আরজি কর হাসপাতালে লিফ্টে আটকে মৃত অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
আরজি কর হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে লিফ্টে আটক প্রহরের ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন মৃত অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী সোনালি দত্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। জানিয়েছেন, আটকে পড়া লিফ্টের ভিতর থেকে স্বামীর দেহ গড়িয়ে পড়ে তাঁর কোলের উপর। বহুতলের অন্ধকার বেসমেন্টে স্বামীর দেহ এবং ভয়ে আড়ষ্ট একরত্তি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে অসহায়ের মতো আর্তনাদ ছাড়া আর কিছু তাঁর করার ছিল না। দীর্ঘ ক্ষণ পরে সাহায্য আসে। তাঁদের উদ্ধার করা হয়। কিন্তু তত ক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। ছেলেকে চিকিৎসা করাতে নিয়ে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছেন বাবা।
আরজি করের লিফ্ট বিপর্যয়ের তদন্তভার টালা থানার হাত থেকে নিয়েছে কলকাতা পুলিশের হোমিসাইড বিভাগ। লালবাজারের গোয়েন্দারা দেখছেন, কী থেকে কী হয়েছিল? গাফিলতিই বা কার? আপাতত এই ঘটনায় অনিচ্ছাকৃত হত্যার একটি মামলা রুজু করা হয়েছে। যে সময়ে এই ঘটনা ঘটেছে, তখন আরজি করের লিফ্টের দায়িত্বে কে বা কারা ছিলেন, নির্দিষ্ট ওই লিফ্ট পরিচালনার ভার কার উপর ছিল, তা জানতে কর্মীদের ডিউটির সূচি (রস্টার) ঘেঁটে দেখছেন আরজি কর কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার তাঁরা একটি বৈঠক করেছেন। সোমবার আবার বৈঠকে বসবেন। আরজি কর থেকে গোটা ঘটনার একটি রিপোর্ট পাঠানো হবে স্বাস্থ্য ভবনে।
শনিবার সকালে সংবাদমাধ্যমকে মৃতের স্ত্রী বলেন, ‘‘ছেলের হাত ভেঙে গিয়েছিল। আমরা রাত ১০টায় আরজি করে গিয়েছিলাম। ছেলে বলল, বাথরুম যাবে। আমরা ওকে নিয়ে যাই লিফ্টের দিকে। ফোনটুকুও আমাদের সঙ্গে ছিল না।’’ লিফ্টের ভিতরের প্রহর বর্ণনা করতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন সোনালি। বলেন, ‘‘হঠাৎ লিফ্টের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। লিফ্ট উপরে উঠে গেল। তার পর নামতে নামতে একেবারে নীচে বেসমেন্টে চলে গেল। বেসমেন্টে পৌঁছোনোর পর দরজা এক বার খুলেছিল। চারদিক অন্ধকার। ভিতরে থাকব না বেরিয়ে যাব, বুঝতে পারছিলাম না। আমি আর ছেলে বেরিয়ে যাই। আমার স্বামী বেরোতে পারেননি। বাইরে দাঁড়ানোর জায়গাও ছিল না। আমরা লিফ্টের নীচের গর্তে পড়ে যাই।’’
অরূপ লিফ্টের দরজায় আটকে থাকা অবস্থাতেই তা উপরের দিকে আবার উঠতে শুরু করে বলে জানিয়েছেন সোনালি। তাঁর কথায়, ‘‘গর্ত থেকে আমি কোনও রকমে পাশের জায়গাটুকুতে ছেলেকে তুলতে পেরেছিলাম। আপ্রাণ চিৎকার করছিলাম ‘হেল্প হেল্প’ বলে। কেউ আসেনি। হঠাৎ ভিতর থেকে ওর রক্তাক্ত দেহ আমার কোলে এসে পড়ে। আমার কিছু করার ছিল না।’’ এর পরেও দীর্ঘ ক্ষণ বেসমেন্টে আটকে থাকতে হয়েছিল সোনালিদের। তাঁর তিন বছরের সন্তান আতঙ্কগ্রস্ত। লিফ্টের বাইরে একটি লোহার গ্রিলের দরজা ছিল। তাতে তালা ঝুলছিল। সেই তালার চাবিই খুঁজে পাওয়া যায়নি দীর্ঘ ক্ষণ, দাবি প্রত্যক্ষদর্শীদের।
লিফ্টকাণ্ডে ইতিমধ্যে পুলিশ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেছে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন লিফ্টম্যান মিলনকুমার দাস, বিশ্বনাথ দাস, মানসকুমার গুহ, নিরাপত্তারক্ষী আশরাফুল রহমান এবং শুভদীপ দাস। শনিবার তাঁদের শিয়ালদহ আদালতে হাজির করানো হবে। ঘটনার পরেই টালা থানায় ডেকে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল। তার পর তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। গোটা ঘটনার দায় কার? বিরোধীরা তৃণমূলকে নিশানা করছেন। আরজি করের রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য তথা এলাকার বিধায়ক অতীন ঘোষ স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতা মেনে নিয়েছেন শুক্রবারই। বিজেপির তরফে স্বাস্থ্য ভবন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দিকে আঙুল তোলা হয়েছে। দাবি, অবিলম্বে তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হওয়া উচিত।