Miscreant

কোন সমীকরণে অধরা পাপ্পু? প্রশ্ন রাজুর গ্রেফতারিতে

গোলপার্কের কাঁকুলিয়া রোডের পঞ্চাননতলায় ১ ফেব্রুয়ারি রাতের গন্ডগোলে নাম জড়ায় পাপ্পুর। অভিযোগ, সেখানে প্রোমোটিং সংক্রান্ত বিবাদের জেরে গুলি চলে, বোমা ফাটে।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:০০
Share:

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

এক জন গ্রেফতার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই। অপর জন ১৫ দিন পরেও অধরা। এক জন উত্তর-পূর্ব কলকাতার ‘বাহুবলী নেতা’ রাজু নস্কর, অন্য জন দক্ষিণ কলকাতার ‘কুখ্যাত’ সোনা পাপ্পু ওরফে বিশ্বজিৎ পোদ্দার। জনশ্রুতি, দ্বিতীয় জন নিজের প্রভাব সম্পর্কে প্রকাশ্যেই বলে থাকেন— ‘‘আমাকে ছোঁবে কে? আমার চেনা বহু দূর।’’ রাজুকে রাতারাতি গ্রেফতার করা হলেও কোন পরিচিতির প্রভাবে পাপ্পুকে ধরছে না পুলিশ? এখন এই প্রশ্নই উঠছে নানা মহল থেকে। দক্ষিণ কলকাতার ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের বড় অংশের দাবি, পুলিশ যা-ই যুক্তি দিক, পাপ্পুর গ্রেফতার না হওয়ার পিছনে আদতে রয়েছে দক্ষিণ কলকাতার নেতা-দাদাদের রাজনৈতিক সমীকরণ। যা উত্তর-পূর্ব কলকাতার রাজনীতিতে এই মুহূর্তে অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছে রাজুর জন্য।

গোলপার্কের কাঁকুলিয়া রোডের পঞ্চাননতলায় ১ ফেব্রুয়ারি রাতের গন্ডগোলে নাম জড়ায় পাপ্পুর। অভিযোগ, সেখানে প্রোমোটিং সংক্রান্ত বিবাদের জেরে গুলি চলে, বোমা ফাটে। কলকাতার সদ্য নিযুক্ত নগরপাল সুপ্রতিম সরকার দাবি করেন, ‘‘যারা ঘটনা ঘটিয়েছে, কাউকে ছাড়া হবে না।’’ কিন্তু পুলিশ ২৩ জনকে গ্রেফতার করলেও ধরা পড়েননি পাপ্পু। এর মধ্যে সমাজমাধ্যমে ভিডিয়ো করে তিনি নিজের পক্ষে বার্তা দিয়েছেন। ইতিমধ্যে ওই ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া ২৩ জনের মধ্যে ১৭ জন জামিন পেয়ে যাওয়ায় বিতর্ক বাড়ে। তির্যক মন্তব্য করে আদালত জানিয়ে দেয়, তদন্তের সঙ্গে অভিযোগের মিলই পাওয়া যায়নি।

প্রশ্ন উঠেছে, রবীন্দ্র সরোবর থানা কি যথাযথ তদন্ত করেছিল? কেন শহরের এমন গোলমালের ঘটনায় লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হল না? গুলি চললেও কেন আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা গেল না? পুলিশের একাংশের যুক্তি, গন্ডগোলের সময়ে পাপ্পু ঘটনাস্থলে যাননি। যদিও পুলিশের অপর অংশ পাপ্পুকে না ধরার পিছনে নেতাদের সঙ্গে তাঁর সখ্যতার দিকে আঙুল তুলছে।

কসবার সুইনহো লেনের পাপ্পু বছর তেরো আগেও বাবার সোনার দোকানে কাজ করতেন। সেখান থেকেই নাম সোনা পাপ্পু। রাজ্যে পালাবদলের পরে ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধির হাত ধরে রাজনীতিতে পা রাখেন তিনি। ২০১৫ সালে বালিগঞ্জ রেল ইয়ার্ডে এলাকা দখলের সংঘর্ষ ঘিরে পাপ্পুর নাম প্রথম বড় ধরনের অপরাধে জড়ায়। এর মধ্যেই কসবা, তিলজলা, তপসিয়া এলাকার অবাধ সিন্ডিকেট-রাজের ‘বাদশা’ হিসাবে উঠে আসে পাপ্পুর নাম। ২০১৭ সালে নির্মাণ ব্যবসা ঘিরে একটি খুনের ঘটনায় নাম জড়ায় তাঁর। ২০২১ সালে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের বাইরে ২৫ জন সঙ্গীকে নিয়ে বিরোধী গোষ্ঠী মুন্না পাণ্ডের উপরে হামলা চালানোর অভিযোগও ওঠে পাপ্পুর বিরুদ্ধে। আদালতের নির্দেশে কসবায় পাপ্পুর প্রবেশ বন্ধ হলেও ঢাকুরিয়া, গোলপার্ক এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু হয় তাঁর। লেক এলাকার এক বাসিন্দার দাবি, ‘‘নেতা-দাদাদের আশীর্বাদে অল্প দিনের মধ্যে এই সব এলাকাও পাপ্পুর দখলে চলে এসেছে। সমীকরণ স্পষ্ট— লোক এনে পাপ্পু নেতার সভা ভরান, বদলে পাপ্পুর কাজে নেতারা সাহায্য করেন। সামনে ভোট, দক্ষিণে পাপ্পুকে চটালে মুশকিল।’’

কিন্তু রাজু? বেলেঘাটার ‘ত্রাস’ রাজুর উত্থান বাম আমলেই। সেই সময়েই শুরু নির্মাণ ব্যবসা। ট্যাংরার একটি খুনের মামলায় নাম জড়ায় তখনই। পরিবর্তনের পরে দল বদলান রাজু। বিরোধীদের জব্দ করার মূল মন্ত্র যাঁদের থেকে শিখেছিলেন, সেই মন্ত্রে এখন ঘায়েল করেন তাঁদেরকেই। খুন, খুনের হুমকি, তোলাবাজি, মারধর-সহ ভূরি ভূরি অভিযোগ জমা পড়লেও রাজু অধরাই থাকেন। তাঁর ক্লাব বেলেঘাটা গান্ধী ময়দান ফ্রেন্ডস সার্কলের পাঁচিল বোমায় উড়ে গেলেও তাঁকে ধরা হয় না। ২০১৪ সালে চৌরঙ্গি কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিরোধী দলের তরুণীকে ফেলে মারার অভিযোগও না-দেখা হয়েই পড়ে থাকে। একই অবস্থা হয় ১৪ কাঠা পুকুর বোজানোর ঘটনায় পুরসভার দায়ের করা এফআইআরে রাজুর নাম থাকলেও।

স্থানীয়দের দাবি, ইদানীং সমীকরণ বদলেছে। রাজু এখন নিজের মতো চলেন। গত বিধানসভা ভোটের দিনেও রাজু বসে গিয়েছেন, ভোট করাচ্ছেন না বলে ছুটে যেতে হয়েছে উত্তর কলকাতার সাংসদ, বিধায়কদের। ভোটের আগে কি রাজুর ঝামেলা তাই ঝেড়ে ফেলতে চাওয়া হচ্ছে? শোনা যাচ্ছে, ভোটে টিকিট পেতে তিনি নাকি বিরোধী দলের সঙ্গেও সদ্ভাব রাখছেন। গ্রেফতারির পিছনে সেটাও কারণ কিনা, ভাবছে রাজু-ঘনিষ্ঠরাই।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন