মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর ফের আইপ্যাক মামলার শুনানি হবে সুপ্রিম কোর্টে। আপাতত বেঞ্চ উঠে গেল।
বিচারপতি মিশ্র বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনও দফতরে ঢুকে পড়েছেন। যদি ২২৬ অনুচ্ছেদের অধীনেও পিটিশন গ্রহণযোগ্য না-হয়, আর ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনেও না-হয়, তবে এই বিষয়টি বিচার করবে কে? ভবিষ্যতে যদি অন্য কোনও মুখ্যমন্ত্রীও এ ভাবে অন্য কোনও দফতরে প্রবেশ করেন, তখন তার বিচার কী ভাবে হবে?”
বিচারপতি মিশ্র বলেন, “মামলা করার অধিকার কার রয়েছে এই নিয়ে সওয়াল করা হচ্ছে? মুখ্যমন্ত্রী যদি তদন্তে ঢুকে পড়েন, তা হলে ইডি কী করবে? এর পরে তো অন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও (তদন্তে) ঢুকে পড়লে কিছু করা যাবে না। এটা মোটেও সুখকর পরিস্থিতি নয়। একেবারেই অনভিপ্রেত ঘটনা।”
শ্যাম বলেন, “সিবিআইয়েরও নিজে থেকে মামলা করার কোনও অধিকার নেই।” বিচারপতি মিশ্র বলেন, “তবুও তারা মামলা করে। আমরাও তা গ্রহণ করি। শুনানি হয়।” শ্যাম এ-ও বলেন যে, “যদি কোনও সরকারি দফতরকে সরাসরি মামলা দায়ের করার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে সংবিধানের ১৩১ অনুচ্ছেদের যে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য রয়েছে, সেগুলি সম্পূর্ণ ভাবে এড়িয়ে যাওয়া হবে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে যে, কোনও একটি দফতর নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ বা ২২৬ অনুচ্ছেদের অধীনে মামলা দায়ের করবে। তখন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
রাজ্যের আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান বলেন, “সংবিধান প্রণেতারা কখনই ভাবেননি যে, একই সরকার বা রাষ্ট্রের দু’টি বিভাগ নিজেদের মধ্যে আদালতে লড়াই করবে। একই রাষ্ট্র বা কেন্দ্রীয় সরকারের দু’টি বিভাগের মধ্যে আদালতে মামলা করা না উপযুক্ত, না অনুমোদিত। বরং এতে জনস্বার্থের ক্ষতি হয়, কারণ এতে অযথা সরকারি অর্থ ও সময় নষ্ট হয়। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ আসলে একই সরকারের অঙ্গ। তাই তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকা উচিত, বিরোধ নয়।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, “সরকারকে মামলা করতে হলে বা সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে তা ‘ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’-র নামে করতে হবে। ইডির নামে নয়।
শ্যাম দিওয়ান বলেন, “ইডি কেন্দ্রীয় সরকারের একটি অংশ। এখানে মামলা করেছেন ইডির ডিরেক্টরেট। ফলে আইনের মধ্যে থেকেই কোনও ডিরেক্টরেটকে মামলা করতে হবে।” তিনি এ-ও বলেন যে, “৩২ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করতে গেলে মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন থাকতে হবে। এবং তা শুধুমাত্র ব্যক্তির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু ব্যক্তির বাইরে মামলা করার কোনও অধিকারই নেই।” একই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, “অর্থ তছরুপ প্রতিরোধ আইন (পিএমএলএ)-তেও কিছু দায়িত্ব এবং ক্ষমতা দেওয়া হলেও, মামলা করার অধিকার দেওয়া হয়নি।”
রাজ্যের আইনজীবী শ্যাম বলেন, “সংবিধানের ১৪৩ অনুচ্ছেদের অধীনে কোনও রেফারেন্স শুনানির জন্য ন্যূনতম পাঁচ জন বিচারপতি থাকতে হবে। এখানে ইডি আইনগত প্রশ্ন তুলেছে।” তাঁর সংযোজন, “এখানে ইডি মানে কেন্দ্রীয় সরকার মামলা করেছে। ফলে আদালতকে দেখতে হবে, কেন্দ্রীয় সরকার আদৌ অভিযোগ করতে পারে কি না যে, কোনও রাজ্য সরকার তার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করছে।” শীর্ষ আদালতে শ্যাম সওয়াল করে বলেন, “যদি এই মামলার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে এক সরকারি বিভাগ আর এক বিভাগের বিরুদ্ধে মামলা করবে। অথবা, দুই রাজ্যের মধ্যে, কিংবা কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরোধ তৈরি হবে। তাই এই বিষয়টি যথাযথ ভাবে পাঁচ জন বিচারপতির বেঞ্চেই পাঠানো উচিত।”
মামলার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাজ্যের আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান বলেন, “ইডি কোনও কর্পোরেট সংস্থা নয়। তাদের মামলা করার অধিকার নেই। মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন থাকতে হবে। ইডির তো কোনও মৌলিক অধিকারই নেই, তাই তার লঙ্ঘনও হতে পারে না।”
কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল সময় চাওয়ার আর্জির বিরোধিতা করে বলেন, “দুই সপ্তাহ আগেই অতিরিক্ত হলফনামা দাখিল করা হয়েছে। অন্তত মামলাটা পিছোনোর জন্য একটা যুক্তিযুক্ত কারণ থাকা উচিত। এটা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক যে, একজন মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তে হস্তক্ষেপ করছেন। আর এখন আবার মামলার শুনানিতে দেরি করা হচ্ছে?” দুই পক্ষের উদ্দেশেই বিচারপতি বলেন, “শুনানি পিছিয়ে দেওয়ার লড়াই চলছে না। আপনারা সওয়াল শুরু করুন।”
সুপ্রিম কোর্টের তরফে বলা হয়, “শুনানি শুরু করা হোক। আপনারা (রাজ্য) ইডির পাল্টা হলফনামা জমা দিতে চাইছেন। আবার মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন? আপনাদের মূল অবস্থান কী?” শীর্ষ আদালত জানায়, রেকর্ডে যা আছে, তাই নিয়েই শুনানি চলবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হবে।”
রাজ্যের তরফে ইডির মামলার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়। আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী বলেন, “আমরা মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শুনানি চাই।”
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র বলেন, “চার সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। আপনারা এত দিনেও কেন পাল্টা জবাব দিলেন না?”
মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী জবাব দেওয়ার জন্য সময় চাইতেই এর বিরোধিতা করেন কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা।