এন্টালিতে গুলি চালানোর ঘটনায় লালবাজারের গোয়েন্দারা উত্তরপ্রদেশ থেকে যাকে গ্রেফতার করেছেন, সে বাংলাদেশের এক ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ দুষ্কৃতী। রবিবার সকালে বরাবাঁকির একটি অতিথি নিবাস থেকে মিন্টু শেখ ঠাউরে তাকে ধরা হলেও গোয়েন্দারা জেনেছেন, তার আসল নাম মহম্মদ আরিফুল ইসলাম। ঢাকার মিরপুরের পল্লবী থানা এলাকার বাসিন্দা ওই ব্যক্তি খুন, ডাকাতি-সহ বিভিন্ন অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত। তাই সে দেশের পুলিশের খাতায়ও তার নাম আছে। তবে সে সব চেয়ে কুখ্যাত শার্প শ্যুটার হিসেবে।
গোয়েন্দাদের একটি সূত্রের খবর, তিন বছর আগে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আরিফুল বেআইনি ভাবে পশ্চিমবঙ্গে ঢোকে। কলকাতায় কিছু দিন থাকার পরে বারুইপুরের কাছে মল্লিকপুরে সে ঘর ভাড়া করে ছিল। এন্টালির মতিঝিল তল্লাটের এক তরুণীকে বিয়েও করে সে। তবে তদন্তকারীরা তাজ্জব এটা জেনে যে, আরিফুল ওরফে মিন্টু ভারতীয় নাগরিকের পরিচয়পত্র হিসেবে আধার কার্ডও পেয়ে গিয়েছিল! মিন্টু নিজে পুলিশকে জানিয়েছে, কলকাতার একটি নারী পাচার চক্রের সঙ্গেও সে জড়িত। তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে লালবাজার।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সাতসকালে এন্টালির কনভেন্ট রোডে একটি স্কুলের সামনে গুলি চলে। এক যুবক জখম হন। আরিফুলের আগে পুলিশ ওই ঘটনায় তিন জনকে গ্রেফতার করে। তবে তারা জড়িত হলেও ওই দিন আরিফুলই গুলি চালিয়েছিল বলে গোয়েন্দারা জেনেছেন।
পশ্চিমবঙ্গে চুরি-ডাকাতি কিংবা জাল নোটের পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশি নাগরিকদের গ্রেফতার হওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু বাংলাদেশের মোস্ট ওয়ান্টেড বা কুখ্যাত দুষ্কৃতী এ দেশে আশ্রয় নিয়ে খাস কলকাতায় গুলি চালাচ্ছে, এমন ঘটনা বিরল বলে গোয়েন্দাদের একাংশের অভিমত।
অতীতে বাংলাদেশি মোস্ট ওয়ান্টেড দুষ্কৃতীর মধ্যে তনবিরুল ইসলাম জয়, সুব্রত বায়েনরা কলকাতা কিংবা শহরের আশপাশ থেকে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। কিন্তু তারা এখানে বসে অন্য দেশের ধনী বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছে তোলা চেয়ে হুমকি ফোন করা ছাড়া অন্য কোনও অপরাধে সাধারণত জড়ায়নি।
গোয়েন্দাদের দাবি, উত্তরপ্রদেশে ধরা পড়ার পর মিন্টু জানিয়েছে, বাংলাদেশের একটি খুনের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে সে ছ’বছর জেল খেটেছে। তার আরও দাবি, আদালত আট বছরের সাজা দিলেও কারাগারে আচরণ ভাল হওয়ায় দু’বছর আগে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে সে দেশে আরও কয়েকটি মামলায় আরিফুল অভিযুক্ত।
কিন্তু এন্টালিতে সে কেন গুলি চালাল?
তদন্তকারীদের বক্তব্য, এর কারণ পুরনো বন্ধুত্ব। মিন্টুর আগে এন্টালির ঘটনায় পুলিশ বাবলু ওরফে মহম্মদ মুস্তাকিন, ইলু ওরফে ইলিয়াস ও আয়ুবকে গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে মতিঝিলের বাসিন্দা ইলিয়াসের সঙ্গে প্রথমে ঢাকা ও তার পর দুবাইয়ে দেখা হয় মিন্টুর। দু’জনেই তখন গাড়ি চালকের চাকরি করত। সেই সূত্রে পশ্চিমবঙ্গে ঢোকার পরে সে এন্টালিতেই প্রথমে বাস শুরু করে। ইলিয়াসই তাদের বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর চাঁই বাপিকে গুলি করার জন্য মিন্টুকে নিয়োগ করেছিল।
সমাজবিরোধীদের ওই দু’টি গোষ্ঠী বিভিন্ন কারখানা ও গুদামের জিনিস চুরিতে জড়িত। সম্প্রতি কনভেন্ট রোডের একটি চটকলের চোরাই জিনিসপত্র নিয়ে বিরোধ তৈরি হওয়ায় বাপিকে উচিত শিক্ষা দিতে চায় ইলিয়াসরা। তাদের গোষ্ঠীর চাঁই আবার ইলিয়াসের মাধ্যমে যোগাযোগ করে মিন্টুর সঙ্গে। কারণ, মিন্টু এক জন শার্প শ্যুটার।
গত ১৫ তারিখ সকালে বাপির মোটরবাইক লক্ষ করে মিন্টু গুলি চালালেও জখম হয় বাপির ভাই বাচ্চা কাল্লু। বাপি সেখানে ছিল না। তদন্তে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, এক লম্বা যুবক মোটরবাইকের পিছনে বসে গুলি চালিয়েছে। অথচ গুলিতে জখম যুবক অভিযুক্ত হিসেবে যাদের নাম বলছে, তাদের কারও সঙ্গে ওই চেহারার মিল নেই। এক তদন্তকারী অফিসার বলেন, ‘‘আমরা জানতে পারি, এক বাংলাদেশি ঘটনার দিন মুস্তাকিনদের সঙ্গে ছিল। মোবাইল ফোনের কল ডিটেলস রেকর্ড খতিয়ে দেখার পর খোঁজ মেলে মিন্টুর।’’ কিন্তু সে তখন কলকাতা ছেড়ে পালিয়েছে।
লালবাজার সূত্রের খবর, ঘটনার দু’দিন পরে ১৭ তারিখ হাওড়া থেকে ট্রেনে করে উত্তরপ্রদেশের বরাবাঁকির দেবা শরিফের একটি গেস্ট হাউসে ওঠে সে। রবিবার দুপুরে সেখানে হানা দেন কলকাতা পুলিশের গুন্ডা দমন শাখার ওসি জয়ন্ত চক্রবর্তীর নেতৃত্বে ছ’জন গোয়েন্দা। সোমবার বরাবাঁকির স্থানীয় আদালতে তাকে হাজির করানো হলে বিচারক মিন্টুকে ট্রানিজিট রিমান্ডে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।