কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহল। —নিজস্ব চিত্র।
সুকমা থেকে সটান শ্যামবাজার! ছত্তীসগঢ়ের মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকা থেকে সটান কলকাতায়! কারণ, পশ্চিমবঙ্গে ভোট আসছে। আর ভোট এলে তো তাঁদের আসতেই হবে। উত্তর কলকাতার সরু-মাঝারি গলি দিয়ে একজনের পর একজন লাইন করে হেঁটে যাচ্ছেন। শহরের বিবিধ আওয়াজে তাঁদের বুটের শব্দ কান না পাতলে শোনা যায় না। তবে লাঠি দিয়ে তাঁরা নিজেদের বুটে হালকা টোকা মারছেন। ধুপধাপ শব্দ হচ্ছে তাতে।
এখনও রাজ্যে ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়নি। কিন্তু কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহলদারিতে বোঝা যাচ্ছে, দুয়ারে ভোট!
কিন্তু কেমন টহল দিচ্ছে কেন্দ্রীয় বাহিনী? কখন টহল দেয় তারা? কোথায়? ভোট ঘোষণার এত আগে এসে তারা করছেটা কী? শহরে তাদের জন্য কী কী ব্যবস্থা রয়েছে? থাকছে কোথায়? খাচ্ছে কোথায়?
শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী চলেছে বাটা মোড়ের দিকে। —নিজস্ব চিত্র।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের জন্য মোট ৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। জওয়ান এবং কর্মী মিলিয়ে এক কোম্পানিতে অন্তত ১২০ জন করে সদস্য। অর্থাৎ, গোটা পশ্চিমবঙ্গের জন্য আনুমানিক ৫৭,৬০০ জওয়ান মোতায়েন করা হচ্ছে। কোথায় কত বাহিনী মোতায়েন থাকবে, তা-ও চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে। মার্চের প্রথম দিকে ২৪০ কোম্পানি (অর্থাৎ ২৮,৮০০ জন) বাহিনী রাজ্যে চলে এসেছে। কলকাতায় আপাতত ৩০ কোম্পানি (অর্থাৎ ৩,৬০০ জন) বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আপাতত তারা শহরে এলাকা চেনার কাজ শুরু করেছে।
কেমন সেই এলাকা চেনা, তা দেখতেই যাওয়া। তখন বিকেল সাড়ে ৪টে। কাশীপুর থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জন্য ভাড়া-করা প্রাইভেট বাস এসে দাঁড়াল শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের কাছাকাছি। আপাতত তাদের ঠিকানা কাশীপুর পলিটেকনিক কলেজ। তার আগেই স্থানীয় থানার কয়েক জন পুলিশকর্মী শ্যামবাজার মোড়ে চলে এসেছিলেন। উত্তর কলকাতায় শ্যামপুকুর, বৌবাজার, তালতলা, মুচিপাড়া থেকে শুরু করে দক্ষিণ কলকাতায় রাসবিহারী বা টালিগঞ্জ— দিনের বিভিন্ন সময় কেন্দ্রীয় বাহিনী টহল দিচ্ছে। যে বাহিনীর পায়ে পায়ে টহল দেবে আনন্দবাজার ডট কম, তারা টহল শুরু করবে শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় থেকে।
সাংবাদিক দেখেই বাহিনীর জওয়ানেরা অবশ্য সাবধান হয়ে গিয়েছিলেন। তবে কয়েক ঘণ্টা ধরে তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে টহল দেওয়ায় বাধা খানিকটা ভেঙেছিল।
উত্তর কলকাতার অলি-গলিতেও চলছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ‘রুট মার্চ’। —নিজস্ব চিত্র।
পাঁচমাথার মোড়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অশ্বারূঢ় মূর্তি পেরিয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী চলল বাটা মোড়ের দিকে। ২১ জনের দল। তাঁদের পোশাক আর কাঁধের অস্ত্র দেখে মনে হচ্ছিল ‘অ্যাকশন’-এর জন্য একেবারে তৈরি। অথচ সাড়ে সাত কিলোমিটার পথ শুধু হাঁটলেনই। কাউকে কিচ্ছু বললেন না। রাস্তায় লাঠিটিও পর্যন্ত ঠুকলেন না। কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করায় বাহিনীর একজন বললেন, ‘‘এখন আমাদের কাজ শুধু দেখা।’’ কী কী দেখছেন? উত্তর এল, কোথায় কোন ক্লাব আছে, কোন গলি কোন রাস্তায় গিয়ে উঠছে, আপাতত সে সব নজর করছেন বাহিনীর সদস্যেরা। কিন্তু ভোটের সময় গোলমাল হলে কি সদ্যচেনা এই সমস্ত অলিগলি মনে থাকবে? টহল দিতে দিতেই এক জওয়ানের জবাব এল, ‘‘তব হি দেখ লেনা ম্যাডাম!’’
বাহিনীর এই টহলের পোশাকি নামই ‘রুট মার্চ’। শ্যামবাজার, বাগবাজার, রবীন্দ্র সরণি, গ্যালিফ স্ট্রিট-সহ আশপাশের ছোট-বড় রাস্তায় প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলল সেই ‘মার্চ’। সমস্ত পথে একবারও বাহিনীর সদস্যেরা কেউ কাউকে টপকে এগিয়ে গেলেন না! হাঁটার গতি কমিয়ে পিছিয়ে গেলেন না কখনও! টহলদারির একেবারে সামনে ছিলেন ইনস্পেক্টর পদমর্যাদার এক অফিসার। তাঁর সঙ্গে কলকাতা পুলিশের এক সার্জেন্ট। পিছনে ছিলেন কলকাতা পুলিশের আরও এক কর্মী।
দোলের দিন থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী কলকাতায় ‘রুট মার্চ’ শুরু করেছে। শহরে আসার পর থেকে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা মিলিয়ে গড়ে ২০ কিলোমিটার করে টহল দিচ্ছে ‘পল্টন’। বাহিনীর কেউ থাকেন রাজস্থানে, কেউ উত্তরপ্রদেশে, কেউ বিহারে, কেউ আবার হরিয়ানায়। দিল্লি থেকেও কেউ কেউ এসেছেন। আবার রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দাও। অনেকের আগেও এই রাজ্যে ভোটের সময় কাজ করার অভি়জ্ঞতা রয়েছে। তবে এই টহলদারদের কেউ কখনও ভোটসংক্রান্ত হিংসাত্মক গোলমালের মধ্যে পড়েছেন বলে মনে করতে পারলেন না।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহল দেখতে ব্যস্ত এক বাসিন্দা। —নিজস্ব চিত্র।
জানা গেল, এর আগে একজন ভোটের সময় দুর্গাপুরে ছিলেন। একজনের ডিউটি পড়েছিল ঝাড়গ্রামে। তবে কোথাও তেমন কোনও গোলমাল হয়নি। নির্বিঘ্নেই মিটেছিল ভোট। শুধু এ রাজ্য নয়। কাশ্মীর, ছত্তীসগঢ়, বিহারের ভোটেও গিয়েছেন কেউ কেউ। পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতির কথা ভেবে এখনই তাঁরা চিন্তিত নন। বস্তুত, বাহিনীর এক সদস্য জানালেন, এটাই তাঁর প্রথম ভোটে কাজ করা। পশ্চিমবঙ্গের ভোট সম্পর্কে কিছু শুনেছেন? সংক্ষিপ্ত এবং সাবধানি উত্তর এল, ‘‘দেখা যাক না কেমন হয়।’’
টহলের পথে ট্রামলাইন দেখে পুরনো কথা মনে পড়ে গেল এক জওয়ানের। জানালেন, বেশ কয়েক বছর আগে তিনি কলকাতায় এসেছিলেন। ট্রামেও চড়েছিলেন। আগের চেয়ে কোনও বদল দেখছেন? এত অলিগলি টহল দিচ্ছেন, ভোটের গতিপ্রকৃতি কিছু বুঝতে পারছেন? এক জওয়ান জবাব দিলেন, কাজ করতে এসেছেন। কাজ করে চলে যাবেন। রাজনীতি নিয়ে কথা বলবেন না। তবে টহলের শেষের দিকে একজনকে খানিক উৎসাহী শোনাল। জানতে চাইলেন, ‘‘আপনাদের রিপোর্ট কী বলছে? এ বার কী হবে?’’
টহল যেমন বাহিনীর সদস্যদের নতুন এলাকা চিনে নিতে সাহায্য করে, তেমনই ভোটারদের আত্মবিশ্বাসও বৃদ্ধি করে। একের পর এক বাড়ি, ক্লাব, পাড়ার বাচ্চাদের ক্রিকেট খেলার পাশ কাটিয়ে বাহিনীর যাওয়ার পথে চায়ের দোকান থেকে কেউ এক বলে উঠলেন, ‘‘এটা শান্তিপূর্ণ এলাকা।’’ কারও চাপা স্বরও স্পষ্ট শোনা গেল, ‘‘এরা সব বাইরে থেকে ঘুরতে এসেছে।’’ কোথাও বাসিন্দারা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন। কোথাও বারান্দা থেকে উঁকি মারল এক ঝাঁক উৎসাহী চোখ।
টহলদার কেন্দ্রীয় বাহিনীকে দেখে আত্মবিশ্বাস বাড়ছে? পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানের আড্ডায় প্রশ্ন করতে এক প্রবীণ বললেন, ‘‘ওদের দেখে তো চমকে গেলাম!’’ পাশ থেকে একজনের নির্লিপ্ত মন্তব্য, ‘‘ভোটের সময় যা হওয়ার তা-ই হবে। ওরা কি সকলকে পাহারা দিতে পারবে?’’ বাহিনীর সদস্যেরা অবশ্য মনে করেন, তাঁদের উপস্থিতি ‘অবাঞ্ছিত ঘটনা’ আটকাতে পারে। ভোটের দিনেও তাঁরা এলাকায় টহল দেবেন। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক জওয়ানের কথায়, ‘‘হর এক বুথ পর জায়েঙ্গে।’’ অর্থাৎ, ভোটের দিন বুথে বুথে ঘুরবেন।
কলকাতায় থাকা নিয়ে অবশ্য কারও কোনও অভিযোগ নেই। থাকার উপায়ও নেই। শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর সদস্য হাজার হোক। গলায় মানিয়ে নেওয়ারই সুর, ‘‘হঠাৎ করে এত জন চলে এসেছি। ব্যবস্থা করার সময় দিতে হবে তো!’’ তবে ব্যবস্থা ঠিকঠাক থাকলে যে সুবিধা হয়, তা-ও জানালেন। জওয়ানদের যা প্রয়োজন, তা স্থানীয় পুলিশকে জানানো হচ্ছে। পুলিশের তরফ থেকেও নির্দিষ্ট অ্যাপে সে সব চাহিদার কথা উপরমহলে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সকলেরই কাঁধে ঝুলছে একে ফর্টি সেভেন রাইফেল, অনেকের হাতে লাঠিও। প্রায় তিন ঘণ্টার ‘রুট মার্চ’ শেষে কাউকে ক্লান্ত দেখাল না একটুও। একজন শুধু বললেন, ‘‘জঙ্গলে আমরা এর চেয়েও বেশি সময় টহল। কোনও অসুবিধা হয় না। এখানে তো আরওই সমস্যা হচ্ছে না। এখানকার জলের স্বাদটাই আলাদা।’’