এত্তা জঞ্জাল: মহাত্মা গান্ধী রোডে প্রায় অর্ধেক রাস্তা জুড়ে পড়ে রয়েছে আবর্জনার স্তূপ। রবিবার, কলেজ স্ট্রিটের কাছে। ছবি: রণজিৎ নন্দী।
বিজেপি-শাসিত মধ্যপ্রদেশের মেরেকেটে ২০ লক্ষ জনসংখ্যার মাঝারি মানের শহর জব্বলপুর বা ৩৫ লক্ষ জনসংখ্যার শহর ইন্দোর যা পারছে, তৃণমূল-শাসিত পশ্চিমবঙ্গে দু’কোটির বেশি জনসংখ্যার ‘মহানগর’ কলকাতা তা পেরে উঠছে না বলে অভিযোগ! জব্বলপুর এবং ইন্দোর— দুই শহরেই পিপিপি (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি) মডেলে আবর্জনা থেকে বায়ো গ্যাস, জৈব সার এবং বিদ্যুৎ তৈরির কাজ চলছে সাফল্যের সঙ্গে। কিন্তু কলকাতার ধাপাই হোক বা বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ের ধারের প্রমোদনগর, অথবা নিউ টাউন— সর্বত্রই বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ কার্যত প্রতি পদক্ষেপে হোঁচট খাচ্ছে। ছড়াচ্ছে মাত্রাছাড়া দূষণ।
কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনও একমাত্র এনকেডিএ (নিউ টাউন-কলকাতা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি)-র আওতাভুক্ত নিউ টাউনের অ্যাকশন এরিয়া-১ এলাকার ৯০টি পথবাতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ, ‘প্রেস ইনফরমেশন বুরো’ (পিআইবি)-র আয়োজনে সাংবাদিক দলের সদস্য হিসেবে সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশে গিয়ে দেখা গেল, জব্বলপুরের মতো মধ্যম মানের শহরের নগর নিগমও আবর্জনা থেকে প্রতিদিন ২৪০-২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ইউনিট-প্রতি ৬ টাকা ৩৯ পয়সা দরে মধ্যপ্রদেশ বিদ্যুৎ মণ্ডলকে বিক্রি করছে! প্রায় ১৮ হাজার বাড়িতে সেই বিদ্যুৎ যাচ্ছে। এতে যেমন দূষণ কমছে, তেমনই নগর নিগমের আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ছে। জব্বলপুরের জনসংখ্যা কম হওয়ায় বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্লান্টে প্রয়োজনের তুলনায় কম আবর্জনা যাচ্ছিল। ঘাটতি মেটাতে শহরের ৫০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা ১৫টি মিউনিসিপ্যালিটি এলাকা থেকে প্রায় ১৩০ টন বর্জ্য প্রতিদিন সংগ্রহ করে এই প্লান্টে আনা হচ্ছে।
ইন্দোরেও দেবগুরাবাড়িয়া এলাকায় প্রায় ১৫০ কোটি টাকায় ১৫ একর জমিতে পিপিপি মডেলে তৈরি হয়েছে কঠিন বর্জ্য-ভিত্তিক জৈব মিথেন প্লান্ট। সেখানে প্রতিদিন শহরের ৮৫টি ওয়ার্ড থেকে ৪৫০-৫০০ মেট্রিক টন আবর্জনা আসে। যা থেকে দিনে প্রায় ২০ টন বায়ো গ্যাস (অর্থাৎ, বছরে প্রায় ৭২০০ টন জৈব গ্যাস) ও বছরে প্রায় ১০০ টন জৈব সার উৎপাদন হয়। বিভিন্ন সংস্থা ওই বায়ো গ্যাস কেনে। তার বিনিময়ে যে বেসরকারি সংস্থা ওই প্লান্ট পরিচালনা করে, তারা বছরে আড়াই কোটি টাকা দেয় ইন্দোর নগর নিগমকে। এই প্রকল্পে প্রতি বছর শহরের বাতাসে ১ লক্ষ ৩০ হাজার টন কার্বন ডাইঅক্সাইডের নির্গমণ আটকানো গিয়েছে। ইন্দোর পর পর আট বছর ভারতের পরিচ্ছন্নতম শহরের মুকুট জিতেছে। এই প্লান্টের কাজে ৮৩ জন সাফাইকর্মী পুনর্বাসন পেয়েছেন। শহরে কোথাও কলকাতার মতো যত্রতত্র ভ্যাটে ডাঁই করা বর্জ্য নেই, ধাপার মতো ময়লার স্তূপও নেই। ইন্দোরে ৪০০টি বাস আবর্জনা থেকে পাওয়া গ্যাসে চালানোর কথা ছিল। বাজারের থেকে কম দামে সেই গ্যাস সরবরাহ করার কথা ছিল। কিন্তু ইন্দোরের মেয়র পুষ্যমিত্র ভার্গভের কথায়, ‘‘ওই গ্যাসের মান এখনও বাস চালানোর উপযুক্ত হয়নি। মানোন্নয়নের কাজ চলছে। হলেই আমরা চালাব।’’
বিশ্বের নবম জনবহুল শহর কলকাতায় প্রতিদিন ৪০০০-৪৫০০ মেট্রিক টন আবর্জনা তৈরি হয়। ফলে, ঠিক ভাবে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ হলে এখানে বিপুল পরিমাণ বায়ো গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপন্ন হত। তা হলে কেন তা হচ্ছে না? কেন হেরে যাচ্ছে কলকাতা? পুর-নগরোন্নয়ন সচিব গুলাম আনসারির কথায়, ‘‘বিষয়টি সুডা (স্টেট আর্বান ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি)-র বিশেষ সচিব জলি চৌধুরী বলতে পারবেন।’’ জলি বললেন, ‘‘ধাপায় প্রতিদিন ৫০০ টন ভিজে বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরি হতে পারে। শুকনো বর্জ্যেরও এখানে প্রক্রিয়াকরণ হওয়ার কথা। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও আছে। কিন্তু দেরি হচ্ছে জমির জন্য। এখানে পুরসভার প্রায় ৭৩ হেক্টর জমিতে স্থানীয় চাষিরা চাষ করেন। তাঁদের টাকা ও পুনর্বাসন দিয়ে জমি হস্তান্তরে দেরি হচ্ছে। জায়গা না পেলে প্লান্ট হবে কী করে?’’
জলি আরও জানান, বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ের ধারে প্রায় ১২ লক্ষ মেট্রিক টন জঞ্জালের স্তূপ হয়ে আছে। সেখান থেকে মাসে এক লক্ষ মেট্রিক টন বর্জ্য ‘বায়ো মাইনিং’ করা হচ্ছে। জৈব সার তৈরিতেই জোর দেওয়া হচ্ছে, কারণ আবর্জনা থেকে তৈরি গ্যাসের দাম বেশি বলে তা কেনার লোক পাওয়া যায় না। কিছু আবর্জনা প্রক্রিয়াকরণের পরে সিমেন্ট কারখানাগুলি কিনছে। তাঁর কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ ২০২৬-এর ডিসেম্বরের মধ্যে একমাত্র রাজ্য হবে, যেখানে ১২৮টি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট তৈরি হবে।’’ জলির আরও দাবি, আগামী বছরের মধ্যে ধাপা বা বেলঘরিয়ায় জঞ্জালের স্তূপ থাকবে না এবং সেই জঞ্জালের স্তূপে আগুন লাগানোর ফলে বেরোনো বিষাক্ত ধোঁয়ায় শহরবাসীর নিঃশ্বাসও বন্ধ হয়ে আসবে না।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে