এক জন ভোজনরসিক বসেছেন, চোখে গামছা বাঁধা। তাঁর পাতে একে একে আম দেওয়া হচ্ছে, আর সেই খাইয়ে চেখে চেখে নাম বলছেন: পেয়ারাফুলি, ধোনা, কপাটভাঙা, ইলশেপেটি, কিষেণভোগ ইত্যাদি। সেকালের কলকাতায় এমন ‘খেলা’ দেখা যেত। তখন বাগবাজার থেকে বকুলতলা, বড়বাজারের ফলপট্টি থেকে বেলেঘাটা এই মরসুমে অগুনতি স্বাদ, বর্ণ ও গন্ধের আম-ময়। বাজারের আমের বাইরেও দৈবাৎ কোনও ভাগ্যবানের ঘরে উদয় হত মুর্শিদাবাদের কহিতুর। তুলোয় মোড়া, গায়ে খাওয়ার তারিখ লেখা— সে এক নবাবি স্বাদ। ডিস্ট্রিক্ট গেজ়েটিয়ারে মুর্শিদাবাদের চুনাখালির আমের কথা আলাদা করে লিখে গিয়েছেন ও’ম্যালি সাহেব।
বস্তুত, আম-বিলাস নবাবি ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই সারা ভারতে বাংলার নাম উজ্জ্বল করেছে। মোগল বাদশাদের বাগিচাগুলো হয়ে উঠেছিল ফলের গুণগত মান উন্নয়নের পরীক্ষাগার। গ্রাফটিং বা কলম পদ্ধতির মাধ্যমে অন্যান্য ফলের গন্ধ, বর্ণ ও স্বাদের উন্নতি ঘটানো গেলেও, আমের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিতে সাফল্য পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল মোগল বাগান-বিশারদদের। আমের গ্রাফটিংয়ে পর্তুগিজদের হাতযশ ছিল বলে অনেকে মনে করলেও, বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এই তত্ত্ব নিয়ে দ্বিমত আছে। তবে পর্তুগাল ও স্পেনের বণিকরাই রফতানিযোগ্য পণ্য হিসেবে আমের পরিচয় করিয়েছিলেন বিশ্বের বাজারে। সমুদ্রযাত্রায় দ্রুত নষ্ট হয় না, এমন কিছু প্রজাতির উদ্ভাবনেও তাঁদের হাত থাকতে পারে। ভারত থেকে আমের বীজ বিদেশে নিয়ে যাওয়ার ঐতিহ্য শুরু করেছিলেন হিউয়েন সাঙ ও ইবন বতুতার মতো পর্যটকেরা। সেই ধারা পর্তুগাল ও স্পেনের অভিযাত্রীরা এগিয়ে নিয়ে গেছেন। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে ফরাসি ও ব্রিটিশরা তাঁদের উপনিবেশগুলিতে আম নিয়ে যান। সেখানে বিকশিত হয় আমের নতুন নতুন প্রজাতি।
কৃত্রিম গ্রাফটিং করে তৈরি নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির বাণিজ্যিক সাফল্যের কারণে বহু দেশি প্রজাতির আম হয় হারিয়ে গেছে, নয়তো আজ বিলুপ্তির দোরগোড়ায়। স্থানীয় আমের প্রজাতিগুলোর মধ্যে কৃষিজ জীববৈচিত্র সংরক্ষণ, জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মতো আঞ্চলিক জিনগত বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি সংরক্ষণের গুরুত্ব আজ আরও স্পষ্ট হচ্ছে। তাঁর কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে আমের ফলনের উপরে। ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী তাপমাত্রার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমের মুকুল ও সামগ্রিক উৎপাদনে। অতিরিক্ত গরমের ফলে পূর্ণ আকার পাওয়ার আগেই আম পাকতে শুরু করছে। অন্য দিকে, অসময়ের বৃষ্টিতে মুকুল ও ছোট ফল ঝরে গিয়ে ক্ষতি হচ্ছে। বাড়ছে পোকা ও রোগের উপদ্রব। সঙ্কট বাড়ছে আম চাষের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের।
৫ জুন চলে গেল গতকাল— বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ দিকে চলছে আমের মরসুমও। আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন হলেও, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি ‘আম বাঙালি’র অস্তিত্বের প্রশ্নে এই সব কিছুকেই এক জায়গায় মিলিয়ে দেয় না কি? ছবিতে ঝড়ে পড়ে যাওয়া আমের ডালা নিয়ে বয়স্কা বিক্রেতা।
একুশে এসে
এখন সত্যজিৎ পত্রিকা ও ‘রে কুইজ়’, দু’টোরই শুরু ২০০২-এ। পত্রিকা-সম্পাদক সোমনাথ রায় খেয়াল করেছিলেন, সত্যজিৎ মানেই যেন শুধু ফেলুদা ও শঙ্কু, তরুণদের মধ্যে ওঁর ছবিগুলি নিয়ে চর্চা নেই তত। কুইজ়ের মধ্য দিয়ে ছবিগুলি নিয়ে চর্চা, উৎসাহ বাড়ানোই ছিল লক্ষ্য। প্রথম বছরে যোগ দেয় প্রেসিডেন্সি, যাদবপুর ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১২ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি ভেঙে উন্মুক্ত হয় সবার জন্য। ২০০৬ থেকে শুরু হয় সত্যজিৎ রায়ের ছবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক জন ব্যক্তিত্বকে সম্মাননা অর্পণও। কোভিডের দু’বছর ও অন্য কারণে আরও দু’বার অনুষ্ঠান হয়নি, ২০২৬-এ একুশতম রে কুইজ়ের আসরটিই শেষ বারের মতো হবে, জানালেন উদ্যোক্তা। আজ বিকেল ৫টায় নন্দন ৩-এ: সম্মানিত হবেন মলয় রায়; মুক্তির ষাট পূর্তিতে নায়ক ছবি নিয়ে কথা হবে। সন্দীপ রায় বরুণ চন্দ বিভাস চক্রবর্তী অলকানন্দা রায় শুভাশিস মুখোপাধ্যায় ঈশিতা মুখোপাধ্যায় প্রমুখ গুণিজন থাকবেন। পরে হবে কুইজ়। ছবিতে নায়ক-এর শুটিংয়ে সত্যজিৎ রায় ও উত্তমকুমার।
সবুজ-নীল
পরিবেশের সবুজ, মহাসমুদ্রের নীল। এই দুইকে বেঁধেছে গুরুসদয় রোডের বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেকনোলজিক্যাল মিউজ়িয়ম (বিআইটিএম)। ৫-৮ জুন তারা পালন করছে ‘আর্থ অ্যান্ড ওশান অ্যাকশন ডেজ়’। নানান অনুষ্ঠান— ছাত্রছাত্রীদের কথা ভেবে, তবে আসতে পারেন বিজ্ঞান ও পরিবেশপ্রেমী যে কেউ। মাদার আর্থ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় গতকাল পরিবেশ দিবসে বিতরিত হল গাছের চারা, উদ্দেশ্য স্থানীয় স্তরে সবুজের প্রসার। ছিল ছায়াপুতুল-নাট্য ‘স্টেলা ইন দ্য সি’, সাগরতলের প্রাণজগৎকে ভিন্নতর শিল্প-আঙ্গিকে পরিবেশনা। ৮ জুন বিশ্ব মহাসাগর দিবস স্মরণে তৈরি হয়েছে নতুন শো ‘লাইট ইন লাইফ’; আর হবে ওপন হাউস কুইজ়ও।
জীবনের দলিল
আমি আপনার জন্য কী করতে পারি?— এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা হয়তো কোনও আটপৌরে জবাবই দেব। কিন্তু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী এমিলি জাকির যখন এ-প্রশ্ন করেন যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজ়ায় এক মায়ের সামনে, তার উত্তরে ফিরে আসে গভীর যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি, এক-একটি দিন বেঁচে থাকার কঠিন চিহ্ন। পোড়া, ভাঙা, ধ্বস্ত জনপদ থেকে খুঁজে নেওয়া জীবনের টুকরো ছবি দিয়ে এমিলি সাজিয়েছেন তাঁর প্রদর্শনী, ‘হোয়্যার উই কাম ফ্রম’। নৃশংস দখলদারির মাঝেও প্যালেস্টাইনের মানুষ আগলে রেখেছেন তাঁদের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি, স্মৃতি; এ-প্রদর্শনী তাঁদের হার না মানা জীবনের টুকরো দলিল। ২/১ হিন্দুস্থান রোডের ‘এক্সপেরিমেন্টার’ গ্যালারিতে আজই শেষ দিন এই প্রদর্শনীর, সন্ধে সাড়ে ৬টা অবধি দেখা যাবে।
বাদল-নাট্য
থার্ড থিয়েটার নিয়ে বাঙালির তর্ক-বিচার কম নয়। সেও থিয়েটার-চর্চারই একটা দিক। তবে বাদল সরকার ও তাঁর নাটক নিয়ে তাঁর শতবর্ষে নতুন করে আগ্রহ চোখে পড়ছে, কলকাতা ও জেলারও নানা নাট্যদল ফিরিয়ে আনছেন খ্যাত ও স্বল্পপরিচিত নাটককে। নেহাতই সমাপতন, তবু নজরে পড়ছে এ সপ্তাহে শহরে বাদল সরকারের তিনটি নাটকের মঞ্চায়ন। ৭ জুন দুপুর ৩টেয় অ্যাকাডেমি মঞ্চে ‘নির্বাক অভিনয় একাডেমী’র প্রযোজনায় বাকি ইতিহাস, অশোক মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনা, সুরঞ্জনা দাশগুপ্তের নির্দেশনা ও অভিনয়ে। সন্ধে সাড়ে ৬টায় এখানেই ‘নান্দীপট’ প্রযোজিত বল্লভপুরের রূপকথা, নির্দেশনায় প্রকাশ ভট্টাচার্য। ১০ জুন সন্ধে সাড়ে ৬টায় গিরিশ মঞ্চে শঙ্কর ভট্টাচার্যের নির্দেশনায় ‘অন্যচেতনা’ মঞ্চে নিয়ে আসছে পাগলা ঘোড়া।
বইমেলা
কলকাতায় বর্ষা না আসুক, বইমেলা এসে গেছে। শোভাবাজারে সুতানুটি নাটমন্দিরে আজ থেকে ১৪ জুন উত্তর কলকাতা বইমেলা, আয়োজক দেবপ্রিয় ঘোষ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। আজ বিকেল সাড়ে ৫টায় উদ্বোধন, থাকবেন রামকুমার মুখোপাধ্যায়-সহ বিশিষ্টজন। মেলায় থাকছে প্রায় ৫০টি প্রকাশনা ও লিটল ম্যাগাজ়িনের স্টল, রোজ বিকেলে নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা। বিষয়বৈচিত্রে ভরপুর আলোচনা-প্রসঙ্গ: ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে বাংলার সাম্প্রতিক রাজনীতি, বাংলা ভাষায় লেখালিখির মান, বাঙালির ভূতের গল্প, বাংলা সাহিত্যে জাদুবাস্তবতা, বাংলা প্রকাশনার ভবিষ্যৎ, মনোবিজ্ঞানে শিল্প-সাহিত্যের ভূমিকা, কবিতার অনুবাদ, নাটক নিয়ে কথা; প্রমথনাথ বিশী, শম্ভু মিত্র ও উত্তমকুমারকে নিয়ে গুণিজন-কথালাপে মুখরিত হবে প্রাঙ্গণ।
আত্ম-প্রকাশ
ক্যালেন্ডারে জুন। লিঙ্গপরিচয় ও যৌনতার নিরিখে প্রান্তিক মানুষদের আত্মসম্মান ও অধিকারের লড়াই উদ্যাপিত হয় এই মাস জুড়ে: এক মানবিক পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে, সব ধরনের বৈষম্য দূর করে সমাজের প্রতিটি মানুষের সমান সুযোগ ও অধিকারের পরিবেশ গড়ার বার্তাই যার মূল কথা। ট্রান্স-কুইয়ার জনগোষ্ঠী প্রতিদিন যে হিংসার সম্মুখীন হন, সেই সব অভিজ্ঞতা ও ঘটনা চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে ‘স্যাফো ফর ইকুয়ালিটি’ গত তিন মাস ধরে একটি বিশেষ উদ্যোগ করেছিল। এরই অংশ হিসেবে শিল্পী সুমন্ত্র মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে হয়েছিল সপ্তাহব্যাপী এক কর্মশালা, অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন সেখানে। কর্মশালায় তৈরি শিল্পকর্মগুলি (ছবিতে তারই একটি) নিয়ে প্রদর্শনী ‘ছাই চাপা’ শুরু হল গত ৩০ মে, যোধপুর পার্কের ‘পড়শি’ ওয়েলনেস সেন্টার ও ক্যান্টিনের একতলায়। চলবে গোটা জুন মাস, সোমবার বাদে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা।
সমগ্রকে ছুঁতে
“বর্ষাকালে জন্ম, তাই কাকা নাম দিলেন বাদল।” আসল নামটা, সুধীন্দ্র, চাপা পড়ে গেল। প্রতিবেশ সাহিত্য পত্রিকার ‘বাদল সরকার জন্মশতবর্ষ সংখ্যা’র (সম্পা: অরূপ চট্টোপাধ্যায়) শুরুতেই চোখে পড়ে ‘বাদলপঞ্জি’, সেখানে লেখা। বিপুলায়তন পত্রিকা-সংখ্যাটি, ছাড়িয়ে গেছে হাজার পাতা, ‘গোটা বাদল সরকার’কে ধরতে চেয়েছে যে! তাঁর অগ্রন্থিত বেশ কয়েকটি লেখা পড়তে পারবেন পাঠক, বাদল সরকার সম্পাদিত রক্তকরবী-র টেক্সট তথা স্ক্রিপ্টও। শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেওয়া সাক্ষাৎকার, বিষ্ণু বসু অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় পবিত্র সরকার কেতকী কুশারী ডাইসন শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবাল দাশগুপ্ত প্রতিভা আগরওয়াল বিশাখা রায়-সহ গুণিজনের পুরনো ও নতুন লেখা; এই সময়ের নাট্যজনদের মূল্যায়ন-ঋদ্ধ। ছবিটি, পত্রিকা থেকেই।
পরিবেশ-ভাবনায়
প্রকাশনা সংস্থা যখন পরিবেশ নিয়ে ভাবে, এক উদাহরণীয় মাত্রা তৈরি করে তা। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে ৫-৩০ জুন পরিবেশ সংক্রান্ত চিত্রপ্রদর্শনী, আলোচনা, গ্রন্থপ্রকাশ-সহ নানা অনুষ্ঠানের উদ্যোগ করেছে ‘প্রাচ্য পাশ্চাত্য’ প্রকাশনা, ৫ সূর্য সেন স্ট্রিটে তাদের বিপণিতে। গতকাল বিকেলে শুরু হল শিল্পী শ্যামলবরণ সাহার ছবির প্রদর্শনী ‘ইনার রিদম অব সেল্ফ-পোর্ট্রেট’; যাঁর ছবি প্রসঙ্গে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত বলেছিলেন ‘আত্মপ্রতিকৃতি’র মধ্যে ‘প্রকৃতি’র ঘনসন্নিবেশের কথা, তার মধ্যে মিশে থাকা নান্দনিক স্পর্ধা, আরোগ্যশক্তির কথা। প্রাসঙ্গিক আলোচনা করলেন মৃণাল ঘোষ ও অঞ্জন সেন। প্রদর্শনী ৩০ জুন পর্যন্ত, দ্বিতীয় ও চতুর্থ রবিবার বাদে রোজ ১২টা-সাড়ে ৭টা। এ ছাড়াও ৮ জুন বিকেল সাড়ে ৫টায় পরিবেশ নিয়ে আলোচনায় বলবেন অরুণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রতিম কর্মকার ও অরিজিৎ চট্টোপাধ্যায়; ১৭ জুন বেরোবে বিজ্ঞানভিত্তিক একটি উপন্যাস, ইংরেজি অনুবাদে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে