেনারাম বেচারাম। নব নব প্রযোজনার সঙ্গে পাল্টেছে প্রয়োগকলা, মঞ্চে হয়েছে বিরসা মুন্ডার গান, দর্পণে শরৎশশী, সাদাখোল কালোপাড়, দম্পতি, পদ্মানদীর মাঝি, কোপাই নদীর বাঁকে, এনিমি। ‘নাটকের বইমেলা’ও করেন ওঁরা। ৫৪তম জন্মদিনে আজ অ্যাকাডেমি মঞ্চে সন্ধে সাড়ে ৬টায় পদ্মানদীর মাঝি-র অভিনয়।
স্মরণে, সঙ্গীতে
প্রয়াণের পরে কেটে গেছে বেশ কয়েক বছর, কিন্তু স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত দ্বিজেন্দ্রগীতি মন্ত্রগান শোনার সুখস্মৃতি শ্রোতা-মনে অক্ষয় আজও। ওঁর ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই কৃতী, বইছেন ওঁর গায়নের উত্তরাধিকার। বিশ্বভারতীর সঙ্গীত ভবন ছাপিয়ে তাঁর গাওয়া গানের আদর বাঙালি মননে চিরস্থায়ী। ওঁর সত্তরতম জন্মদিন উপলক্ষে মধ্য কলকাতার সুবর্ণবণিক সমাজ হলে একত্র হচ্ছেন গুণিজনেরা, আগামী শুক্রবার ৫ জুন বিকেল ৫টায়। বোলপুর, কলকাতা মিলেমিশে যাচ্ছে সেদিন। সঙ্গীত ভবনের প্রাক্তনী যাঁরা স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের ছাত্রছাত্রী, গাইবেন তাঁরা, সঙ্গে কলকাতার গুণী শিল্পীরাও। থাকবেন শিক্ষা ও সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্টজন— ওঁর গুণমুগ্ধেরা। নিবেদনে ‘ট্রায়ো’।
ফুলের নদী
তিন ভাইবোন আর ঠাকুমা কষ্টে দিন কাটায় গ্রামে। ঠাকুমা গল্প বলেন, প্রকৃতি নাকি এক বুড়ির রূপে আশ্রয় চাইতে এসেছিল, তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়, সেই অভিশাপেই হারিয়ে যায় গ্রামের নদী। ছোট্ট মেয়ে ‘ফুল’ ঠিক করে, নদীকে ফিরিয়ে আনবে সে। ক্ষুধা, ক্লান্তি, ভয়াল জঙ্গল, পশুপাখি, সব পেরিয়ে সে এগোয় দয়া ও সাহস সঙ্গে নিয়ে: কাক, নেকড়ে ও গাছেরা তার বন্ধু হয়ে ওঠে। পাহাড়ে গিয়ে সে নদীর উৎস খুঁজে পায়, পায় তাকে ফিরিয়ে আনার অনুমতি। ফুলের সঙ্গে নদী ফেরে গ্রামে, শুকনো জমি ফের উর্বর হয়, ফিরে আসে আনন্দ। জয়া মিত্রের আখ্যান ‘তিন ভাইবোনের নদী’ অবলম্বনে ‘গোত্রহীন দমদম’ তৈরি করেছে নাটক আকাশ মাটি ফুলের নদী, সুপ্রতিম রায়ের নির্দেশনায় আজ থিয়ে-অ্যাপেক্সে পর পর দু’টি অভিনয়, সন্ধে সাড়ে ৬টা থেকে।
অন্য রকম
বাণী এক, কিন্তু সুরান্তর/ছন্দান্তর রয়েছে, এমন রবীন্দ্রসঙ্গীতের সংখ্যা কম নয়। মূলত নৃত্যযোজনা ও সম্মেলকের প্রয়োজনে এই পরিবর্তন করা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। এই বিষয়েই অন্য রকম উদ্যোগ সঙ্গীত সংস্থা ‘রবিচেতন’-এর, সাগরময় ভট্টাচার্যের ভাবনায়। একক ও সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হবে একই রবীন্দ্রসঙ্গীতের দু’টি ভিন্ন রূপ। আজ বিকেল সাড়ে ৫টায় যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমিতে সমবেত গানে মেঘমল্লার, রবিছন্দম, আনন্ত্য শিল্পীগোষ্ঠী, বারাসত গীতিসুধা, স্বপ্ননীল, পুনশ্চ, গান্ধর্বী ও রবিচেতন-এর শিল্পীরা, একক গানে সংস্থাগুলির প্রশিক্ষকেরা। প্রকাশ পাবে সাগরময়ের বই রবীন্দ্রগানের জনপ্রিয় রূপান্তর: রেকর্ড থেকে স্বরলিপি (প্রকা: বইওয়ালা বুক ক্যাফে), থাকবেন পূর্ণেন্দুবিকাশ সরকার অলক রায়চৌধুরী প্রমুখ।
চিত্রজগতের কবি
চলচ্চিত্রের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল কাজী নজরুল ইসলামের। ফ্রান্সিস ম্যাডানের পায়োনিয়ার ফিল্ম কোম্পানিতে চলচ্চিত্র-সঙ্গীত বিভাগে নিয়োগ পেয়েছিলেন; এদেরই প্রযোজিত, গিরিশচন্দ্র ঘোষের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ধ্রুব ছবিতে (মুক্তি ১ জানুয়ারি ১৯৩৪) মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্রে তাঁর প্রথম আবির্ভাব। এ ছবিতে একাধারে গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পী তিনি, আবার নারদচরিত্রে (ছবি) অভিনেতাও। ছবিতে ১৮টি গান ছিল, নজরুল একক কণ্ঠে ৩টি ও ধ্রুবরূপী মাস্টার প্রবোধের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে একটি গান করেন। গোড়ায় ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে ভয় ছিল, পরে আশ্বাস পেয়ে নারদের বেশ পরেন: সিল্কের পাড়ওয়ালা ধুতি, পাঞ্জাবি, মাথায় চূড়া, হাতে একতারা, পায়ে খড়ম। কবির জন্মদিনের আবহে ‘জীবনস্মৃতি আর্কাইভ’ ও ‘অন্য থিয়েটার’-এর উদ্যোগে ধ্রুব-র ৯৯ মিনিটের অসম্পূর্ণ এবং দৃশ্য-শ্রবণগত ভাবে ত্রুটিসমন্বিত একটি ডিজিটাল প্রিন্ট দেখানো হবে আজ বিকেল ৫টায় সল্ট লেকের অন্য থিয়েটার ভবনে। গত ২৬-২৮ মে এখানেই হয়ে গেল ‘ছায়াছবিতে নজরুল’ প্রদর্শনীও।
যৌথতার শিল্প
অজিত কুমার দাস অলকানন্দা সেনগুপ্ত অরুণিমা চৌধুরী চন্দ্র ভট্টাচার্য কার্তিক পাইন ললিতমোহন সেন পার্থ দাশগুপ্ত রাহুল সরকার রাজা বোরো সায়নদীপ কংসবণিক সুব্রত বিশ্বাস ও তাপস বিশ্বাসের ছবি ভাস্কর্য আলোকচিত্র সেরামিক্সের কাজের প্রদর্শনী ‘অ্যান এনশিয়েন্ট ব্যালাড’ শুরু হল, ইমামি আর্ট-এর পরিবেশনায় কেসিসি-তে, গত ২২ মে থেকে। জ্যেষ্ঠ ললিতমোহন ও কনিষ্ঠ রাহুল সরকারের অন্তর্ভুক্তিতে বঙ্গীয় শিল্পচর্চার উনিশ শতকের অন্তিমভাগ থেকে একবিংশ শতক শুরুর দীর্ঘ যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন বর্তমান। শিল্পীদের মাধ্যম নির্বাচন ও প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন, কিন্তু প্রত্যেকের কাজেই জড়িয়ে প্রকৃতিভাবনা (ছবি); শিল্পচর্চার পালাবদলের অভিমুখ, সমকালীনতার ছাপ— যেন এক পালাগানের মতো, যৌথতার শিল্প। ১০ জুলাই পর্যন্ত দেখা যাবে।
সুন্দরবন নিয়ে
এক অখণ্ড ভৌগোলিক সত্তা, কিন্তু দুই দেশের রাজনৈতিক সীমারেখায় বিভক্ত সুন্দরবন। এই বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে, সুন্দরবনের সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত সংহতি তুলে ধরার প্রয়াস ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস ফর কালচার (ইইউএনআইসি) ঢাকা ও কলকাতা শাখার প্রকল্প ‘সুন্দরবনস অ্যাক্রস বর্ডারস’। এর ভারতীয় পর্যায়ে সুন্দরবনের জীবন, পরিবেশ ও সংস্কৃতির অনুসন্ধান করা হয়েছে, গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ভূমিজ জ্ঞান ও স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ রক্ষায় নারীর অনবদ্য ভূমিকায়। সায়ন্তন মৈত্র তৈরি করেছেন তথ্যচিত্র সাগর সম্পূটে। জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে রাঙাবেলিয়া মহিলা সমিতির নারীদের লড়াই এই ছবিতে ফুটে উঠেছে। গত ২৮ মে সন্ধ্যায় গ্যেটে ইনস্টিটিউট-ম্যাক্সমুলার ভবনে আয়োজিত প্রকল্পের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে সদস্যরা কাজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন, দেখানো হলো ছবিটি।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে