কসবা-কাণ্ড

নোটের নম্বর থেকে জালে আততায়ী

কসবার নস্করহাটে চারতলা বাড়ির দোতলায় নিজের ফ্ল্যাটে নিহত প্রৌঢ়া কমলা রাজবংশীর খুনের পাঁচ দিন পরে, শনিবার রাতে পিকনিক গার্ডেন থেকে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে কসবা থানার পুলিশ। ধৃত নিয়াজ আহমেদ কমলাদেবীর বড় জামাই সুনীল সিংহ চহ্বাণের বন্ধু।

Advertisement

মেহবুব কাদের চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০১৬ ০১:৫৬
Share:

৭৮৬— সংখ্যাটা অনেকেই শুভ হিসেবে গণ্য করেন। আর সেই সংখ্যাই কসবার প্রৌঢ়ার খুনিদের হদিস দিতে পুলিশকে অনেকটা সাহায্য করল।

Advertisement

কসবার নস্করহাটে চারতলা বাড়ির দোতলায় নিজের ফ্ল্যাটে নিহত প্রৌঢ়া কমলা রাজবংশীর খুনের পাঁচ দিন পরে, শনিবার রাতে পিকনিক গার্ডেন থেকে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে কসবা থানার পুলিশ। ধৃত নিয়াজ আহমেদ কমলাদেবীর বড় জামাই সুনীল সিংহ চহ্বাণের বন্ধু। পুলিশের দাবি, জেরায় নিয়াজ জানিয়েছে, ওই মহিলাকে খুনের পরিকল্পনা সুনীলেরই। কমলাদেবীর হাতে চা খাওয়ার পরে সুনীল ও নিয়াজ দু’জনে তাঁকে শ্বাসরোধ করে খুন করে। সুনীল নিজের বেল্ট দিয়ে ও নিয়াজ শাড়ির ফাঁস লাগিয়েছিল কমলাদেবীর গলায়। সুনীল এখনও ফেরার। কিন্তু ঘটনার পিছনে যে সুনীলের হাত আছে, তা পুলিশের প্রথম সন্দেহ হয় ওই ৭৮৬ নম্বরের সূত্র ধরেই।

এ ক্ষেত্রে নম্বরটা ছিল বেশ কিছু টাকার নোটে। গত সোমবার, তদন্তে নেমে পুলিশ দেখে, কমলাদেবীর গোটা ফ্ল্যাট তছনছ, সব আলমারির দরজা হাট। তদন্তকারীরা জেনেছেন, নগদ ২০ হাজার টাকা লুঠ করে নিয়ে গিয়েছে দুষ্কৃতীরা। খোয়া গিয়েছে প্রৌঢ়ার মোবাইলটিও।

Advertisement

এরই মধ্যে খুনের খবর পেয়ে মুম্বই থেকে কমলাদেবীর ছোট মেয়ে আয়েশা কলকাতায় পৌঁছন। আয়েশা তাঁর দিদি গীতার কাছে কিছু টাকা চান মায়ের শেষকৃত্য ও অন্যান্য কাজের জন্য। গীতা যে নোটগুলি দেন, তা দেখে চমকে ওঠেন আয়েশা। প্রতিটি নোটেরই শেষ তিনটি অঙ্ক ৭৮৬। দিদিকে আয়েশা জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন, সুনীলই গীতাকে ওই সব নোট দিয়েছে।

পুলিশকে আয়েশা জানান, ৭৮৬ সংখ্যাটি শুভ বলে নম্বরের শেষে ওই সংখ্যা রয়েছে, এমন বহু নোট তিনি তাঁর মা-কে পাঠিয়ে সেগুলো রেখে দিতে বলেছিলেন। পুলিশ আরও জেনেছে, সুনীল প্রায়ই একটি ট্যাক্সি ব্যবহার করত। তার চালক পুলিশকে জানান, সুনীল দু’দিন আগে তাঁকে নগদ আড়াই হাজার টাকা দিয়েছেন। পুলিশ দেখে, ওই সব নোটের নম্বরের শেষেও ৭৮৬।

Advertisement

নিহত কমলাদেবীর এক প্রতিবেশীর দাবি, ‘‘সোমবার রাতে টিউশন পড়ে বাড়ি ফিরে দিদিমার দেহ প্রথম দেখে চিৎকার করে ওঠে কমলাদেবীর নাতনি, আয়েশার মেয়ে ন’বছরের সোহা। সে তখনই বলেছিল, ‘আমার মেসোই দিদিমাকে খুন করেছে।’ আসলে কমলাদেবীর সঙ্গে সুনীলের ব্যবহার অনেক সময়েই খারাপ লেগেছিল সোহার।’’

কিন্তু খুনের কারণ কী? পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, কসবার নস্করপাড়ার ওই ফ্ল্যাটটি কমলাদেবীর ছোট মেয়ে আয়েশার নামে। সাত মাস আগে একই বাড়ির দোতলায় কমলাদেবী আয়েশার নামেই আরও একটি ফ্ল্যাট কেনেন। এক প্রতিবেশীর কথায়, ‘‘আয়েশার উপার্জনের টাকাতেই দু’টি ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে। আয়েশার মেয়ে সোহা থাকত কমলাদেবীর কাছে। তা থেকেই আক্রোশ ছিল সুনীলের মনে।’’ পুলিশের সন্দেহ, শাশুড়ির কাছে থাকা শ্যালিকার টাকাপয়সা হাতাতে চেয়েছিল সুনীল। কিন্তু কমলাদেবী না চাওয়ায় শাশুড়িকে খুন করে হাতের সামনে যা পেয়েছে, লুটে নিয়েছে সে। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে সুনীল বেপাত্তা হয়ে যায়।

পুলিশের ভরসা ছিল, খুনের পরে খোয়া যাওয়া মোবাইল থেকে কিছু হদিস মিলবে। কিন্তু তা বন্ধ ছিল। তদন্তকারীরা তক্কে তক্কে ছিলেন, কখন সেটি চালু করা হয়। শেষমেশ সেটি প্রথম চালু হয় ৬ জানুয়ারি, বুধবার। ফোনটি ছিল সুনীলের বন্ধু নিয়াজের কাছে। কিন্তু চালু হলেও সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরা গেল না কেন? পুলিশ জানায়, নিয়াজের দু’টি ফ্ল্যাট। একটি এন্টালিতে, অন্যটি আনন্দপুরে। দু’টি জায়গায় সে ঘন ঘন যাতায়াত করছিল বলে নিয়াজকে চিহ্নিত করতে অসুবিধে হচ্ছিল। শেষমেশ টাওয়ার লোকেশন ধরেই নিয়াজকে পাকড়াও করে পুলিশ। পুলিশের অনুমান, পলাতক সুনীলের খোঁজ দিতে নিয়াজ সাহায্য করতে পারে। এই ব্যাপারে সুনীলের স্ত্রী গীতাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ দিন নিহত কমলা রাজবংশীর ছোট মেয়ে আয়েশা কসবা থানায় যান। তিনি বলেন, ‘‘মায়ের খুনিরা ধরা পড়ুক এবং তাদের যেন উপযুক্ত শাস্তি হয়।’’

এ দিন আলিপুর আদালতে তোলা হলে ধৃত নিয়াজকে ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement