জখম শিশু ও মা। — নিজস্ব চিত্র
শেষ রাতের নিস্তব্ধতা হঠাৎ ভাঙল বিস্ফোরণে। বোমা ফাটার মতো বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গেল গোটা বাড়ির। হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল ঘরের একটি দেওয়াল। ভাঙল আলমারির কাচ। তা ছিটকে খাটে পড়ায় জখম হল বছর দুয়েকের এক শিশু-সহ ছ’জন। ততক্ষণে গোটা বাড়ি ভরে গিয়েছে ধোঁয়ায়।
রবিবার রাত তিনটের এমন ঘটনা ঘিরেই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে তপসিয়া এলাকায়। সঙ্গে দানা বেঁধেছে রহস্যও। ৪২/সি তিলজলা রোডে বস্তির একটি তিনতলা বাড়ির একতলায় কীসের বিস্ফোরণ হল, তার উত্তর মেলেনি সোমবার রাত পর্যন্ত। কলকাতা পুলিশের বম্ব স্কোয়াড ঘণ্টা দশেক তল্লাশি চালিয়েও এ বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি।
গোয়েন্দাদের বক্তব্য, আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) হলে সাধারণত ডিটোনেটর এবং অন্য কিছু সরঞ্জাম বিস্ফোরণ স্থলে থাকার কথা। তেমন কিছুই মেলেনি। সাধারণ বোমা বিস্ফোরণ হলে স্প্লিন্টার ছড়িয়ে পড়ার কথা। পাওয়া যায়নি তেমন কিছুও। মেলেনি বিস্ফোরকের নমুনাও। কোনও গ্যাস সিলিন্ডার ফাটারও প্রশ্ন নেই বলে জানাচ্ছেন তদন্তকারীরা। লালবাজারের একটি সূত্র জানাচ্ছে, চকোলেট বোমার মতো কোনও শব্দবাজি বিপুল পরিমাণে এক জায়গায় মজুত ছিল, সেগুলোই কোনও ভাবে এক সঙ্গে ফেটে যাওয়ায় ওই কাণ্ড। কিন্তু তদন্তকারীদের একাংশের বক্তব্য, তাতে কার্বনের দাগ অন্তত পাওয়ার কথা। প্রাথমিক ভাবে সেটাও ওই বাড়িতে মেলেনি বলে জানান তদন্তকারীরা।
তা হলে পাঁচ ফুট বাই আড়াই ফুট এবং তিন ইঞ্চি পুরু দেওয়ালকে ফেলে দিল কীসের বিস্ফোরণ? বিষয়টি নিয়ে লালবাজারও ধন্দে। যে কারণে যুগ্ম কমিশনার (সদর) সুপ্রতিম সরকার সোমবার বলেন, ‘‘ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞেরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন। তাঁদের রিপোর্ট পেলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।’’
২০০৮-এর জানুয়ারিতে শেক্সপিয়র সরণিতে একটি গাছের গোড়ায় এমনই বিস্ফোরণ ঘটে। কয়েক জন পথচারী জখমও হয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও ডিটোনেটর, স্প্লিন্টার কিছুই পাওয়া যায়নি। আজও কিনারা হয়নি সেই রহস্যের। গোয়েন্দা ও বিশেষজ্ঞদের একাংশ এখনও মনে করেন, ওটা ছিল কোনও জঙ্গি সংগঠনেরই মহড়া— ডিটোনেটরহীন, বিশেষ ধরনের আইইডি দিয়ে।
রবিবার রাতের ঘটনা যে বাড়িতে, সেখানকার একতলার বাসিন্দা মহম্মদ সাহাবুদ্দিনের চোখমুখে এ দিন সকালেও ছিল আতঙ্কের রেশ। তাঁর কথায়, ‘‘হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। আমাদের ঘরের দেওয়াল হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। আমরা যে দিকে শুয়েছিলাম, দেওয়ালটি ভেঙে ঠিক তার উল্টো দিকে পড়েছে। না হলে যে কী হত!’’ ওই বাড়ির আর এক বাসিন্দা শাহানা খাতুন জানান, দু’বছরের শিশুপুত্রকে নিয়ে খাটে শুয়েছিলেন। বিস্ফোরণের অভিঘাতে আলমারির কাচ ওই খাটেই পড়ে। শাহানার সঙ্গে জখম হয় তাঁর শিশুও।
ওই তিনতলা বাড়িতে জনা তিরিশ ঘর ভাড়াটের বাস। একতলায় থাকেন প্রায় বারো ঘর ভাড়াটে। অনেকেরই ফিরতে রাত হয় বলে বাড়ির সদর দরজা সব সময়েই খোলা থাকে। বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, কোনও দুষ্কৃতী রবিবার রাতে বাড়িতে ঢুকে বোমা মেরে পালিয়েছে। কিন্তু কেন এমন হবে, কারাই বা করবে, তার সদুত্তর দিতে পারেননি তাঁরা। ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশ।