Hawker Eviction

পরের দিনের উপার্জন হবে কী ভাবে, অনিশ্চয়তা নিয়েই চলছেন ওঁরা

গড়িয়ায় সায়রার বাড়ি গিয়ে দেখা গেল, নিজের এক ছেলে ও দুই মেয়ের পাশাপাশি বোন এবং বোনের মেয়ের দায়িত্বও বহন করেন তিনি। সংসার খরচের বড় অংশটাই আসত স্টেশনের দোকান থেকে।

হিন্দোল ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ ০৭:৫৭
Share:

পরিবারের সঙ্গে হকার কৌশিক ঘোষ। ছবি: সুমন বল্লভ।

“এখন আমার কাজ দোকান চালানো নয়, বরং পুলিশ আসছে কিনা সেটা দেখে অন্যদের খবর দেওয়া।”— কথাটা বলতে বলতে গলা কেঁপে উঠল সায়রা বানুর। বিগত ৩০ বছর ধরে শিয়ালদহ স্টেশনের ১৮-১৯ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ঘুগনির দোকান চালাতেন তিনি। সকাল থেকে রাত, যাত্রীদের ভিড়ে গমগম করত দোকান। আজ সেই দোকান নেই। নেই নিয়মিত আয়ের কোনও পথও। শিয়ালদহে হকার উচ্ছেদের পরে সায়রার মতো বহু পরিবারের জীবন এক ধাক্কায় বদলে গিয়েছে।

গড়িয়ায় সায়রার বাড়ি গিয়ে দেখা গেল, নিজের এক ছেলে ও দুই মেয়ের পাশাপাশি বোন এবং বোনের মেয়ের দায়িত্বও বহন করেন তিনি। সংসার খরচের বড় অংশটাই আসত স্টেশনের দোকান থেকে। গত ১৫ মে-র উচ্ছেদের পরে সায়রার স্বামী স্টেশন চত্বরের বাইরে ঘুরে ঘুরে সামান্য কিছু জিনিস বিক্রির চেষ্টা করছেন। আর সায়রা মাঝেমধ্যে প্ল্যাটফর্মে গিয়ে অন্য হকারদের সতর্ক করছেন, দেখছেন কোথাও পুলিশি তৎপরতা বাড়ল কিনা। তাঁর কথায়, “দোকানটা ছিল বলে সবাইকে নিয়ে কোনও রকমে চলতাম। এখন রোজ সকালে উঠে ভাবতে হয়, আজ কত টাকা রোজগার হবে। বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের জীবনটা শেষ করার কথা ভাবিনি।”

অনিশ্চয়তার এই একই ছবির দেখা মিলল বেলেঘাটার এক ভাড়া বাড়িতেও। শিয়ালদহ স্টেশনের ১৬-১৭ নম্বর প্ল্যাটফর্মে পাউরুটি ও মিষ্টির দোকান ছিল রঞ্জিত শূরের। সেই দোকানের ইতিহাস প্রায় পাঁচ দশকের। পারিবারিক সূত্রে ১৯৭৭ সাল থেকে ওই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রঞ্জিতদের পরিবার। হঠাৎ উচ্ছেদের পরে আয়ের প্রধান উৎসটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। রঞ্জিতের মেয়ে রাইমা আগামী বছর মাধ্যমিক দেবে। ছেলে পড়ে চতুর্থ শ্রেণিতে। রাইমার দীর্ঘদিনের শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে। প্রতি মাসে ওষুধের পিছনে খরচ হয় এক থেকে দেড় হাজার টাকা। আগে সেই খরচ মেটানো গেলেও এখন প্রতিটি টাকার হিসাব করতে হচ্ছে। সংসারের হাল ধরতে রঞ্জিতের স্ত্রী বাচ্চা দেখাশোনার কাজ শুরু করেছেন। রঞ্জিত বললেন, “এখন ঘুরে ঘুরে বাদাম বিক্রি করছি। বাধ‌্য হয়ে মেয়ের প্রাইভেট টিউশন বন্ধ করতে হয়েছে।” পাশ থেকে রাইমা বলল, “আমি সায়েন্স নিয়ে পড়তে চাই। পরে সাইকোলজি নিয়েও পড়ার ইচ্ছা আছে। কিন্তু বাড়ির অবস্থা দেখে খুব চিন্তা হয়।”

১৮-১৯ নম্বর প্ল্যাটফর্মের আর এক পরিচিত মুখ কৌশিক ঘোষ। তাঁর ছিল লেবুর জল ও শরবতের দোকান। কৌশিকদের বাড়িতে ঢুকতেই দেখা গেল, ছোট মেয়ে খেলনা দিয়ে ঘর বানানোর খেলায় ব্যস্ত। বাস্তবে তাঁদের নিজের সংসারই আজ টালমাটাল। কৌশিকের ছেলে বাণিজ্য নিয়ে পড়াশোনা করছেন। সংসারের খরচ কমাতে তাঁকে আপাতত মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হয়েছে। কৌশিকের কথায়, “আগেও সমস্যা হয়েছে, কিন্তু আবার দোকান খুলতে পেরেছি। এ বার পুলিশের নজরে এলেই প্রায় ১২০০ টাকা জরিমানা দিতে হচ্ছে। ছেলেকে বাড়ির বাইরে পাঠাতে হয়েছে, এটা কোনও বাবার জন্য সহজ নয়।”

শিয়ালদহ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম এখন অনেকটাই ফাঁকা। যাত্রীদের চলাচল হয়তো কিছুটা মসৃণ হয়েছে। কিন্তু হকার উচ্ছেদের ফলে সেই ফাঁকা জায়গার আড়ালে তৈরি হয়েছে অন্য এক কঠিন বাস্তব। যেখানে রঞ্জিত, কৌশিক, সায়রাদের মতো পরিবারগুলি প্রতিদিন নতুন করে হিসাব কষছে, কী ভাবে পরের দিনটা পার করবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন