Firhad Hakim Resign Speculations

নবান্ন থেকে পুরসভায় গিয়েছেন ফিরহাদ, এড়িয়েছেন কালীঘাট! নেত্রী ক্ষুব্ধ বলে কি ইস্তফা-মন্তব্য কুণালের? ববি অবশ্য স্বপদেই

ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে অভিষেকের সম্পর্ক যে খারাপ, সেটা তৃণমূল বিট করা সাংবাদিকদের কাছে কোনও ‘স্কুপ’ নিউজ নয়। কিন্তু ভোট-পরবর্তী সময়ে খোদ দলনেত্রীর সঙ্গেও মেয়রের সম্পর্ক কিঞ্চিৎ ‘খারাপ’ হয়েছে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ ২২:৪৩
Share:

ফিরহাদ হাকিম। ফাইল চিত্র।

সপ্তাহের কাজের দিন। ব্যস্ত ধর্মতলা চত্বর। তবে সেই ব্যস্ততার প্রতিফলন নেই শহরের অন্যতম নার্ভ সেন্টার কলকাতা পুরসভার অলিন্দে। ছোট লালবাড়ি বলে পরিচিত, পুরসভার দোতলার অলিন্দে সুনসান কাউন্সিলরস ক্লাব। মেয়রের ঘরের দরজা বন্ধ। বন্ধ ডেপুটি মেয়রের ঘরও। অনুপস্থিত মেয়র পারিষদরাও।

Advertisement

পুরসভা জুড়ে গুঞ্জন মেয়র ফিরহাদ হাকিম পদত্যাগ করেছেন। নেপথ্যে বুধবার সন্ধ্যায় তৃণমূল বিধায়রক কুণাল ঘোষের মন্তব্য। তৃণমূল নেত্রীর বাড়িতে বৈঠকের শেষে তিনি বলেন, ‘‘পুরসভায় কাজ করা যাচ্ছে না। সম্মানজনক ভাবে নিষ্কৃতি চেয়ে পদত্যাগ করতে চেয়েছেন ফিরহাদ। প্রথমে নেত্রী বারণ করেছিলেন। পরে সম্মতি দিয়েছেন।’’ যদিও মেয়র নিজে পদত্যাগ করেছেন বলে সরকারি ভাবে কিছু জানাননি। বরং তাঁর দাবি, তিনি পদত্যাগ নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেননি।

কলকাতা পুরসভা ঘিরে এই জল্পনার মাঝেই পদত্যাগ করেছেন বিধাননগরের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তী। পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে কৃষ্ণা বলেন, ‘‘কাউন্সিলররা আসছেন না, মেয়র পরিষদের মিটিং হচ্ছে না। মানুষকে পরিষেবা দিতে পারছি না।’’ বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের পরে বিধাননগরের অন্তত চার জন কাউন্সিলর গ্রেফতার হয়েছেন। এলাকায় নেই কাউন্সিলরদের অনেকেই। সেই একই ছবি কলকাতাতেও। ইতিমধ্যেই গ্রেফতার পাঁচ কাউন্সিলর। বরো চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন দু’জন। দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন তারক সিংহ, অরূপ চক্রবর্তী। কলকাতার অনেক এলাকার মানুষেরই অভিযোগ, পালাবদলের পর থেকে দেখা মিলছে না কাউন্সিলরদের। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে পুর কমিশনারের সঙ্গে মেয়রের টানাপড়েন, যা পুরসভার অধিবেশন ডাকা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে।

Advertisement

আদালতের অন্তর্বর্তিকালীন নির্দেশকে হাতিয়ার করে বৃহস্পতিবার ফের পুর অধিবেশন ডাকার কথা ঘোষণা করেছেন পুর চেয়ারপার্সন মালা রায়। জুনের ১৯ তারিখ অধিবেশনের দিন। অন্য দিকে, মালার ঠিক আগেই সাংবাদিকদের ডাকেন পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে। সেখানে উঠে আসে মেয়রের পদত্যাগ নিয়ে প্রশ্ন। পুর কমিশনারের স্পষ্ট উত্তর, ‘‘আমার কাছে কোনও তথ্য নেই।’’ একই সঙ্গে মেয়র পারিষদ তারকের পদত্যাগ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘উনি পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু সেটা তো গৃহীত হয়নি।’’ যদিও পুরসভার অচলাবস্থা চলছে বলে মানতে রাজি হননি এই আমলা। তিনি দাবি করেন, পুরসভার মতো লোকাল বডিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের পরামর্শে আসল কাজটা করেন আধিকারিকেরা। এবং সেটা অটুট রয়েছে। মেয়রের পদত্যাগ জল্পনায় আপাতত জল ঢেলে পুর চেয়ারপার্সন মালাও বলেছেন, ‘‘এ রকম কিছু আমার জানা নেই।’’

আর সেখান থেকেই পুরসভার অন্দরেই প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ কুণাল আগ বাড়িয়ে মেয়রের পদত্যাগের কথা বললেন কেন? পরিষদীয় দলের মধ্যে যে ভোলবদল হল, পুরসভাতেও সে রকম হতে পারে বলে কি আশঙ্কা করছে কালীঘাট?

ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে অভিষেকের সম্পর্ক যে খারাপ, সেটা তৃণমূল বিট করা সাংবাদিকদের কাছে কোনও ‘স্কুপ’ নিউজ নয়। কিন্তু ভোট-পরবর্তী সময়ে খোদ দলনেত্রীর সঙ্গেও মেয়রের সম্পর্ক কিঞ্চিৎ ‘খারাপ’ হয়েছে। নেপথ্যে কলকাতায় দলের খারাপ ফলের জন্য দলনেত্রীর বেহাল পুরপরিষেবাকে দায়ী করা। বুধবার নবান্নে শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা বৈঠক থেকে কুণাল সোজা কালীঘাটে মমতার বাড়ি গেলেও ফিরহাদ আসেননি। তিনি গিয়েছিলেন পুরসভায়। তা নিয়ে তীব্র উষ্মা প্রকাশ করেছেন দলনেত্রী। আর তার পরেই কালীঘাটে ফিরহাদের না-যাওয়া এবং তাঁর পদত্যাগ নিয়ে কুণালের মন্তব্যকে দুইয়ে দুইয়ে চার করছেন অনেকেই।

১৪২ আসনের কলকাতা পুরসভায় তৃণমূলের কাউন্সিলরের সংখ্যা ১৩৭। তাঁদের মধ্যে পাঁচ জন গ্রেফতার হয়েছেন। বাকি ১৩২ জনের মধ্যে ৭২-৭৩ জনই এখন আর কালীঘাটের নিয়ন্ত্রণে নেই। যদিও বিধানসভায় ঋতব্রতকে কেন্দ্র করে ‘বিদ্রোহী’ বিধায়কেরা একজোট হলেও পুরসভায় এখনই তেমন পরিস্থিতি নেই। সেখানে বিক্ষুব্ধরা অনেক দলে বিভক্ত। কেউ অভিমানী, কেউ কেউ আবার বিজেপির দিকে ঝুঁকে। প্রায় জন্মলগ্ন থেকে তৃণমূলের সঙ্গে থাকা এক মেয়র পারিষদ পুরসভায় ‘ঋতব্রত’ হতে কাউন্সিলরদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও শুরু করেছেন।

অন্য দিকে, গত কয়েক মাস ধরে একটা জল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছিল যে, শোভন চট্টোপাধ্যায়কে পুরভোটের আগে শেষ ল্যাপে মেয়র করতে পারেন মমতা। মেয়র হিসেবে পরীক্ষিত সফল ‘কানন’কে কান্ডারি করে নভেম্বরে ভোটে যাবেন তিনি। কাউন্সিলরদের কেউ কেউ মনে করছেন, ফিরহাদ ইস্তফা দিলে সেই পথে হাঁটার চেষ্টা করতে পারেন তৃণমূলনেত্রী। রাজ্যে ক্ষমতায় ফিরলে কাজটা হয়তো সহজ ছিল। কিন্তু এখন যখন কলকাতা পুরসভার নিয়ন্ত্রণ কার্যত তৃণমূলের হাতের বাইরে, তখন সেই পরিকল্পনা কার্যকর করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। প্রথমত, এই পরিস্থিতিতে শোভন রাজি হবেন কি না। দ্বিতীয়ত, রাজি হলেও তৃণমূল কাউন্সিলরেরা তাঁকে মানবেন কি না। ২০১০ থেকে ২০১৮— টানা আট বছর কলকাতার মেয়র ছিলেন শোভন। পুরসভার ছোটবড় সব বিষয়ের উপরে শোভনের নিয়ন্ত্রণ এবং সে জমানার পুর পরিষেবা বিভিন্ন মহলে প্রশংসিতও ছিল। তাই বিধানসভা নির্বাচনে সদ্য গোটা রাজ্যে পর্যুদস্ত হয়ে পড়া মমতা কলকাতার ‘গড়’ ধরে রাখতে শোভনকে মহানাগরিক পদে ফেরানোর কথা ভাবছেন বলে অনেকের দাবি। কারণ, গত ৪ মে-র পর থেকে কলকাতা পুরসভার কাজকর্মে যে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে, শোভনের মতো মেয়র পদে থাকলে সে পরিস্থিতি আসত না বলে অনেকের মত।

শোভন নিজে সে প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘‘আমার নাম কোথাও বিবেচিত হচ্ছে বলে আমি নিজে অন্তত শুনিনি। আমার সঙ্গে এই মুহূর্ত পর্যন্ত কারও এ রকম কোনও আলোচনাও হয়নি। কিন্তু আমি ৪০ বছর কলকাতা পুরসভায় ছিলাম। কখনও কাউন্সিলর, কখনও মেয়র পারিষদ, কেখনও মেয়র। তাই আমার যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে কেউ যদি সাহায্য করতে বলেন, আমি নিশ্চয়ই করব।’’ কলকাতা পুরসভার অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থা সংক্রান্ত বিষয়ে অবশ্য শোভন কিছুটা বিস্ময়ই প্রকাশ করেছেন। প্রাক্তন মেয়রের কথায়, ‘‘কলকাতা পুরসভা একটি স্বশাসিত সংস্থা। খুব শক্তিশালী আইনের মাধ্যমে পুরসভার কাজের পরিধি নির্দিষ্ট করা রয়েছে। পুরসভার অন্দরে কার কী এক্তিয়ার, তা-ও নির্দিষ্ট করা রয়েছে। কোনও আধিকারিক চাইলেই পুরসভার অধিবেশন আটকে দেবেন, এমন হওয়ার কোনও জায়গা নেই। ওই এক্তিয়ার একমাত্র চেয়ারপার্সনের। তেমনই কোনও আধিকারিকের ইচ্ছা না-হলে মেয়র পরিষদের বৈঠক হবে না, এমনটাও হওয়ার কথা নয়। কারণ বৈঠক হবে কি না, হলে কখন হবে, কোথায় হবে, তা স্থির করার অধিকার একমাত্র মেয়রের। সেই বৈঠক কোনও আমলার ইচ্ছায় কী করে আটকে গেল, আমি জানি না।’’ বর্তমান মেয়রের নাম না-করে শোভনের সংযোজন, ‘‘অধিবেশন কক্ষের দরজা বন্ধ রেখে অধিবেশন আটকানোর চেষ্টার বিরুদ্ধে চেয়ারপার্সন মালা রায় তো আদালতে গিয়েছেন। অন্য কারও যদি মনে হয়, বেআইনি ভাবে পুরসভার বোর্ডকে অচল করার চেষ্টা হচ্ছে, তা হলে আদালতে যাওয়া উচিত।’’

এই অবস্থায় ১৯ জুন মালা রায় যে অধিবেশন ডেকেছেন, সেখানে ক’জন কাউন্সিলর হাজিরা দেন, সেটা দেখার। নাকি তার আগেই ফিরহাদ হাকিমের ইস্তফা যবনিকা টেনে দেয় পুর-নাট্যে!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement