রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাসে কলকাতার রাস্তায় বাউলের কণ্ঠে শোনা গিয়েছিল, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়’। বঙ্কিমচন্দ্রের বিষবৃক্ষ-এ দাশু রায়ের পাঁচালি থেকে নিধুবাবুর টপ্পার ডালি নিয়ে বৈষ্ণবী সটান ঢুকে পড়েন অন্দরে, অন্তঃপুরিকাদের মনোরঞ্জনে। বৈষ্ণবীদের সঙ্গীত-পারদর্শিতার পাশাপাশি সেকালের মেয়েমহলের রুচির বৈচিত্রও স্পষ্ট সেখানে। ইংরেজি শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের আগে, অন্তঃপুরে অন্তত ভদ্র-ইতর রুচির এমন পাঁচিল ছিল না। অন্দরমহলের দুনিয়া পেরিয়ে, রাজপথের হট্টগোলেও সুর খুঁজে পেত শহর।
ফেরিওয়ালার সুরেলা ডাকে চাঁপাকলা বিক্রি করতে গিয়েই তো জহুরির চোখে ধরা পড়েছিলেন সঙ্গীতগুণী গোপাল উড়ে। শহরের অলিগলিতে সুরের কদর বোঝার মতো তৈরি কানও ছিল। তা না হলে কলকাতার ফেরিওয়ালার ডাক নিয়ে ইংরেজি প্রবন্ধের শিরোনাম কি আর ‘স্ট্রিট মিউজ়িক অব ক্যালকাটা’ হয়? রমেশচন্দ্র দত্তের কাকা শশীচন্দ্র দত্তের লেখায় ধরা আছে প্রায় বত্রিশ রকমের পণ্য ও পরিষেবা ফেরি করার ডাকের খতিয়ান। মানুষের স্বরযন্ত্রে ‘কুয়োর ঘটি তোলা’ আর ‘চুড়ি লিবি গো’ ডাকের পাশাপাশি যন্ত্রসঙ্গীতের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে কাঁসা-পেতলের বাসন বিক্রির ‘ঢং! ঢং! ঢং!’ আওয়াজ বা সাপুড়ের বীণের সুর। শশীচন্দ্রের কলকাতায় ভোর হত গানের সুরে। সাতসকালে ‘মাখনচোরা’র গান শুনিয়ে যাওয়া ভিক্ষুকের মাস গেলে বাঁধা ছিল চার পয়সা থেকে দু’আনা। গান গেয়ে জীবিকার্জন কলকাতার অন্যতম পুরনো পেশা, অষ্টাদশ শতকে সোফিয়া বেলনোসের আঁকা এক ফকির পরিবারের ছবিই তার প্রমাণ।
উনিশ শতকের কলকাতার শ্রমজীবীদের বড় অংশই ছিলেন পরিযায়ী। তাঁদের গানবাজনার এক ঝলক মিলত জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির দেউড়িতে। হোলির দু’-চার দিন আগে থেকেই রাজপুত দারোয়ানরা দেওয়াল থেকে পেড়ে আনতেন ঢোল। গম্ভীর সুরে বেজে উঠত ‘গামুর গুমুর’। সেই তুলনায় ওড়িয়া বেহারাদের নাচগান হত ঢের মিহি সুরে, যেন চড়াইপাখির কিচিরমিচির। রাজপুত পুরুষদের উৎসবে এক রাজপুতানিও যোগ দিতেন তাঁর নৃত্যকলা নিয়ে। “বেশ ভদ্র রকমের নাচ,” অবন ঠাকুরের এই মন্তব্যে মেলে সময় ও রুচি বদলের ইঙ্গিত।
বছরশেষে গাজন-চড়ক ঘিরে জমে উঠত গানের আর এক ‘বাহিরিয়ানা’। ‘হর গৌরী প্রাণনাথ মাথার উপর জগন্নাথ/ একবার উদ্ধার করো শিব শিব শিব হে’ গেয়ে চাল-পয়সা ভিক্ষে নিতে আসতেন গাজনের সন্ন্যাসীরা। অন্য দিকে, চৈত্রসংক্রান্তির সং-যাত্রার গান সাধারণ মানুষকে দিয়েছিল আর্থ-সামাজিক বিষয়ে তির্যক টিপ্পনী কাটার ছাড়পত্র। সেকালের শিক্ষিত বেকারের দুঃখে সং গেয়েছিল, “ঝকমারি ছেড়ে দিয়ে ধরেছি ডিমের ব্যবসা/ আমার থেকে নিও সবাই ‘গ্রেজুয়েটের ডিম’ খাসা।”
সেকালের কলকাতার সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে গানের ভুবনেও ছিল বহু স্তর ও স্বর। সুশীল রুচির পাশাপাশি শহরের সুরচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সরস্বতীর ‘ইতর সন্তান’দেরও। আগামীকাল বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে সঙ্গীতের বিশ্বায়ন নিয়ে ভাবনার পাশাপাশি কলকাতার এই হারানো ঐতিহ্য নিয়ে ভাবনার অবকাশ মিলবে কি? ছবিতে রবীন্দ্র সরণির বাদ্যযন্ত্রের দোকান, বছরকয় আগের ছবি।
শতবর্ষের আলো
“আমি প্রথম মা ডাক শুনি সন্তানের ছ’বছর হয়ে যাওয়ার পর,” বলেছিলেন ইলা মিত্র। শিশুপুত্রের যখন পনেরো দিন বয়স, আন্দোলনে যোগ দিয়ে গ্রেফতার হলেন; তার পরে অকথ্য অত্যাচার, দীর্ঘদিন চিকিৎসা, আদালতের রায়ের পর কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা: “ছেলে আমাকে মা বলে ডাকল।” ছেলে, মোহন মিত্রও লিখেছেন স্মৃতিধর্মী লেখা ‘আমার মা’।পরম্পরা পত্রিকার (সম্পা: গৌতম দাশ) সদ্যপ্রকাশিত সংখ্যার ক্রোড়পত্রটি আপসহীন নেত্রী, সংগঠক ইলা মিত্রকে ঘিরেই: পুনর্মুদ্রিত হয়েছে ওঁর জবানবন্দি, তাঁকে নিয়ে গোলাম কুদ্দুসের লেখা কবিতা: “খুন-ঝরা নাচোলে সেদিন/ একটি নারীর ভয়ে, হায়, জেগে ওঠে কত না পৌরুষ!” ইসকাস/ইসকাফ-এর প্রেরণাদাত্রী, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী-সেবাব্রতী, ভারত-সোভিয়েট সম্পর্কের সেতুবন্ধ ইলা মিত্রকে শতবর্ষ পেরোনো আলোয় ফিরে দেখেছে লেখাগুলি— বলেছে তাঁর লেখকজীবন, হিরোসিমার মেয়ে-সহ নানা জরুরি অনুবাদকাজের কথাও। ছবিটি, পত্রিকার প্রচ্ছদ থেকে।
মুখোমুখি
লেখকের সঙ্গে পাঠকের সেতু মুখ্যত বই-ই। তবে, তার বাইরেও থেকে যায় কিছু কথা, প্রশ্ন। বইপাড়ায় অনেক প্রকাশকই এ নিয়ে ভাবছেন, আয়োজন করছেন এমন উদ্যোগ, যেখানে লেখক-পাঠক মুখোমুখি ভাব-ভাবনা বিনিময় করবেন। কয়েক দশকব্যাপী লেখালিখি-জীবন জয়া মিত্রের, অনুষা প্রকাশনী অদ্যাবধি প্রকাশ করেছে ওঁর ছ’টি বই; সেগুলি নিয়েই তাঁর সঙ্গে কথা বলবেন ছ’জন পাঠক, বিভিন্ন পেশা ও বয়সের। ২১ জুন বিকেল ৫টা থেকে অনুষ্ঠান ‘লেখক ও তাঁর বইরা’, রাজা বসন্ত রায় রোডে কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর আর্টস লিটারেচার অ্যান্ড কালচার-এ। ওঁর শিশু-পাঠকেরাও থাকবে, নাচবে-গাইবে।
মাটির সুর
দোরগোড়ায় ২১ জুন, বিশ্ব সঙ্গীত দিবস। ‘বাংলানাটক ডট কম’ ২০১২ থেকে উদ্যাপন করে আসছে এ শহরে। এ বারের অনুষ্ঠান নেতাজি ভবনে বিকেল ৪টে থেকে। বাংলা লোকসঙ্গীতের ধারা কী ভাবে বয়ে নিয়ে চলেছে নতুন প্রজন্ম, তা-ই মূল ভাবনা, শ্রোতারা শুনতে পাবেন প্রচলিত ও তাদের লেখা লোকগান। পশ্চিমবঙ্গের ৩৫ জন শিল্পীকে নিয়ে তৈরি চারটি নতুন গানের অ্যালবামও প্রকাশিত হবে: বাউল ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া, নতুন লোকগানও। শম্পা অনিন্দিতা প্রলয় শ্রীপর্ণা রঞ্জিত পিয়ালী কুহুতান অনিন্দ্য অর্ঘ্য প্রীতম সঞ্জয়দের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন রিনা দাস বাউল বাবু ফকির গিরিশ খ্যাপা আতাহার ফকির পূর্ণ-সহ বহু শিল্পী। গান শোনাবেন প্রাণেশ দেবলীনা দীপময় দেবাশীষ মনস্বিতারাও।
নতুন করে
রচনার শতবর্ষ পেরিয়ে এসেও রক্তকরবী নাটক তুলে ধরছে বর্তমান পৃথিবীর শোষণতন্ত্রের নিষ্ঠুর চেহারাটা। এ যুগের নাট্যদর্শকদের সামনে তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরতে, এই নাটকের সংলাপের ব্যঞ্জনা, উপমা ও সঙ্কেতকে এই সময়ের নিরিখে চেনা ও বোঝার চেষ্টা করেছেন ‘হাতিবাগান সঙ্ঘারাম’ নাট্যগোষ্ঠীর সবাই— নইলে অভিনয়ের সত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে কী করে! প্রাণহীন বিত্তসর্বস্বতার বিরুদ্ধে এই রবীন্দ্রনাটকে জীবনের, ভালবাসার যে জয়গান, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সলিল চৌধুরী ও কবীর সুমনের গান: প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের বার্তা খরতর হয়েছে তাতে। এর আগে ওঁরা মঞ্চে এনেছেন রবীন্দ্রনাথের গুরু ও রথযাত্রা, আগামী ২৪ জুন সন্ধে সাড়ে ৬টায় অ্যাকাডেমি মঞ্চে নবতম অন্বেষণ রক্তকরবী, তথাগত চৌধুরীর সম্পাদনা ও নির্দেশনায়।
রাষ্ট্র প্রসঙ্গে
রাষ্ট্র বলতে যে নির্দিষ্ট সীমানা-চিহ্নিত, সার্বভৌম, জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শ সঞ্জাত প্রতিষ্ঠানটি আমাদের পরিচিত, তার সঙ্গে সুদূর অতীতের তালমিল পাওয়া দুরূহ। শব্দটি প্রাচীন সংস্কৃতে পরবর্তী বৈদিক রচনাসম্ভার থেকেই বিরাজমান, কিন্তু প্রাচীন ‘রাষ্ট্র’ কথার অর্থ এলাকা, ভূমি, জনপদ; একটি পারিভাষিক অর্থ ভূমি-রাজস্ব। রাষ্ট্র আসলে রাজনৈতিক ইতিহাস ও প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তার অঙ্গাঙ্গি যোগ সমাজ-সংগঠনের সঙ্গে; নানা স্তরে বিন্যস্ত বর্ণ-জাতিব্যবস্থা বাদ দিয়েও তার আলোচনা অসম্ভব। কলিকাতা লিটল ম্যাগাজ়িন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে, ‘সন্দীপ দত্ত স্মারক বক্তৃতা’র চতুর্থ বর্ষে এ নিয়েই বলবেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক রণবীর চক্রবর্তী: ‘রাষ্ট্রসমাজ গঠনের প্রক্রিয়া: প্রাচীন ভারতের পরিস্থিতি (আ: খ্রি: ১৩০০ পর্যন্ত)’। আগামী ২৩ জুন বিকেল ৫টায়, বেঙ্গল থিয়োসফিক্যাল সোসাইটি সভাঘরে।
ত্রয়ী
জীবন-জীবিকার দৃশ্যমান ও অদৃশ্য চাপে ভেঙে পড়ে মানুষ; তার ক্রোধ বেদনা হতাশা ফুটে ওঠে শরীর-মনের অভিব্যক্তিতে। সে সামনে তাকাতে চায়, কখনও দৃষ্টি ফেরায় অতীতে, সংঘর্ষ পেরিয়ে সহনশীলতার হাত ধরে ফের স্বপ্ন দেখে। এই ভাবনাসূত্রেই সমসাময়িক তিন নারী চিত্রশিল্পী পোর্শিয়া রায় প্রার্থনা হাজরা ও মৌসুমী রায়ের শিল্পকৃতি (ছবি) নিয়ে গত ৯ জুন থেকে ‘গ্যালারি ৮৮’-এ চলছে প্রদর্শনী ‘রেসিলিয়েন্স, রেভেরি অ্যান্ড রিটার্ন’। কলাভবনের প্রাক্তনী পোর্শিয়ার রঙিন কাঠখোদাইয়ের কাজে নিহিত মানুষের আর্তি ও আনন্দের সহাবস্থান, আর এক প্রাক্তনী প্রার্থনার ছাপচিত্রে জীবনের প্রচেষ্টা ও ভারসাম্যের মধ্যে সংযোগ-প্রয়াস। মানবমনের অবচেতনে কল্পনা ও বাস্তবের রূপ স্ফুট হয়েছে সরকারি আর্ট কলেজের প্রাক্তনী মৌসুমীর সেরামিক স্টোনওয়্যার ভাস্কর্যে। ৩০ জুন পর্যন্ত, সোমবার ২-৭টা, মঙ্গল থেকে শনিবার ১১-৭টা।
আকারের লীলা
জীবনের শেষ বারোটি বছরে অগ্ন্যুদ্গীরণের গতিতে আর তেজে প্রায় তিন হাজার ছবি এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অনেক বারই বলেছেন, যখন ছবি আঁকতে বসেন, তখন এক বাঁধনহারা মুক্তির স্বাদ অনুভব করেন তিনি। মুক্তির সেই অনুভূতি থেকে আক্ষরিক অর্থেই দর্শকের চক্ষুরিন্দ্রিয়কে আক্রমণ করে তাঁর ছবি। নিজের ছবি আঁকা তাঁর ভাষায় কলমের মুখে উঠে আসা ‘আকারের লীলা’। নাড়া বেঁধে ছবি আঁকা শেখেননি কোনও দিন। তবু তাঁর এই বিস্ময়কর রূপসাধনার পিছনে আছে দীর্ঘ এক অনুধাবন, উপলব্ধি আর চর্চার ইতিহাস। ‘রবীন্দ্রনাথ: আকারের লীলার সন্ধানে’ শীর্ষক আলোচনায় তা নিয়েই বলবেন সোমেশ্বর ভৌমিক, আগামী ২৬ জুন শুক্রবার বিকেল ৫টায়, নন্দন ৩-এ। উপলক্ষ চতুর্দশ ‘কল্যাণ মৈত্র স্মারক বক্তৃতা’, ফোরাম ফর ফিল্ম স্টাডিজ় অ্যান্ড অ্যালায়েড আর্টস-এর আয়োজনে। দেখানো হবে অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশন প্রযোজিত সনৎ মহান্তর তথ্যচিত্র, রূপের অতীত রূপ: রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা।
স্মরণলেখ
উত্তাল সত্তরে ঘর ছেড়েছিলেন। কণ্ঠ মিলেছিল বসন্তের বজ্রনির্ঘোষে। তার পর থেকে আমৃত্যু যেন মিছিলে মিছিলেই পথ হেঁটেছেন কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়। যেখানেই ক্ষমতার, আধিপত্যের দমন-পীড়নের মুখ, সেখানেই শোনা যেত তাঁর দৃঢ় প্রতিবাদী স্বর— রাজনীতি থেকে গণসংস্কৃতি, সর্বত্রই ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি। মাঝে কয়েক বছর নাগাড়ে প্রকাশ করেছেন খোঁজ পত্রিকা, যার প্রচ্ছদে লেখা থাকত ‘মেয়েদের বিষয়ে ত্রৈমাসিক’। এহেন মানুষটি চলে গেলেন গত ১৫ মে দীর্ঘ কয়েক মাসের অসুস্থতার পরে, রেখে গেলেন প্রতিরোধের উত্তরাধিকার। তাঁকে মনে রেখে গুণগ্রাহী ও আত্মজনেরা একত্রিত হচ্ছেন আগামী ২৩ জুন মঙ্গলবার বিকেল ৪টেয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিগুণা সেন প্রেক্ষাগৃহে, স্মরণ-অনুষ্ঠানটিই হয়ে উঠবে বিধুর স্মৃতিলেখ এক।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে