Nazirabad Fire Accident

ছাইয়ের স্তূপেই দিনভর স্বজনের খোঁজ মৃত্যুপুরী নাজিরাবাদে

রবিবার গভীর রাতে নরেন্দ্রপুরের নাজিরাবাদের গুদামে ভয়াবহ আগুনে মঙ্গলবাররাত পর্যন্ত আট জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে পুলিশ।

সমীরণ দাস , মেহবুব কাদের চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৪
Share:

বিশ্রাম: নাজিরাবাদের পোড়া গুদামে একনাগাড়ে কাজ করতে করতে একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন এক দমকলকর্মী। মঙ্গলবার। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক।

এক কোণে পড়ে ‘ফিমার বোন’। পাশে পুড়ে যাওয়া হাড়ের অংশ। ধ্বংসস্তূপে ঢুকেই থমকে গেল ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের পা। তাঁদের তীক্ষ্ণ নজর আটকে গেল ওই হাড়েই। যেগুলির বেশ কয়েকটি পোড়া, ছাই মাখা। কয়েকটি আবার মাংস খুলে যাওয়ার পরে সাদা অবস্থায় পড়ে। ছাইয়ের স্তূপে এমনই বহু হাড় পেরিয়ে ঢুকলেন দমকলকর্মী ও উদ্ধারকারীরা। এমনই ছাইয়ের স্তূপে পা পড়তেই দেখা গেল, সেখানে সবটাই ছাই! বোঝা গেল, ওই স্তূপ আদতে পুড়ে যাওয়া মানুষের হাড়ের অংশবিশেষ!

শুধু কি মানুষের পুড়ে যাওয়া হাড়! গুদামের সামনেই আগুনের আঁচে পুড়ে গিয়েছে একাধিক বড় গাছও। রবিবার গভীর রাতে নরেন্দ্রপুরের নাজিরাবাদের গুদামে ভয়াবহ আগুনে মঙ্গলবাররাত পর্যন্ত আট জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে পুলিশ। এখনও নিখোঁজ বহু মানুষ। এ দিন সকালে ঘটনাস্থলে যেতেই চার পাশের বাতাসে পাওয়া গেল পোড়া গন্ধ। দুপুরেও সেখানকার বিভিন্ন অংশে ‘পকেট ফায়ার’ নেভাতে ব্যস্ত ছিলেন দমকলের কর্মীরা। আগুনের উত্তাপে ধ্বংসস্তূপেও দাঁড়ানো যাচ্ছিল না। একাধিক হাড়ের টুকরোর কাছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে মদের বোতল। পাশেই আগুনের তাপে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া টিনের টুকরো। পুলিশ ও দমকলকর্মীদের ধারণা, ঠিক ওই অংশেই দুর্ঘটনার সময়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন খেটে খাওয়া মজদুরেরা।

এ দিন বেলা বাড়তেই পূর্ব মেদিনীপুরের ময়না বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক অশোক দিন্দা ঘটনাস্থলে আসেন। মৃত ও নিখোঁজদের বেশির ভাগই অশোকের বিধানসভা এলাকার বাসিন্দা। অশোক জানান, অন্তত ২৭ জন এখনও নিখোঁজ। চার জন আগুন থেকে বেঁচে ফিরেছেন। এ দিন দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেল, চার দিকে পড়ে রয়েছে পুড়ে যাওয়া থালা। ডেকরেটর্সের গুদামে আগুন নিভলেও পাশের মোমোর গুদামে গিয়ে দেখা গেল, ভিতরে একাধিক জায়গায় আগুন নেভাতে ব্যস্ত দমকলের কর্মীরা। ওই গুদামের ভিতরে তখনও ধিকি ধিকি আগুন জ্বলছে। আগুন নেভানোর জলে চার দিকে থই থই দশা।

অশোক এলাকায় আসার আগে থেকেই পুড়ে যাওয়া গুদামঘরের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন স্থানীয় বিজেপির নেতা-কর্মীরা। কী ভাবে জলাভূমি ভরাট করে গুদাম তৈরি হল, সেই প্রশ্ন তোলা হয়। মৃতদের নামের তালিকা প্রকাশেরও দাবি জানানো হয়। বেলা ১১টা নাগাদ ঘটনাস্থলে আসেন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু। তাঁর গাড়ির সামনে স্লোগান দেওয়া হয়। বিজেপির অভিযোগ, এর পরেই তৃণমূলের গুন্ডাবাহিনী এসে তাদের লোকজনকে মারধর করে সরিয়ে দেয়। দলের যাদবপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি মনোরঞ্জন জোদ্দার বলেন, “ওই এলাকায় সারা বছরই তৃণমূলের সন্ত্রাস চলে। আজও আমাদের কর্মীরা শান্তিপূর্ণ ভাবে স্লোগান দিচ্ছিলেন। তখনই আমাদের উপরে আক্রমণ করা হয়। দু’জন কর্মী জখম হয়েছেন। পুলিশকে জানিয়েছি।” তৃণমূলের যদিও দাবি, বিক্ষোভ দেখিয়েছেন স্থানীয়েরা।

এলাকা যে কার্যত জতুগৃহ হয়ে ছিল, তা মেনে নেন সুজিত। খতিয়ে দেখা, আইনি পদক্ষেপের আশ্বাস দেন। সোমবার থেকেই ঘটনাস্থলে ভিড় করতে থাকেন নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যেরা। রাতে অনেকেই এলাকার একটি অতিথিশালায় ছিলেন। সকাল হতেই তাঁরা হাজির হন নরেন্দ্রপুর থানায়। নিখোঁজ ডায়েরি করেন। দিনভর কখনও থানায়, কখনও ঘটনাস্থলে ঘুরে বেড়ান তাঁরা। মৃত্যুপুরী নাজিরাবাদ জুড়ে ছিল স্বজন হারানোর কান্না।

এ দিন দুপুরের দিকে উদ্ধার হওয়া দেহাংশ নিয়ে পুলিশ ময়না তদন্তে যাওয়ার সময়ে থানার সামনেই পুলিশের গাড়ি ঘিরে ধরে ক্ষোভে ফেটে পড়েন মৃত ও নিখোঁজদের পরিবারের লোকজন। কেন তাঁদের না দেখিয়েই দেহ নিয়ে চলে যাওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। পুলিশ বোঝায়, দেহাংশ যা উদ্ধার হয়েছে, তা চেনার মতো অবস্থায় নেই। রাতে পরিবারের লোকজনকে ডাকা হয় খেয়াদহ-২ পঞ্চায়েত দফতরে। সেখানে পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন। ডিএনএ পরীক্ষার পরেই দেহাংশ চিহ্নিত করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন