আড়ালে থেকেও পুজোর বড় ভরসা ওঁরা

পর্দার আড়াল থেকেই ‘যুদ্ধ’ লড়েন ওঁরা! তা-ও আবার পাঁজির সময় ধরে। চার দিনের উৎসব শেষে মা দুর্গা ফিরে যান কৈলাসে। আর ‘ওঁরা’? নিজেদের কাজের জগতে কিংবা সংসারে।

Advertisement

কুন্তক চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০২:১৮
Share:

পর্দার আড়াল থেকেই ‘যুদ্ধ’ লড়েন ওঁরা! তা-ও আবার পাঁজির সময় ধরে। চার দিনের উৎসব শেষে মা দুর্গা ফিরে যান কৈলাসে। আর ‘ওঁরা’? নিজেদের কাজের জগতে কিংবা সংসারে।

Advertisement

পুজো কমিটির তালিকায় ‘ওঁদের’ নাম খুঁজে মেলা ভার! কিন্তু ‘ওঁরা’ না থাকলে পুজোটাই হবে না। ওঁদের কারও নাম প্রতীক বা দেবাশিস। কারও নাম মৌসুমি কিংবা সোমা। পাড়ার পুজো কমিটির কাছে ‘ওঁরা’ পুজোর মূল চালিকাশক্তি। নিষ্ঠাভরে পুজোর জোগাড় করেন ওঁরাই। উত্তর হোক বা দক্ষিণ, থিম হোক বা সাবেকি— পুজোকর্তারা মেনে নিচ্ছেন এই ‘ওঁদের’ ছাড়া পুজো উতরানো অসম্ভব।

কলকাতার সাবেকি পুজোর ‘মুখ’ বাগবাজার সর্বজনীনে পুজোর উপচার, নৈবেদ্য সাজানোর দায়িত্বটা কার্যত নারীশক্তির হাতেই। সেখানে খোদ পুজো কমিটির সম্পাদকেরও প্রবেশ ‘অনুমতিসাপেক্ষ’। ৫০ বছর আগে বাগবাজারের পুজোর ভোগ রান্নার দায়ভার কাঁধে নিয়েছিলেন ভারতী মুখোপাধ্যায়। এখন সত্তর পেরিয়েও সে দায়ভার ঝেড়ে ফেলেননি তিনি। বরং এখন তিনি ‘কমান্ডারের’ ভূমিকায়। তাঁর নির্দেশেই শীলা মুখোপাধ্যায়, কাকলি মুখোপাধ্যায়, ঝুমা বন্দ্যোপাধ্যায়েরা প্রতি বছর ঠাকুরের ভোগ রান্না করেন। আর নৈবেদ্য সাজানো, ফুল গোছানো, ফল কাটার মতো কাজে থাকেন মহিলাদের আর একটি দল।

Advertisement

নারীবাহিনীর সুবাদে পুজো উতরোয় বাগমারি বাজারের কাছে মানিকতলা ১৪ পল্লিতেও। সেখানে দু’হাতে ঘরে-বাইরে পুজোর ঝক্কি সামলে দেন রানাঘাটের মেয়ে, বাগমারির বৌ মৌসুমি রায়। বছর তিনেক আগে বিয়ে হয়ে উত্তর কলকাতায় এসেছেন। স্বামীর সূত্রেই বাঁধা পড়েছেন পাড়ার সর্বজনীন পুজোর সঙ্গে। শ্বশুরবাড়ি দুর্গাপুজোর পাশাপাশিই কাঁধে চেপেছে পাড়ার পুজোর দায়ও। মৌসুমি অবশ্য দায়, ঝক্কির মতো শব্দ সইবেন না। বলছেন, ‘‘পুজোর এই কাজেই আমার আনন্দ হয়, উপভোগ করি।’’ মৌসুমির পাশাপাশি ১৪ পল্লির বড় ভরসা পাড়ার দুই ‘সোমা’ বৌদিও। এলাকার দত্তবাড়ির সোমা ২১ বছর আগে স্বামীর ঘর করতে এসে পুজোয় জুড়ে গিয়েছিলেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের রামজীবনপুর থেকে বছর চারেক আগে শ্বশুরবাড়িতে আসার পর থেকে পুজোয় মেতেছেন ঘোষবাড়ির সোমাও।

সিংহি পার্কে অবশ্য পুজোর জোগাড়ের নেতৃত্বে এক পুরুষ, প্রতীক বসু। ওই পুজোর সংকল্পও তাঁর নামেই হয়। একবেলা নিরামিষ, অন্য বেলা ফলাহার— এই ডায়েটে পুজো কাটান তিনি। তবে তাঁর বাহিনীতে কিন্তু নারীশক্তিরই আধিক্য। তাঁদেরই এক জন পেশায় ই়ঞ্জিনিয়ার পৃথা রায় বলছেন, ‘‘পুজোর হুল্লোড়ের থেকে আমাদের এটাই ভাল লাগে। এমনও হয়েছে যে এই কাজের তালে রাস্তা পেরিয়ে প্রতিবেশী পাড়ার পুজোটাও দেখা হয়নি।’’

তবে এমনও অনেক পুজো আছে যেখানে জোগাড়ের কাজে কোনও ‘লিঙ্গবৈষম্য’ নেই। পুরুষ-প্রকৃতি সেখানে হাতে-হাত মিলিয়ে কাজ উতরে দেয়। বছরের পর বছর, পুজো কমিটির বদল হলেও জোগাড়ে টিমে কোনও বদল নেই! উত্তরের কাশী বোস লেনে গত ৫৭ বছর ধরে পুজো করা পুরোহিত কালীপ্রসন্ন ভট্টাচার্য বলছেন, ‘‘এমনই বোঝাপ়ড়া যে আমি মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই হাতের সামনে সব পেয়ে যাই!’’

পাড়া ছেড়ে বেপাড়ায় বাসা বেঁধেছেন। কিন্তু ঢাকে কাঠি পড়লেই পুরনো পাড়ার পুজোয় এসে জোগাড়ের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন, এমন লোকও এ শহরে আছেন! যেমন দক্ষিণ কলকাতার হিন্দুস্থান পার্কের পুজো কমিটির দেবাশিস-নূপুর। এক সময়ে ওই পাড়াতেই থাকতেন। সেই সূত্রেই পুজোর সঙ্গে যোগসূত্র। বাসাবদলের সূত্রে ভিন্‌ পাড়ায় ঠাঁই নিলেও পুজোর সঙ্গে যোগসূত্র ছেঁড়েনি। আজও হিন্দুস্থান পার্কে পুজো শুরু মানেই ওঁরা হাজির। নিজদায়িত্বে ফল কুচিয়ে ঠাকুরের নৈবেদ্য তৈরি করে দেওয়ার কাজ ওঁদের! পুজোর টানে এক সময়ে এ ভাবেই ফিরে আসতেন কলেজ স্কোয়্যার পুজো কমিটির কয়েক জন সদস্য। ওই ক’দিন ঘাঁটি গাড়তেন কলেজ স্কোয়্যার লাগোয়া একটি হোটেলে। শোনা যায়, ওই অতিথিদের জন্য পুজোর ক’দিন অন্য কাউকে ঘর ভাড়া দিতেন না হোটেল মালিকও।

তবে পর্দার আড়াল থেকে কিন্তু এ বার বেরিয়ে আসছেন এই বাহিনীর সদস্যেরা। যেমন পোস্তার দর্পনারায়ণ ঠাকুর স্ট্রিটে বছর বছর পুজোর উপচার গুছিয়ে দিয়েছেন মধুমিতা দে, যুঁই দত্ত, শিপ্রা সরকারদের নেতৃত্বে এলাকার প্রমীলা বাহিনী। রাজনৈতিক পালাবদলের আঁচ যাতে পুজোয় না পড়ে, তাই এ বার আড়াল থেকে বেরিয়ে পুজো কমিটির দায়ভার নিজেদের কাঁধে তুলে নিচ্ছেন দর্পনারায়ণের নারীরা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement