Debasmita Ghosh

পেশি নষ্ট হয়ে হুইলচেয়ার-বন্দি দেবস্মিতার দশমে ৯৮.৬ শতাংশ

হুইলচেয়ার-বন্দি দেবস্মিতার প্রাপ্ত নম্বর অঙ্কে ১০০, বাংলায় ৯৬, ইংরেজিতে ৯৯, বিজ্ঞানে ৯৭, সোশাল সায়েন্সে ৯৭, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ১০০।

আর্যভট্ট খান

শেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৩৯
Share:

কৃতী: পড়ার ঘরে দেবস্মিতা ঘোষ। বৃহস্পতিবার, বাঁশদ্রোণীর বাড়িতে। ছবি: সুমন বল্লভ।

ঘুমোনোর সময়ে পাশ ফিরতে মায়ের সাহায্য লাগে। পেনের ঢাকনা, জলের বোতলের মুখটাও খুলতে পারে না সে। পারে না কম্পাস দিয়ে বৃত্ত আঁকতে। তাক থেকে নামাতে পারে না মোটা বই। কিন্তু যা পারল, তা হল সিবিএসই বোর্ডের দশম শ্রেণির পরীক্ষায় সে ৯৮.৬ শতাংশ নম্বর জুড়ল নিজের ঝুলিতে। দেবস্মিতা ঘোষ। বাঁশদ্রোণীর বাসিন্দা দেবস্মিতা জন্ম থেকেইবিরল জিনঘটিত রোগ ‘স্পাইনাল মাস্কুলার অ্যাট্রফি’-তে (এসএমএ) আক্রান্ত।

হুইলচেয়ার-বন্দি দেবস্মিতার প্রাপ্ত নম্বর অঙ্কে ১০০, বাংলায় ৯৬, ইংরেজিতে ৯৯, বিজ্ঞানে ৯৭, সোশাল সায়েন্সে ৯৭, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ১০০। ইন্দাস ভ্যালি ওয়ার্ল্ড স্কুলের ছাত্রীটি তার স্কুলেও প্রথম। ভবিষ্যতে বায়ো-ইনফরমেটিক্স নিয়ে পড়তে চায় দেবস্মিতা। তার এই ভাল ফলের সবটুকু সে তার মা, বাবা ও স্কুলের অবদান বলেই মনে করছে।

হুইলচেয়ারে বসে ডান হাতের দুটো আঙুল দিয়ে গাল চেপে ধরে হাসিমুখে কথা বলছিল কিশোরী। এটা তার বসার বিশেষ কোনও ভঙ্গিমা নয়, বরং দুই আঙুল গাল থেকে সরে গেলেই দেবস্মিতার ঘাড় আর তার মাথাকে সোজা ধরে রাখতে পারে না। মাথা হেলে যায়। তাই এ ভাবেই নিজেকে অভ্যস্ত করে ফেলেছে সে। এসএমএ আক্রান্ত হওয়ায় দেবস্মিতার পেশির জোর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হুইলচেয়ারে বন্দি কিশোরীর ঘাড় সোজা রেখে মাথার ভার নেওয়ার শক্তি না থাকলেও সিবিএসই দশমে তার ফলাফল মাথা উঁচু করে দিয়েছে মা,বাবার পাশাপাশি তার স্কুলকেও। তাদের প্রিয় ছাত্রীকে অভিবাদন জানিয়েছে স্কুলও।

দেবস্মিতার বাবা দেবাশিস ঘোষ পেশায় বিএসএনএলের আধিকারিক এবং মা মৌমিতা ঘোষ অপ্টোমেট্রিস্ট। মৌমিতা বলেন, ‘‘ওর লড়াইটা শুরু হয়েছিল রোগ নির্ণয়ের দিন থেকেই। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, একাধিক স্কুলের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া, ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থার অবনতি— সব কিছুর মধ্যে দিয়ে এগোতে হয়েছে। প্রতিদিনের ফিজ়িয়োথেরাপি, কোলে করে স্কুলে নিয়ে যাওয়া— এটাই ছিল আমাদের বাস্তবতা। কিন্তু স্কুলে ভর্তি নিতে অস্বীকার আর সব বাধার জবাব দিয়েছে ও নিজের মেধা, অধ্যবসায় দিয়ে ফলাফলের মাধ্যমে। আজকের এই সাফল্য প্রমাণ করে, সুযোগ পেলে ওর জায়গা ঠিক কোথায়। যারা এক দিন ওকে সুযোগ দেয়নি, এই ফলাফলই তাদের সবচেয়ে বড় জবাব।’’

আর হাসিখুশি দেবস্মিতা বলে চলে, ‘‘এ সব নিয়ে ভাবি না যে, আমার বন্ধুদের জীবনে এই সব সমস্যা নেই। কারণ, আমার কাছে এটাই স্বাভাবিক জীবন। আমার এই স্বাভাবিক জীবন দিয়েই সব স্বপ্ন পূরণ করতে চেষ্টা করব।’’ পড়াশোনার পাশাপাশি গল্পের বই পড়তে খুব ভালবাসে দেবস্মিতা। একসঙ্গে চার থেকে পাঁচটা বই পড়ে। বছর ষোলোর এই কিশোরী হ্যারি পটার থেকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবী চৌধুরানী সে সব পড়ে শেষ করে ফেলেছে। আবার গানপ্রিয় দেবস্মিতার ভাল লাগে রাহুল দেব বর্মণ থেকে এ আর রহমান— সকলের গান।

পড়াশোনার ফাঁকেই চলে এ সবও। তবে জীবনে শৃঙ্খলা ও নিয়ামনুবর্তিতা থাকা জরুরি বলে মনে করে কিশোরী। তাই ঘড়িতে ঠিক চারটে বাজতেই কথা থামিয়ে দিল সে। তখন তার মন শুধুই অনলাইন ক্লাসে।

দেবস্মিতার ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে চোখ পড়ল তাকে রাখা বেশ কিছু ট্রফির দিকে। থমকে দাঁড়াতেই মৌমিতা জানালেন,অঙ্কের অলিম্পিয়াড, অ্যাবাকাস, দাবা— নানা ক্ষেত্র থেকে প্রাপ্তি মেয়ের এই সব পুরস্কার। মৌমিতা থেমে বলেন, ‘‘ওর চিকিৎসার জন্য প্রচুর খরচ। কিন্তু যে মেয়ের মধ্যে এত সম্ভাবনা, তার জন্য কি থেমে যাওয়া সম্ভব?’’ ট্রফিগুলির দিকে তাকিয়ে কথাগুলি বলে থামা এক মায়ের চোখ তখন মেয়ের সাফল্যে চিক চিক করছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন