স্বরূপ বিশ্বাস। — ফাইল চিত্র।
তোলাবাজির অভিযোগে ধৃত স্বরূপ বিশ্বাসকে আদালতে প্রাক্তন ‘প্রভাবশালী মন্ত্রীর লক্ষ্মণ-ভাই’ বলে উল্লেখ করেছেন সরকারি আইনজীবী। সওয়ালে তিনি দাবি তুলেছেন, কার কথায় টাকা তুলতেন স্বরূপ, তা দেখা দরকার। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপকে ১৪ দিনের জন্য পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে কলকাতার আলিপুর আদালত।
শুক্রবার আদালতে স্বরূপের আইনজীবী অভিযোগপত্রের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি সওয়াল করে জানান, সাত-আট জনের অভিযোগ রয়েছে। মূল অভিযোগকারিণীকে বলা হয়েছিল, কাজ পেতে গেলে কিছু ‘ফেভার’ (সুবিধা) দিতে হবে। যদি সুবিধা না দেয়, তা হলে মেরে টাঙিয়ে দেওয়া হবে, বলা হয়েছে অভিযোগে। আইনজীবীর বক্তব্য, ‘‘কিন্তু ওই কথা স্বরূপ বলেননি। অন্য এক জন ওই কথা বলেছেন বলে অভিযোগ পত্রেই লিখেছেন।’’ অভিযোগপত্রে জানানো হয়, অস্ত্র নিয়ে অভিযোগকারিণীকে ভয় দেখানো হয়। কিন্তু তিনি চিৎকার করার পরে অভিযুক্ত চলে যান। এই নিয়ে স্বরূপের আইনজীবীর সওয়াল, ‘‘শুধু চিৎকারেই চলে যাচ্ছে, অথচ কেউ কিছু করছেন না, এই বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।’’
অভিযোগ উঠেছে, রিজেন্ট পার্ক থানায় আগে অভিযোগ নেয়নি। এই কথা জানান অভিযোগকারিণী। এই নিয়ে স্বরূপের আইনজীবীর দাবি, রিজেন্ট পার্ক থানার ওসিরও এই মামলার আওতায় আসা উচিত। তাঁর সওয়াল, অভিযোগপত্রে এক জনের কথা থাকলেও তিনি নিজে অভিযোগ করছেন না। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, কার্তিক ভট্টাচার্যের থেকে ৪৫,০০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কার্তিক তিন ভাগে ৪৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। আইনজীবীর দাবি, সিজারলিস্ট (বাজেয়াপ্ত করা জিনিসপত্রের তালিকা) দেখা হোক, স্বরূপের সই করা নথি রয়েছে কি না! ওই সিজার লিস্টে স্বরূপের সই রয়েছে কি না, তা দেখার আবেদনও তিনি করেছেন। তাঁর দাবি, ২২ লক্ষ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হলেও কোনও নথি বা প্রমাণ নেই।
অভিযোগ উঠেছে, এক প্রতিবাদীকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়, হুমকি দেওয়া হয়। নেপথ্যে ছিলেন ধৃত স্বরূপ। আইনজীবীর দাবি, কেস ডায়েরিতে হুমকি বা এই ধরনের কোনও অভিযোগ রয়েছে কি না দেখা হোক। ধৃতের আইনজীবী আদালতে আরও বলেন, ‘‘এই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কোনও অনুসন্ধান করেনি বলে আমরা জানতে পেরেছি। কোনও সিনিয়র অফিসারকে সেই অনুসন্ধান রিপোর্টও দেওয়া হয়নি। এই অভিযোগ কতটা ম্যানিপুলেটেড (পরিচালিত), সেটা পুলিশের দায়িত্ব প্রাথমিক অনুসন্ধান করা।’’ আইনজীবী এ-ও দাবি করেন, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হয়নি। পুলিশ চাইলে বিভিন্ন জায়গার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখতে পারত।
সরকারি আইনজীবী সৌরীণ ঘোষালের সওয়াল, ‘‘এই অভিযুক্ত প্রাক্তন এক মন্ত্রীর ভাই, কতটা প্রভাবশালী ভাবুন! শুধু এক জন না, একাধিক নির্যাতিত রয়েছেন বলে অভিযোগকারিণী জানিয়েছেন। প্রাথমিক ভাবে দেখা যাচ্ছে, অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে বলে অভিযোগকারিণী দাবি করেছেন। বাকি ভিকটিম থাকলে সেটাও তদন্ত করতে হবে। টাকা কোথায় গিয়েছে সেটাও দেখতে হবে।’’ তার পরেই তিনি বলেন, ‘‘প্রভাবশালী মন্ত্রীর লক্ষ্মণ-ভাই। কার কথায় টাকা তুলেছেন দেখতে হবে!’’
বৃহস্পতিবার রাতে স্বরূপকে গ্রেফতার করেছে নিউ আলিপুর থানার পুলিশ। তোলাবাজি এবং শ্লীলতাহানির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ, টালিগঞ্জের টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োর টেকনিশিয়ানদের কাছ থেকে টাকা তুলতেন তিনি। সূত্রের খবর, রিজেন্ট পার্ক এলাকার বাসিন্দা এক মহিলা স্বরূপের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। তিনি টালিগঞ্জের মেকআপ আর্টিস্ট ফেডারেশনের সদস্য। বছর দুয়েক ওই মহিলা কোনও কাজ পাননি বলে অভিযোগ। কাজ চাইতে গেলে তাঁর কাছ থেকে টাকা দাবি করা হয়। এমনকি, তাঁকে ভয়ও দেখানো হয়েছিল। মহিলার দাবি, তাঁর এক সহকর্মী স্বরূপকে ৪৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই পদক্ষেপ করেছে নিউ আলিপুর থানা। হুমকি দিয়ে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে কয়েক লক্ষ টাকা তোলার অভিযোগ রয়েছে স্বরূপের বিরুদ্ধে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংশ্লিষ্ট ধারায় স্বরূপের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানি, তোলাবাজি, খুনের চেষ্টা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মামলা রুজু করা হয়েছে।
টালিগঞ্জের ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়ার সভাপতি ছিলেন স্বরূপ। দীর্ঘ দিন ধরেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল একাংশের কলাকুশলী এবং কর্মচারীদের। তৃণমূল ক্ষমতায় থাকাকালীন স্বরূপের দাপট ছিল। তবে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর তা উধাও হয়েছে। সম্প্রতি স্বরূপের ফেডারেশনের অস্তিত্বও মুছে দেওয়া হয়েছে।
‘নিউ আলিপুর সুরুচি সংঘ’-এর সচিবও ছিলেন স্বরূপ। তাঁর গ্রেফতারির পরে শুক্রবার বিকেলে ক্লাবে ভাঙচুর চালায় একদল লোক। প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ এবং তাঁর ভাই স্বরূপের নামে স্লোগান ওঠে। সুরুচি সঙ্ঘের হোর্ডিং, পোস্টার ইত্যাদি ছিঁড়ে ফেলা হয়।