হেমচন্দ্র স্ট্রিট

পড়শিদের যোগাযোগটা ধরা আছে আড্ডায়

মৃদু হাওয়ায় পদ্মপুকুরের জলে ছোট ছোট ঢেউ। চার দিকের আলোকস্তম্ভ আর পরিছন্ন পরিবেশ নিয়েই ষোলোআনা বাঙালিপাড়া হেমচন্দ্র স্ট্রিট। এখানেই রয়েছে কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বসতবাড়ি।

Advertisement

বাণী চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ ০১:২১
Share:

মৃদু হাওয়ায় পদ্মপুকুরের জলে ছোট ছোট ঢেউ। চার দিকের আলোকস্তম্ভ আর পরিছন্ন পরিবেশ নিয়েই ষোলোআনা বাঙালিপাড়া হেমচন্দ্র স্ট্রিট। এখানেই রয়েছে কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বসতবাড়ি। তাঁরই নামাঙ্কিত আমাদের পাড়ার রাস্তাটা। কবিতীর্থ সরণি থেকে শুরু হয়ে হেমচন্দ্র স্ট্রিট সোজা গিয়ে মিশেছে রমানাথ পাল রোডে।

Advertisement

কালের নিয়মে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু প্রায় একই রকম রয়েছে আমাদের এই পাড়ার চেহারাটা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, পুরনো মন্দির, পরিচিত রাস্তা, প্রতিবেশী সব যেন আমার কত আপন। সুখ-দুঃখে সকলের পাশে থাকাই এ পাড়ার বিশেষত্ব। পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও প্রবহমাণ এই পরম্পরা।

এখানে আজও টিকে আছে পাড়ার আড্ডাটা। তাতেই প্রতি দিন অফিস ফেরত কিছু মানুষের এখনও নিয়মিত যোগাযোগ দেন। আড্ডা বসে কদমগাছ তলায়, বাড়ির সামনের রকে, কখনও বা ক্লাবে। আড্ডা দেন মহিলারাও। আড্ডাটাই ধরে রেখেছে সম্পর্কের যোগসূত্রটা। আমাদের পাড়াটা শান্তিপূর্ণ। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকলেও তার কোনও প্রভাব পড়ে না পাড়ায়।

Advertisement

কিছু কিছু পরিবর্তনও এসেছে। তৈরি হয়েছে বহুতল। তবে সেগুলিতে এসেছেন আশপাশের পাড়ার মানুষ। আজও বেশির ভাগ প্রতিবেশী পুরনো। আর নতুন যাঁরা এসেছেন পুরনোরা তাঁদের আপন করে নিয়েছেন। কয়েক দিন দেখা না হলেই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীরা এসে খোঁজ নেন কিংবা ফোনে যোগাযোগ করেন। এমনটা কি সব জায়গায় হয়?

এ পাড়ার ল্যান্ডমার্ক পদ্মপুকুর। সেখানেই রয়েছে খিদিরপুর সুইমিং ক্লাব। পুর উদ্যোগে পদ্মপুকুরটির রক্ষণাবেক্ষণ হয়। এলাকার উন্নয়নে কাউন্সিলর ষষ্ঠী দাস সব সময়ে আগ্রহী। কোনও সমস্যার কথা জানালে তিনি সমাধানের চেষ্টা করেন। দিনে দু’বার করে রাস্তা পরিষ্কার ও জঞ্জাল অপসারণ হয়। নিয়মিত ছড়ানো হয় ব্লিচিং এবং মশা মারার তেলও। পাড়াতেই রয়েছে বঙ্কিম ঘোষ মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুল, খিদিরপুর অ্যাকাডেমি। পাড়ার শেষ প্রান্তে গোপাল ডাক্তার রোডে রয়েছে আখড়াবাড়ি। প্রাক স্বাধীনতা যুগে এটাই অনুশীলন সমিতির শরীরচর্চার কেন্দ্র। এখানেই রয়েছে একটি কালীমন্দির। তেমনই হেমচন্দ্র স্ট্রিটের কাছেই লক্ষ্মীনারায়ণ গঞ্জ গলিতে রয়েছে প্রাচীন একটি শিবমন্দির।

Advertisement

তবে কমেছে খেলাধুলো। মাঠগুলি যে সব হারিয়ে গেল। ছোটরা আগে হেস্টিংসে খেলতে যেত। সেখানে ফ্লাইওভার তৈরি হওয়ায় আর খেলা সম্ভব হয় না। কাছাকাছি কিছু ক্লাবের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে জিম এবং যোগ-ব্যায়াম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ফুটপাথেই বসে বাজার। আর কিছুটা দূরে রয়েছে খিদিরপুর বাজার এবং বাবুবাজার।

এমনিতে পার্কিং সমস্যা না থাকলেও রাত কারা যেন লরি এবং গাড়ি পার্ক করে চলে যায়। ভোরের দিকে নিজের গাড়ি বার করতে সমস্যা বইকী!

পুজোর ক’টা দিন একসঙ্গে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া, ভোগ খাওয়া কিংবা জমিয়ে আড্ডা দেওয়ার ছবিটা আজও অপরিবর্তিত রয়েছে। এ ছাড়াও এখানে হয় কিছু প্রাচীন পারিবারিক দুর্গাপুজো। এর মধ্যে বাকুলিয়া হাউজ, সাহাবাড়ি, বড়বাড়ি, বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির পুজো উল্লেখযোগ্য।

পাড়ায় রয়েছে হেমচন্দ্র লাইব্রেরি ও সুকান্ত পাঠাগার। অন্যান্য লাইব্রেরিতে পাঠকসংখ্যা কমলেও এখানে আজও পড়ার অভ্যাসটা কিছুটা হলেও আছে। প্রতি বছর হেমচন্দ্র লাইব্রেরির উদ্যোগে হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আগে এ পাড়ায় ‘বাণী বন্দনা ও সুধী সম্মেলন’ নামের জমজমাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। এতে কবি, সাহিত্যিক, লেখক থেকে বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পীরা অংশগ্রহণ করতেন। সেখানেই দেখেছি প্রমথনাথ বিশী, চপলাকান্ত ভট্টাচার্যকে। এ ছাড়া পঙ্কজকুমার মল্লিক, পাহাড়ী সান্যাল, হিমাংশু দত্ত কিংবা মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অনুষ্ঠানের কথা আজও মনে পড়ে।

এখানেই কেটেছে চার পুরু‌ষ। তাই শিকড়ের টান অটুট। এটা বেশি করে উপলব্ধি করি যখন কয়েকটা দিন পাড়াটাকে ছেড়ে থাকি। মনটা তখন আনচান করতে থাকে ফিরে আসার অপেক্ষায়। এটা টান ছাড়া আর কী? আমি বলি, নাড়ির টান! এখানেই জন্ম, এখানেই কেটেছে জীবনটা। তাই এই শেষবেলায় অন্যত্র যাওয়ার কথা ভাবি না।

লেখক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক

ছবি: শুভাশিস ভট্টাচার্য।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement