(বাঁ দিকে) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গিয়েছিলেন রবিবার। তারও এক দিন আগে, গত শনিবার দিল্লি চলে যান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিন দিনের দিল্লি সফর শেষে বুধবার বিকেলে কলকাতায় ফিরেছেন তৃণমূল নেত্রী। তবে অভিষেক এখনও রয়ে গেলেন দিল্লিতে। এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত, তাঁর কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কোনও তথ্য মেলেনি।
রাজ্য বিধানসভায় বিধায়কদের সই জাল-কাণ্ডের তদন্ত চালাচ্ছে সিআইডি। ওই তদন্তের সূত্র ধরে অভিষেককে একাধিক বার তলব করেছে রাজ্যের তদন্তকারী সংস্থা। তবে এখনও হাজিরা দেননি তিনি। দিল্লিতে আছেন জানিয়ে আরও সময় চেয়েছেন সিআইডির কাছে। ইতিমধ্যে ওই মামলায় রক্ষাকবচ চেয়ে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন অভিষেক। বৃহস্পতিবার বিচারপতি কৌশিক চন্দের এজলাসে ওই মামলার শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে।
তৃণমূলে ভাঙনপর্বের মাঝেই দিল্লিতে যান মমতা-অভিষেক। গত সোমবার বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে যোগ দেন দু’জনেই। পরের দিন, মঙ্গলবার কংগ্রেসের প্রাক্তন সভানেত্রী সনিয়া গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে তাঁর ১০, জনপথের বাংলোয় যান মমতা। ঘটনাচক্রে, ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকের দিনই লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলের ভাঙন প্রকাশ্যে আসে। পরিষদীয় দলে ভাঙন বেআব্রু হয় তাঁর দিল্লিযাত্রার আগেই। আবার পরের দিন, সনিয়ার সঙ্গে মমতার বৈঠকের সময় সই-কাণ্ডে তৃণমূলনেত্রীর কালীঘাটের বাড়ি লাগোয়া দলীয় কার্যালয়ে তল্লাশি চালায় সিআইডি।
মমতা-সনিয়া বৈঠকের পর বুধবার দিল্লির ১০, জনপথে ফের একপ্রস্ত বৈঠক হয়। এ বার রাহুল গান্ধীর সঙ্গে অভিষেকের। তৃণমূল সূত্রে খবর, প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক হয়েছে দুই নেতার। এই দীর্ঘ বৈঠকে কী নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যে বিস্তর কাঁটাছেঁড়া শুরু হয়েছে। সংবাদ সংস্থা পিটিআই একটি সূত্র উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-কে শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে দুই নেতার মধ্যে। কী ভাবে, মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে বিজেপি বিরোধিতার প্রশ্নে দলগুলি এককাট্টা হতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা হয়। তবে তৃণমূল সূত্রে খবর, বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথাবার্তা বলেছেন রাহুল এবং অভিষেক।
নির্বাচনী ভরাডুবির পর থেকে তৃণমূলের অন্দরে ডামাডোল ক্রমে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। পরিষদীয় দল এবং লোকসভায় সংসদীয় দল মমতার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে। লোকসভায় তৃণমূলের ‘বিদ্রোহীরা’ এখন চাইছেন বিজেপির নেতৃত্বাধীন শাসকজোট এনডিএ-কে সমর্থন করতে। এই অবস্থায় রাহুল-অভিষেকের দেড় ঘণ্টার বৈঠক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান ডামাডোলের মাঝে কংগ্রেসকে আঁকড়ে ধরে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছেন মমতা এবং অভিষেক। সেই কারণেই মমতা-সনিয়া বৈঠকের পরের দিনই রাহুলের সঙ্গে অভিষেক বৈঠক সারতে গেলেন বলে মনে করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার দিল্লিতে অভিষেকের কোনও কর্মসূচির কথা জানা যায়নি। তিন দিনের সফরে ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠক এবং সনিয়া-সাক্ষাৎ সেরে বুধবার বিকেলে কলকাতায় ফিরেছেন মমতা। তবে তৃণমূলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা অভিষেক এখনও রয়ে গিয়েছেন দিল্লিতে। ঘটনাচক্রে, মমতা বিকেলে কালীঘাটের বাড়িতে ফেরার কিছু সময় আগে ৩০বি, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের ঠিকানায় অভিষেকের নামে সমন আসে ত্রিপুরা থেকে। ২০২১ সালের ভোট পরবর্তী সময়ে ত্রিপুরার খোয়াই থানায় একটি অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। ওই মামলাতে ডাকা হয়েছে অভিষেককে। আগামী ২২ জুন তাঁকে ত্রিপুরার খোয়াই আদালতে সশরীরে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এক দিকে যখন সই-কাণ্ডে অভিষেককে বার বার তলব করছে সিআইডি, তখন পুরনো বিভিন্ন অভিযোগও ঘিরতে শুরু করেছে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদককে। ডায়মন্ড হারবারেরও বুধবার অভিযোগ জমা পড়েছে অভিষেকের বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে অভিষেকের বিরুদ্ধে ডায়মন্ড হারবারে প্রার্থী হয়েছিলেন বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাস (ববি)। ২০১৮ সালে তাঁর উপর প্রাণঘাতী হামলা হয়েছিল বলে অভিযোগ। ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে অভিষেকের বিরুদ্ধে ডায়মন্ড হারবার থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি।
উল্লেখ্য, সই জালের অভিযোগের তদন্তে অভিষেককে এখনও পর্যন্ত তিন বার তলব করেছে রাজ্যের তদন্তকারী সংস্থা। গত ৩০ মে প্রথম অভিষেকের কালীঘাটের বাড়িতে যায় সিআইডি। ১ জুন তৃণমূল সাংসদকে হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অভিষেক হাজিরা না-দিয়ে সিআইডির থেকে ১৪ দিনের সময় চান। তবে সিআইডি অভিষেককে তত দিন সময় দেয়নি। ১ জুন আবার কালীঘাটের বাড়ি গিয়ে সাত দিনের মধ্যে হাজিরার নির্দেশ সংবলিত নোটিস দিয়ে আসে সিআইডি। গত সোমবার সেই সময়সীমা শেষ হয়। কিন্তু ওই দিনও হাজিরা দেননি অভিষেক। তার আগেই, গত শনিবার দিল্লিতে চলে যান তিনি। সোমবার যোগ দেন ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকে। সোমবারও কালীঘাটের ঠিকানায় গিয়ে তৃতীয় নোটিস ধরিয়ে আসে সিআইডি। মঙ্গলবারই হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার হাজিরার জন্য তাঁকে সময় দেওয়া হয় বিকেল ৫টা পর্যন্ত। তবে তার আগেই রাজ্যের তদন্তকারী সংস্থাকে চিঠি পাঠিয়ে আবার সময় চান অভিষেক। চিঠিতে জানান, তিনি দিল্লিতে রয়েছেন। ততক্ষণে সই-কাণ্ড এবং সিআইডির নোটিস সংক্রান্ত বিষয়ে রক্ষাকবচ চেয়ে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি। সে কথাও উল্লেখ করেন সিআইডি-কে পাঠানো চিঠিতে। তদন্তকারী সংস্থার কাছে আরও সময় চান তিনি। এরই মধ্যে বুধবার সই-কাণ্ডে রক্ষাকবচের মামলায় ফের অভিষেকের হয়ে হাই কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আইনজীবী তথা তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই মামলায় দ্রুত শুনানির আর্জি জানান তিনি। তাতে বিচারপতি কৌশিক চন্দ মৌখিক ভাবে জানান, বৃহস্পতিবার আদালত মামলাটি শুনতে পারে।