ছবি : শুভাশিস ভট্টাচার্য
আদ্যোপান্ত মধ্যবিত্ত পাড়াটা ঠিক যেন একটা রঙিন ক্যানভাস। নতুন পুরনো নানা রঙের বাড়ি, ছোট বড় উজ্জ্বল দোকান আর পাড়া পাড়া সেই গন্ধটা। মানুষে মানুষে নির্ভরশীলতা, আর সম্পর্কের সেতুর মাঝেই আমার পাড়া কালীপ্রসন্ন রায় লেন।
যদিও কে পি রায় লেন নামেই এ পাড়া বেশি পরিচিত। ছোট্ট পাড়াটার ব্যাপ্তি— টালিগঞ্জ বাজারের সামনে থেকে শুরু করে এক দিকে ইজ্জতুলা লেন হয়ে অন্য দিকে, গোবিন্দ ব্যানার্জি লেন হয়ে দেশপ্রাণ শাসমল রোড পর্যন্ত। পাড়ার শাখা প্রশাখার মধ্যে রয়েছে গোবিন্দ ব্যানার্জি লেন, উপেন্দ্রকৃষ্ণ মণ্ডল লেন। পাড়ার ও প্রান্তে রয়েছে বেশ কয়েকটি গ্যারাজ আর টালিগঞ্জ ক্লাবের উঁচু পাঁচিল। এক কথায় নির্ঝঞ্ঝাট, শান্তিপূর্ণ একটা পাড়া।
মসজিদের আজান আর মন্দিরের কাঁসর ঘণ্টার শব্দ যেন সম্প্রীতির ধ্বনি ঘোষণায় রত। পাড়াতেই রয়েছে গন্ধেশ্বরী দেবীর মন্দির। দেশপ্রাণ শাসমল রোড, আনোয়ার শাহ রোডের সংযোগস্থলে রয়েছে এ শহরের মসজিদ স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শনটি। কাছেই টালিগঞ্জ ফাঁড়িতে রয়েছে ঘড়ি ঘর ও ইমামবাড়া। অন্য দিকে, টালিগঞ্জ বাজার পেরিয়ে ব্রিজের মুখেই বহু প্রাচীন পঞ্চাননতলা, বড় রাসবাড়ি ইত্যাদি। এ সব দেখতে মাঝে মধ্যেই ক্যামেরা হাতে ভিড় করেন বিদেশিরাও।
সময়ের প্রভাবে এ পাড়াতেও এসেছে পরিবর্তন। মানুষে মানুষে নিয়মিত যোগাযোগ কমলেও সুসম্পর্ক বজায় আছে। রাস্তায় দেখা হলে সৌজন্য বিনিময়ের পাশাপাশি সকলের খোঁজখবর নেওয়ার অভ্যাসটা উধাও হয়ে যায়নি। আশেপাশের অঞ্চলে আছেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের সঙ্গে রয়েছে সম্প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ক।
কাউন্সিলর মমতা মজুমদারের উদ্যোগে উন্নত হয়েছে এলাকার নাগরিক পরিষেবা। নিয়ম করে দু’বেলা রাস্তা পরিষ্কার, জঞ্জাল অপসারণ, পর্যাপ্ত পানীয় জল, জোরালো আলো উন্নয়নের ইঙ্গিত দেয়। তবে পাড়াটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার ক্ষেত্রে যুব সম্প্রদায়ের সচেতনতা ও উদ্যোগ উল্লেখ্য। মাঝে মধ্যেই নাগরিক সচেতনতা বিষয়ে তাদের প্রচার করতেও দেখা যায়। তেমনই পাড়া-পড়শির বিপদে আপদে পাড়ার যুব সম্প্রদায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, এক বার গুরুতর আমি অসুস্থ হওয়ায় পাড়ারই কিছু ছেলে ডাক্তার এনে ওষুধপত্র কিনে এনে যে ভাবে সাহায্য করেছিল তা কখনও ভুলতে পারব না।
আগে অন্য পাড়ার মতোই ছিল এ পাড়ার রকের আড্ডা। তবে সময়ের সঙ্গে একটি একটি করে রকগুলি উধাও হওয়ায় আড্ডার চরিত্রটাই বদলে গিয়েছে। এখন ছুটির দিনে বাড়ির সামনে চেয়ার পেতে কিছু মানুষকে আড্ডা দিতে দেখা যায়। যুব সম্প্রদায় আড্ডা দেয় পাড়ার মোড়ে, চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে।
কয়েকটি ক্লাবের উদ্যোগে এখানে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। আজও এ পাড়ায় ফ্ল্যাট কালচার সে ভাবে থাবা বসায়নি। তবে আশেপাশের পাড়ায় বাড়ি ভেঙে তৈরি হচ্ছে ফ্ল্যাট।
এক কালে যেখানে ছিল দীপ্তি সিনেমা হল সেখানেই এখন বেসরকারি নার্সিংহোম। কাছেই বাঙুর হাসপাতাল। পাড়ার রাস্তাটি খুব একটা চওড়া না হওয়ায় পার্কিং সমস্যাও নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত। কাছেই মেট্রো। যথেষ্ট সংখ্যক অটো, বাসও চলে।
কাছে টালিগঞ্জ বাজারটি মধ্যবিত্তের নাগালে। আজও এখানে সাবেক বাজারের ছবিটা দেখতে পাই। মাছ, সব্জির পাশাপাশি মাটির হাঁড়ি কলসি থেকে দশকর্মা ভাণ্ডার সবই রয়েছে। ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে রয়েছে আন্তরিক সম্পর্কও। পাশাপাশি এ পাড়ায় ব্যাঙের ছাতার মতোই গজিয়ে উঠছে স্বল্পমেয়াদি ফাস্টফুডের দোকান। কাছেই আনোয়ার শাহ রোডের মোড়টি এখন বিরিয়ানি, মিষ্টির দোকানে জমজমাট।
এ পাড়ায় বারো মাসে তেরো পার্বণ লেগেই থাকে। তবে কোনও চাঁদার জুলুম নেই। কাছাকাছির মধ্যে দু’টি বারোয়ারি দুর্গাপুজো হয়। তার মধ্যে একটি কবেই শতবর্ষ পেরিয়েছে। পুজো-পার্বণে পাড়া-পড়শির স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান উৎসবের মেজাজটাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। এক সময়ে কালীপুজোর অন্যতম আকর্ষণ ছিল তুবড়ি প্রতিযোগিতা। আগে এ পাড়ায় যাত্রা হত। তাতে পাড়ার মানুষ অংশগ্রহণ করতেন। আর হত গানের জলসাও। সে সব আজ অতীত।
চার পুরুষ ধরে এ পাড়ায় আমাদের বসবাস। ছোটবেলায় পাড়াটা ছিল শান্ত নিরিবিলি। লোকসংখ্যাও ছিল অনেক কম। কাছেই ছিল পাত্রদের সুরকি মিল। তখন কাছেই টালিনালাটাও ছিল অনেক পরিষ্কার। জোয়ারের সময় সেখানে নৌকা করে আসত খড়, ইট, টালি ইত্যাদি। আজ সেই টালিনালার হতশ্রী চেহারা দেখে কষ্ট হয়।
বিশ্বকর্মা পুজোয় এ পাড়ায় ছিল জমজমাট ঘুড়ি ওড়ানোর ঐতিহ্য। সময়ের সঙ্গে সেটা অনেকটাই কমেছ। তখন পাড়ার বন্ধু জগা, মন্টুদা, বুড়োদা সকলে মিলে বাড়িতেই মাঞ্জা দেওয়া হত। সেই আকর্ষণটাও হারিয়ে গিয়েছে।
এ পাড়ায় থাকতেন কিছু বিশিষ্ট মানুষ। চিকিৎসক নির্মলচন্দ্র ঘোষ, শচীন মণ্ডল, নিখিলনাথ দাস এবং আইনজীবী বিশ্বনাথ দাসের নাম বিশেষ উল্লেখ্য।
তবে পাড়াটা নিয়ে কিছু আক্ষেপও আছে। এখানে কোনও মাঠ নেই। আগে ছুটির দিন ছোটরা রাস্তায় খেলাধুলো করলেও গাড়ির সংখ্যা বাড়ায় সেই অভ্যাসে যবনিকা পড়েছে। তেমনই কম এ পাড়ার গাছপালার সংখ্যা। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে মানুষের সংখ্যা, এক এক সময় পাড়াটাকে ঘিঞ্জি মনে হলেও এর প্রতি পরতে জড়িয়ে আছে আত্মিক মজবুত সম্পর্ক। তাই এ পাড়া ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কথা ভাবিনি কখনও।
লেখক আইনজীবী