যোদ্ধা: অনুপ্রিয়া বসু ঘোষ।
‘‘কখনও না কখনও যে এই দিনটা আসবে, সেটা জানতাম। তাই যা যা করা দরকার, শান্ত ভাবেই করেছি। বাড়ির সবাইকেও উদ্বিগ্ন হতে বারণ করে দিয়েছিলাম।’’
করোনায় আক্রান্ত হওয়া প্রসঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন অনুপ্রিয়া বসু ঘোষ। জুনের শেষের দিকে করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট পজ়িটিভ এসেছিল তাঁর। হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়। সুস্থ হওয়ার পরে গত সপ্তাহে ফের কাজে যোগ দিয়েছেন হাওড়া জেলা হাসপাতালের স্টাফ নার্স অনুপ্রিয়া। তিনি জানান, বছরের শুরুতে যখন করোনা সংক্রমণ অন্য দেশে ছড়িয়েছিল, তখনও অনেকে বুঝতে পারেননি ভারতে কী হতে চলেছে। তবে ছবিটা পরিষ্কার হয়ে যায় লকডাউনের শুরুতেই। একটা অন্য রকম, কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি যে তাঁরা হতে চলেছেন, সেটা তখনই আন্দাজ করেছিলেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। অনুপ্রিয়া বলেন, ‘‘আগে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি ঠিকই, তবে ভয়ও পাইনি। এই পেশায় এলে দায়বদ্ধতা অনেক বেশি হয়। আমরা জানি, যেমনই অবস্থা হোক না কেন, পরিষেবা দেওয়াটা আমাদের কাজ।’’
সাধারণত হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগে ডিউটি থাকলেও করোনা মোকাবিলায় আইসোলেশন ওয়ার্ডেও কাজ করেছেন অনুপ্রিয়া। জুন মাসের ২০ তারিখে জ্বর আসে তাঁর। পরের দিনও জ্বর থাকায় করোনা পরীক্ষা করান। রিপোর্ট পজ়িটিভ এলে স্বাস্থ্য ভবনের মাধ্যমে তাঁকে বাইপাসের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। অনুপ্রিয়া জানাচ্ছেন, গন্ধ ও স্বাদের অনুভূতি চলে গেলেও অন্য উপসর্গ খুব বেশি ছিল না, তাই সপ্তাহখানেক পরেই ছেড়ে দেওয়া হয় তাঁকে। কিছু দিন বাড়িতে আইসোলেশনে থাকার পরে ফের পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ এলে ১৬ জুলাই কাজে যোগ দেন। এই পুরো সময়টায় হাওড়া জেলা হাসপাতালের সুপার ও সহকর্মীরা তাঁর পাশে থেকেছেন বলে জানাচ্ছেন অনুপ্রিয়া।
এ রাজ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর শুরুর দিকে হাওড়ায় প্রথম যে করোনা আক্রান্তের খোঁজ মিলেছিল, তিনি ছিলেন অনুপ্রিয়ার পাশের বাড়ির বাসিন্দা এবং তাঁরই স্কুলের এক সহপাঠিনীর মা। ওই প্রৌঢ়ার মৃত্যুর পরে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও বন্ধ হয়নি যখন-তখন বাইরে বেরোনো বা পাড়ার আড্ডা। বাসস্থান কন্টেনমেন্ট জ়োনে। আবার নিজে প্রথম সারির করোনা যোদ্ধা। শুরু থেকেই তাই বেশ কিছু সাবধানতা অবলম্বন করেছেন অনুপ্রিয়া। বাড়িতে বা শ্বশুরবাড়িতে সম্পূর্ণ আলাদা ঘরে একা থাকছেন। তিনি বলেন, ‘‘ছ’বছরের মেয়ে রয়েছে। শাশুড়ি অসুস্থ। খুব মন খারাপ করলেও আলাদাই থাকছি। ওদের সুস্থ রাখাটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মেয়ের অনলাইন ক্লাস চলছে। ও বাবার কাছে আপাতত পড়াশোনা করছে।’’
করোনা পরিস্থিতিতে বদলে গিয়েছে কাজের ধরন। সংক্রমণ থেকে বাঁচতে নিজেরা অতিরিক্ত সাবধান থাকাই হোক বা প্রসূতিদের তাড়াতাড়ি হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া— সবই এখন নব্য স্বাভাবিকতার অঙ্গ। তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পরে অজস্র ফোন পেয়েছেন। কেউ সুস্থ হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে বেশির ভাগেরই প্রশ্ন ছিল, আক্রান্ত হলে কী করা উচিত?
সকলের জন্য অনুপ্রিয়ার পরামর্শ, ‘‘ভয় পাবেন না। সরকারি নির্দেশিকা মেনে চলুন। উপসর্গ থাকলে দ্রুত পরীক্ষা করান। লোকে কী বলবে, তা ভেবে সময় নষ্ট করবেন না। সংক্রমণ নিয়ে বসে থাকলে নিজেরই ক্ষতি। বাড়ির লোকও সংক্রমিত হতে পারেন।’’ সাধারণ মানুষের মধ্যে এই নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে। তাই কেউ আক্রান্ত হলে চিকিৎসা পরিষেবা পেতে তাঁর কী করা উচিত, তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আরও প্রচার দরকার বলে মনে করেন তিনি। অনুপ্রিয়ার আরও পরামর্শ, ‘‘পরিস্থিতি কঠিন ঠিকই, কিন্তু মনের জোরই আসল অস্ত্র। মনের জোর থাকলেই কিন্তু অর্ধেক যুদ্ধ জেতা হয়ে যাবে।’’
(শেষ)