বসন্তের বাতাসের সঙ্গেই শহরবাসীর নাকে নতুন বইয়ের গন্ধ এসে লাগে। গত কয়েক দশক ধরেই বইমেলা আমাদের বারো মাসে তেরো পার্বণের তালিকায় ঢুকে রীতিমতো চতুর্দশ পার্বণ হয়ে জাঁকিয়ে বসেছে। আয়োজকদের বহুবিধ উদ্যোগ, অস্থায়ী প্রেক্ষাগৃহের গাম্ভীর্য, লিটল ম্যাগাজ়িন প্যাভিলিয়নের হইচই আর কয়েকশো স্টল, এলাহি কাণ্ড!
মাঠময় ঘুরে বেড়াচ্ছে মেলার ম্যাসকট: হাঁসের আদলে গড়া চশমাধারী, শাড়ি-পরা বাঙালিনি , তাকে ঘিরে সেলফি তোলার ভিড়। গিল্ড স্টল-সজ্জায় পুরস্কার দেয়, তাই প্রকাশকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি— কেউ স্টল বানিয়েছেন নবরত্ন মন্দিরের ধাঁচে, কেউ বা দেওয়াল জুড়ে গ্রাফিত্তির কারিকুরি দেখিয়েছেন। কেউ আবার সোজা ভিনদেশি জঙ্গল থেকে উড়িয়ে এনে অরণ্যদেবকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। ও দিকে খুদে পাঠকদের জন্য টফি, বুক-মার্কের ব্যবস্থা দেখে মালুম হয়, ভবিষ্যতের বইপ্রেমী পাঠক ‘ধরতে’ও প্রকাশকরা সচেতন।
মেলার ভিড়ে হাসির জোগানও কম নয়। কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্টলের সামনে বাস্কেটে বল ফেলার ‘গেম’। চার ফুট দূর থেকে সেই বাস্কেটে বল গলাতে না পেরে বান্ধবীর সামনে কত বীরপুরুষের যে নাক কাটা গেল! যাঁরা জিতলেন, পুরস্কারের চকলেট সঙ্গিনীর সঙ্গে ভাগ করে নিলেন— প্রণয়ে প্রমোদে মধুর হল মেলা! অন্য দিকে, ভিড়ের মধ্যে ‘সেলেব্রিটি’দের রক্ষীদলের ‘তফাত যাও’ চিৎকারে আর গাড়ির হর্নে বিরক্ত জনতা ছুড়ে দিয়েছে সরস বঙ্কিম টিপ্পনী: সে সব জড়ো করলেও একখান বই হতে পারে!
এক খাদ্য-বিপণি খাসা পোস্টার টাঙিয়েছে: ‘বই কিনলে খিদে পায়, এটা বিজ্ঞান’ (উপরে, মাঝের ছবি)। সেই ‘বিজ্ঞানসম্মত’ খিদের চোটে চপ, কাটলেট, তন্দুরি থেকে শুরু করে নবদ্বীপের লাল দই কিংবা পাটিসাপটা— সবই দেদার বিকোচ্ছে। বইমেলা প্রাঙ্গণে কারুকার্যখচিত সামোভার থেকে আখরোট-মেশানো চা পরিবেশনের জন্য খ্যাত সেই চেনা কাশ্মীরি চা-ওয়ালা (ছবিতে বাঁ দিকে) তো আছেনই। আছে শুকনো ফলের পসরাও।
এই হরেকরকমবার মধ্যেই বইমেলায় হাজির এক টুকরো খাজুরাহো (মাঝের ছবি), চিল্কা। ফোটোগ্রাফি-চর্চা গোষ্ঠী ‘থার্ড আই’-এর স্টলে বাহারি সৃষ্টিশীল মিনি ক্যানভাস ফোটোগ্রাফির প্রদর্শনীর পাশাপাশি চোখ টানছে সুদৃশ্য অ্যালবাম-কাম-নোটবুকগুলো। শিল্পী-শিক্ষক অতনু পাল ও ওঁর ছাত্রছাত্রীদের তোলা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সম্মানিত নানা ছবিতে সেজে উঠেছে তারা, উপহার কি সংগ্রহ হিসেবে বেশ। আরশিনগর, উড়ো খই, এখানে ওখানে, দৃশ্যান্তর, দেখা না-দেখা, বিমূর্ত মূর্ত— এমনই বহুবিধ শিরোনাম; ভাবনা ও তার প্রকাশের সার্থক সম্মিলন তাদের সর্বাঙ্গে।
মেলার মূল চত্বরে কারুশিল্পীরা নেই তো কী, ক্রেতারা তাঁদের ঠিক খুঁজে নিয়েছেন পাঁচ নম্বর গেটের উল্টো দিকে। আতরের খুশবুর উৎস খুঁজে ক্রেতা ঠিক পৌঁছে যাচ্ছেন বিক্রেতার ডালার কাছে। সব মিলিয়ে, বইয়ের বাইরেও বইমেলায় কলকাতা আছে তার চেনা মেজাজেই।
মধুকবি স্মরণে
১৯১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি খিদিরপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় মাইকেল মধুসূদন লাইব্রেরি। মনসাতলা লেনের বর্তমান ঠিকানায় স্থিত ভবনটির উদ্বোধন হয় ১৯৪০-এর ১৩ ফেব্রুয়ারি, শান্তিনিকেতন থেকে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। খিদিরপুর মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাসভূমি, কলকাতার প্রাচীন সাংস্কৃতিক পীঠস্থানও, মধুকবির নামাঙ্কিত এই গ্রন্থাগার আজও শ্রদ্ধায় পালন-উদ্যাপন করে থাকে তাঁর জন্মদিন (ছবিতে গ্রন্থাগারে কবির আবক্ষ মূর্তি)। গত ২৫ জানুয়ারি এই উপলক্ষেই হল মাইকেল মধুসূদন দত্ত স্মারক বক্তৃতা, বললেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বিকাশকান্তি মিদ্যা; ছিলেন অশোককুমার গঙ্গোপাধ্যায়, সমীরণ দাস-সহ বিশিষ্টজন। সৌগত চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় পুনশ্চ মধুসূদন: কবি ও নাট্যকার (প্রকা: মাইকেল মধুসূদন লাইব্রেরি ও বইচিত্র) গবেষণাগ্রন্থের আনুষ্ঠানিক প্রকাশও হল। মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মদ্বিশতবর্ষ স্মরণে শতাব্দীপ্রাচীন গ্রন্থাগারের এই শ্রদ্ধার্ঘ্য।
নাট্যপ্রাণ
পঁয়ত্রিশ বছর বাংলা থিয়েটারে পার করলেন বিলু দত্ত। পিতা মনু দত্ত ছিলেন মঞ্চরূপকার; বিলু স্টেজ ও থিয়েটার নিয়ে পড়াশোনা করে মঞ্চসজ্জায় ব্যাপৃত থাকলেও, এখন প্রায় পুরোপুরিই নাট্য প্রযোজনায়। তাঁর ‘মুখোমুখি’ নাট্যগোষ্ঠীর তত্ত্বাবধানেই শেষাবধি একের পর এক নাটক করে গিয়েছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়; জন্মদিন ঘিরে তাঁর কবিতাপাঠ, নাট্যাভিনয়, চিত্রপ্রদর্শনীর নিয়মিত আয়োজকও তিনি। গ্রুপ থিয়েটারের পঁচাত্তর পূর্তি উপলক্ষে তাঁরই উদ্যোগে সুমন মুখোপাধ্যায় অর্পিতা ঘোষ দেবেশ চট্টোপাধ্যায় পৌলমী চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ মঞ্চস্থ করেন নতুন নাটক। নিরীক্ষাময় প্রযোজনায় সদা তৎপর এই নাট্যপ্রাণ।
আরও এক বার
লেখক-কল্পনার গোয়েন্দাকাহিনির সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে অবস্থান জনপ্রিয় ‘গোয়েন্দাপীঠ’ সিরিজ়ের। বাস্তবের বিভিন্ন মামলার তদন্তকথা তার ভিত্তি বলেই নয় শুধু, সুপ্রতিম সরকারের লেখা এই সিরিজ়ের বইগুলি (প্রকা: আনন্দ) বৃহদার্থে হয়ে উঠেছে সমসময় ও সমাজের এক বিশ্বস্ত দলিল। এর আগের বইগুলি— গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার-এর দু’টি খণ্ড এবং আবার গোয়েন্দাপীঠ— পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে, এ বারের বইমেলায় আরও একবার গোয়েন্দাপীঠ ঘিরেও আগ্রহ কম নয়। ‘পুলিশ প্রোসিডিউরাল’ ঘরানার নতুন বইটিতে উঠে এসেছে সাতটি মামলার প্রামাণ্য ও রুদ্ধশ্বাস তদন্ত-বিবরণী। কালিয়াচক ফরাক্কা রানাঘাট থেকে কলকাতা, এক-একটি ঘটনাসূত্রে পাঠক ঘুরে আসবেন সারা বাংলা, দেশেরও নানা প্রান্ত থেকে। জরুরি নথির অনুলিপি ও প্রাসঙ্গিক ছবিও ছাপা হয়েছে সঙ্গে।
গুরুপ্রণাম
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন যে শিল্পীরা, তাঁদের অন্যতম বেহালাশিল্পী পদ্মভূষণ পণ্ডিত বিষ্ণু গোবিন্দ যোগ, ভি জি যোগ নামে যাঁকে চেনেন সঙ্গীতপ্রেমীরা। ২০০৪ সালের ৩১ জানুয়ারি তারিখে প্রয়াত এই সুরশিল্পীর প্রয়াণদিনটিতে প্রতি বছর নিয়মিত ভাবে তাঁর স্মরণানুষ্ঠান করে আসছে শহর কলকাতার মার্গসঙ্গীত-চর্চা প্রতিষ্ঠান ‘স্বর সাধনা’। আজ সন্ধ্যা ৬টায় মধুসূদন মঞ্চে পঞ্চদশ বছরের ‘গুরুপ্রণাম’ অনুষ্ঠান, প্রতিষ্ঠানের ষাট জনেরও বেশি সঙ্গীত-শিক্ষার্থী পরিবেশনা করবেন বেহালায় সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা, পণ্ডিত পল্লব বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্মাণ ও পরিচালনায়। ভি জি যোগ সম্মাননায় ভূষিত হবেন তবলাশিল্পী পণ্ডিত সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়।
‘মাটি’র মানুষ
জলি বাগচি এক ডাকে চিনে নেওয়া কেউকেটা কোনও শিল্পী-নাম নয়, তিনি নিজেও তা হতে চাননি কখনও। প্রতিবাদের গান আর মাটির সুরে ছিল তাঁর সহজ অধিকার। হেমাঙ্গ বিশ্বাস, প্রতিমা বড়ুয়া, কালী দাশগুপ্তের কাছে তাঁর শিক্ষা, নিজের দল ‘গণবিষাণ’ গড়েছেন ১৯৭৭ সালে— প্রতিবাদ, প্রতিরোধে যাদের গান অব্যর্থ, লক্ষভেদী— তা সে বন্দিমুক্তির দাবিতে মিছিলে হোক কি বন্ধ কারখানার ফটকে, অথবা অন্যায্য ব্যারিকেডের মুখে। পাশাপাশি ঝুমুর বা গোয়ালপাড়িয়াও অনবদ্য শোনাতেন ময়মনসিংহ-নেত্রকোণার এই কন্যে। এই জানুয়ারিতেই তাঁর জন্মদিন, প্রয়াতও হলেন এ মাসেই, সাতাশি বছর বয়সে গত ১৭ তারিখে। অগণিত সভা উদ্বেল হয়েছে যাঁর গানে, এ বার তাঁর গান-যাত্রা স্মরণ ও উদ্যাপন করবেন আত্মজনেরা। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি সোমবার বিকেল ৪টেয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিগুণা সেন প্রেক্ষাগৃহে।
স্বদেশব্রতী
খাদি কাপড়ের তৈরি বাক্স খুললে দেখা যাবে, ভিতরে দুর্দান্ত ইবোনাইট পেন-হোল্ডার, কাঠের তৈরি পেন-রেস্ট, ভিন্টেজ এফ এন গুপ্তু নিব, বিশেষ ভাবে তৈরি দু’বোতল কালি, সোদপুর খাদি প্রতিষ্ঠানের পিতলে তৈরি প্রতীক। এহ বাহ্য, সুদৃশ্য এক পুস্তিকায় (ছবি) ধরা ‘বন্দে মাতরম্’ গানটির ইতিবৃত্ত, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব ও নানা ঘটনার জরুরি তথ্য। ভারতের জাতীয় গানটির সার্ধশতবর্ষ পালন ও উদ্যাপনে ‘সুলেখা’র এই ভিন্নধারার শ্রদ্ধার্ঘ্য-সংগ্রহ, বইমেলায় উদ্বোধন হল গত ২৪ জানুয়ারি। মহাত্মা গান্ধী স্বদেশি কালিতে লিখবেন, সেই ইচ্ছাপূরণে স্বাধীনতা সংগ্রামী দুই ভাই ননীগোপাল ও শঙ্কারাচার্য মৈত্র ১৯৩৪-এ রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠা করেন সুলেখা। স্বদেশিয়ানার ব্রতধারী সংস্থাটির লক্ষ্য আজও: বাঙালিরা হাতে লিখুন, লিখুন দেশীয় উদ্যোগে তৈরি ঝর্নাকলমে ও কালিতে। বিশেষ ‘বন্দে মাতরম্’ সংস্করণটি নিয়ে বইমেলায় সুলেখার স্টলে জনাগ্রহ বিলক্ষণ, জানালেন বর্তমান কর্ণধার কৌশিক মৈত্র।
ট্রাম-বন্ধনে
ট্রামের সৌজন্যেই কলকাতার নাম উচ্চারিত হয় মেলবোর্ন হংকং টরন্টো সান ফ্রান্সিসকো অ্যামস্টারডাম প্রাগ বুদাপেস্ট ভিয়েনা জ়ুরিখ মিলান তুরিনের সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে। বিশেষত কলকাতা আর মেলবোর্ন ট্রাম-বন্ধনে বাঁধা প্রায় ত্রিশ বছর: কালীঘাট থেকে কলিংউড, শ্যামবাজার থেকে সেন্ট কিল্ডার। মেলবোর্নের প্রাক্তন ট্রাম কন্ডাক্টর রবার্তো ডি আন্দ্রিয়া ট্রামযাত্রা নামের এই প্রচেষ্টার রূপকার, সঙ্গী বাঙালি চলচ্চিত্র-নির্মাতা মহাদেব শী। রবার্তোর তোলা আলোকচিত্র (ছবি) দিয়ে একটি ক্যালেন্ডার তৈরি হল নতুন বছরে, ‘দ্য ট্রাম কন্ডাক্টর’স ক্যামেরা’ শিরোনামে। নব্বই দশক থেকে কলকাতার ট্রাম ক্যামেরাবন্দি করছেন তিনি, নোনাপুকুর ওয়ার্কশপে তৈরি ট্রামের প্রতি এ তাঁর ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার্ঘ্যও। ক্যালেন্ডার রূপায়ণে সহায়তা করেছেন অনুরাগ মিত্র ও ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায়।
সিনে-বসন্ত
এ বারের বইমেলায় থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনা, বাঙালির আলাদা আকর্ষণ আছে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো আর মারাদোনা-মেসির দেশ ঘিরে। তুলনায় আর্জেন্টিনার চলচ্চিত্রের সঙ্গে শহরবাসীর পরিচয় খানিক কমই। এই ফাঁক ভরাতে উদ্যোগ করেছে ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ় অব ইন্ডিয়া (এফএফএসআই), ভারতে আর্জেন্টিনার দূতাবাসের সঙ্গে যৌথ আয়োজনে দেশটির ছবি দেখাচ্ছে তারা। আগামী ১, ৩ ও ৯ ফেব্রুয়ারি, নন্দন ৩-এ, বিকেল ৪টা ও সাড়ে ৫টায় দু’টি করে ছবি, সবগুলিই সাম্প্রতিক। পাশাপাশি, ৪-৮ ফেব্রুয়ারি সেখানেই হবে এফএফএসআই-এর পূর্বাঞ্চল শাখার আয়োজনে চতুর্থ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া চলচ্চিত্র উৎসব। রোজ দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে সন্ধ্যাভর দেশ-বিদেশের ছোট ছবি, প্রামাণ্যচিত্র ও কাহিনিচিত্র— নানা ক্রীড়াক্ষেত্র ও ব্যক্তিত্ব ঘিরে। ফেব্রুয়ারির মহানগরে সিনে-বসন্তের মৃদুমন্দ সুপবন বইবে!
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে