উদ্ধারকাজ চলছে তারাতলায়। ছবি: পিটিআই।
ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ১২টা ৫ থেকে ৭–এর মধ্যে হবে। হঠাৎ করেই প্রবল শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোড। কলকাতা বন্দর এলাকার এই ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডের দু’দিকে সার সার গুদাম। কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের জমিতে লিজ় নিয়ে তৈরি বিভিন্ন জিনিসের গুদাম।
ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছিলেন উজ্জল কুমার। ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডেই একটি গুদামে কাজ করেন উজ্জ্বল। তিনি বলেন, ‘‘ভূমিকম্পের মতো প্রবল একটা ঝাঁকুনি হল। তার পরেই বিস্ফোরণের মতো বিকট আওয়াজ।’’ উজ্জ্বল জানান, তখন তাঁদের গুদামে শ্রমিকেরা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে দৌড়োন দু’নম্বর প্লটের দিকে। যার সরকারি ভাবে ঠিকানা বি/২ ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোড। ঘটনাস্থলে পৌঁছে হতবাক হয়ে যান উজ্জ্বলেরা। গোটা গুদামটাই ভেঙে পড়েছে।
অন্তত ৪০ জন ছাদের তলায় চাপা পড়েছেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন উজ্জ্বল। তিনি জানান, তখন তাঁরাই শুরু করেন উদ্ধারকাজ। কিন্তু বড় বড় লোহার বিম আর কংক্রিট সরিয়ে কাউকে বার করতে পারেননি তাঁরা। উজ্জ্বল বলেন, ‘‘আমরা পরিস্থিতি দেখে বুঝলাম, কাউকে উদ্ধার করতে পারব না। আমরা পুলিশ ও দমকলকে খবর দিলাম। আর যাঁদের দেখতে পাচ্ছিলাম তলায় আটকে রয়েছেন, তাঁদের জলের বোতল দিলাম।’’ ঘটনার প্রায় ৩০ মিনিট পর দমকল এবং পুলিশ এসে উদ্ধারকাজ শুরু করে।
কলকাতা পুলিশ উদ্ধার কাজ শুরুর করার ঘণ্টাখানেক পরে রাজ্যের তরফে ফোর্ট উইলিয়ামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সেনা চার কলম বাহিনী পাঠায়। উদ্ধারকাজে পারদর্শী ইঞ্জিনিয়ার এবং চিকিৎসকদের দল পাঠায়। সেনার পাশাপাশি, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দর কর্তৃপক্ষ একাধিক বড় ক্রেন, গ্যাস কাটার ও তাঁদের যে নিজস্ব দমকল বাহিনী, অ্যাম্বুল্যান্স, চিকিৎসকদল পাঠিয়ে উদ্ধারকাজে আরও গতি আনেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, উদ্ধারকাজে দেরি হলে আরও প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল।
স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, ওই গুদাম শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পোর্ট অথরিটির কাছ থেকে ইজারা নিয়েছিল ‘বেহরা ব্রাদার্স’ নামে একটি সংস্থা। ‘বেহরা ব্রাদার্স’ ওই এলাকার খুব পরিচিত একটি সংস্থা। মালিকের নাম শম্ভুনাথ বেহরা। এমনটাই জানালেন উজ্জ্বল। এই সংস্থা মূলত চা-পাতা গুদামজাত এবং প্যাকেজিংয়ের কাজ করে। বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে খবর, এই জমিটি ১ অগস্ট ২০২৪ থেকে ৩০ বছরের জন্য লিজ় নিয়েছিল ‘বেহরা ব্রাদার্স’। স্থানীয়দের সূত্রে খবর, তাদের একটি অফিস রয়েছে মুন্সিগঞ্জে। মালিক থাকেন নিউ আলিপুরে। উজ্জ্বলের মতো অন্য স্থানীয়েরা জানালেন, আগে ওই জায়গায় একটি গুদাম ছিল। প্রথমে সেই গুদামটি মেরামতের চেষ্টা করা হয়। তার পর ভেঙে দিয়ে সেই জায়গাতেই নতুন একটি গুদাম তৈরির কাজ শুরু হয় প্রায় বছরখানেক আগে।
ওই এলাকায় অন্য বিভিন্ন গুদামে কাজ করেন এমন অনেকেই দাবি করেন, আসগর নামে এক পরিচিত ঠিকাদার গুদাম তৈরির কাজ করছিলেন। আসগর এলাকার (৮০ নম্বর ওয়ার্ড) কাউন্সিলর আনোয়ার খানের ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত, দাবি স্থানীয়দের। পুলিশ সূত্রে খবর, ‘বেহরা ব্রাদার্স’ দাবি করেছে, ‘অয়ন ট্রেডার্স’ নামে একটি সংস্থাকে গুদাম তৈরির বরাত দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ২০ হাজার বর্গফুটের গুদাম। অয়ন ট্রেডার্সের সঙ্গে আসগরের কী সম্পর্ক তা এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশ সূত্রে খবর, বেহরা ব্রাদার্সের দেওয়া চুক্তির নথিপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঠিকাদার সংস্থার নথি, গুদামের নকশা দেখা হচ্ছে। মালমশলা বা নকশায় কোনও গলদ ছিল কি না সেগুলোও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ ঘটনাস্থলে উদ্ধার কাজ তদারকি করার সময় বলেন, ‘‘এই সময়ে উদ্ধার কাজকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার পর কী ভাবে ভেঙে পড়ল এবং তার পিছনে কোনও গাফিলতি বা অন্য কোনও কারণ আছে কি না তা তদন্ত করা হবে।’’