উৎসবে মান রাখছে প্লাস্টিকের ফুল

৪০-৫০ টাকা কেজির গাঁদা ফুলের দাম দাঁড়িয়েছে ১০০ টাকা। প্রতি পিস গোলাপও ২ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে কমপক্ষে ৫ টাকা। ফুলের জোগান কম থাকাতেই দাম এত চড়া।

Advertisement

সুমন ঘোষ

শেষ আপডেট: ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫ ০০:১৮
Share:

নকল ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে বিয়ে বাড়ি। নিজস্ব চিত্র।

৪০-৫০ টাকা কেজির গাঁদা ফুলের দাম দাঁড়িয়েছে ১০০ টাকা। প্রতি পিস গোলাপও ২ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে কমপক্ষে ৫ টাকা। ফুলের জোগান কম থাকাতেই দাম এত চড়া। পরিণাম, উৎসবের মরসুমে মাথায় হাত ব্যবসায়ীদের। অবস্থা এমনই যে ডেকরেটররা সাজানোর জন্য প্লাস্টিকের ফুল ব্যবহার করছেন।

Advertisement

পৌষ মাস পড়ে যাওয়ায় বিয়েবাড়ির হিড়িক একটু কমেছে। তবে বড়দিন, ইংরাজি নববর্ষের আগে ভরপুর উৎসবের মরসুম এটা। মেলা হোক জলসা, মঞ্চ সাজাতে ফুল তো লাগবেই। আর সেই ফুলেই বেজায় টান। ভরা শীতেও রোদের দেখা না থাকায় ফুল ফুটছে না। মেদিনীপুরের ডেকরেটর ব্যবসায়ী সুখেন্দু চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘ভাল মাপের ফুল তো পাওয়াই যাচ্ছে না। ফলে, দাম বেশি প়ড়ছে। আগে যে অংশটুকু সাজাতে ৮০টা গোলাপ হলেই চলত, এখন সেখানে একশোটা লাগছে।” শুধু গাঁদা, গোলাপ নয়, রজনীগন্ধা, গ্ল্যাডিওলাসের দামও চড়া। যে রজনীগন্ধা আগে কেজি প্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকায় মিলত এখন দু’শো টাকার কমে পাওয়া যাচ্ছে না। ১২ টাকা ডজন গ্ল্যাডিওলাসও বেড়ে ২৫-৩০ টাকা ডজন হয়ে গিয়েছে।

এই অবস্থায় সব থেকে ভুগেছেন বিয়েবাড়ির কর্তারা। অগ্রহায়ণ মাস জুড়ে প্রচুর বিয়ের তারিখ ছিল। আগে যেখানে গোটা বিয়েবাড়ির ফুলের সাজ ২০ হাজার টাকা খরচ করলেই হয়ে যেত, এখন তার জন্য কম করে ৩৫ হাজার টাকা লাগছে। তাই বাজেটের মধ্যে থাকতে অনেক গৃহস্থই বিয়েবাড়ির সাজে প্লাস্টিকের ফুলের ব্যবহারে সম্মতি দিচ্ছেন। ডেকরেটর সুখেন্দুবাবুর কথায়, ‘খরচ কমাতে প্লাস্টিকের ফুল ব্যবহার করছি।’’ বড়দিন-বর্ষবিদায়ের এই সময়টায় হোটেলগুলোতেও অনুষ্ঠানের অন্ত নেই। হোটেলের মালিকদের উপরেই অনেক সময় সাজানোর দায়িত্ব দেন আয়োজকরা। ফুলের সঙ্কটে হোটেল মালিকরাও তাই সমস্যায়। মেদিনীপুর শহরের এক হোটেল মালিক পরিমল রায় বলেন, ‘‘সাজানোর দায়িত্ব নিতেই ভয় পাচ্ছি। ফুলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে।’’

Advertisement

ফুল না ফোটার একটা কারণ যদি হয় প্রতিকূল আবহাওয়া, তবে অন্য কারণ অবশ্য ফুলের মতো বিকল্প চাষে চাষিদের অনাগ্রহ। পাশের জেলা পূর্ব মেদিনীপুরে ফুলচাষের বাড়বাড়ন্ত থাকলেও পশ্চিমে ছবিটা অন্য। বারবার ধান, আলুতে মার খেয়েও বিকল্প চাষের অভ্যাস হয়নি চাষিদের। অথচ ফুলচাষ রীতিমতো লাভজনক, চাষের খরচের ৪০ শতাংশ আবার সরকার দেয়।

চাষিরা কিন্তু দুষছেন সরকারকেই। তাঁদের বক্তব্য, সরকারকেই উদ্যোগী হয়ে উৎসাহী চাষিদের নিয়ে সেমিনার করা, সরকারি সুযোগ সুবিধের কথা জানানো। ফুল চাষে লাভের কথা জেনেই বছর তিনেক আগে রজনীগন্ধার চাষ শুরু করেছিলেন পিংলা ব্লকের গোগ্রামের সুব্রত মহেশ। তাঁর কথায়, ‘‘বিঘা প্রতি চাষ করতে প্রায় ৬০ হাজার টাকা লাগে ঠিকই, কিন্তু দু’বছরে লাভ মেলে প্রায় এক লক্ষ টাকা!’’ রজনীগন্ধা একবার চাষ করলে দু’-তিন বছর ফলন মেলে। প্রথম বছরেই চাষের খরচ বেশি। পরের বছরগুলিতে পরিচর্যা, সেচ, সার প্রভৃতি সামান্য খরচ করেই মেলে লাভ। লাভ রয়েছে গোলাপ চাষেও। এখানেও বিঘা প্রতি চাষের খরচ প্রায় ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু টানা ৭-৮ বছর ফলন মেলে। বিঘা প্রতি বছরে ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা লাভ হবেই। এমনটাই দাবি উদ্যান পালন দফতরের। তা স্বীকারও করছেন ফুলচাষিরা।

Advertisement

অথচ, ফুলের চাহিদা রয়েছে সারা বছরই। বিয়ের অনুষ্ঠান বা তার বাইরেও রয়েছে বাঙালির বারো মাসে তের পার্বণ। সেখানেও ফুলের মালা ও ফুল প্রয়োজন হয়। ২০১২-১৩ আর্থিক বছরে যেখানে ২৯৬৭ হেক্টর ফুল চাষ হয়েছিল, ৪০৩ হেক্টর বেড়ে পরের বছর হয় ৩৩৭০ হেক্টর। আর চলতি বছরে আরও মাত্র ৫১৫ হেক্টর বেড়ে হয়েছে ৩৮৮৫ হেক্টর।

ফুলচাষের পরিমাণ না বাড়ানোর জন্য অবশ্য চাষিদের মানসিকতাকে দায়ী করছে প্রশাসন। জেলা উদ্যান পালন আধিকারিক কুশধ্বজ বাগের কথায়, ‘‘মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু সহজে নিজেদের পুরনো অভ্যেস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছেন না।’’ পূর্ব মেদিনীপুর লাগোয়া পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরা, খড়্গপুর-১, ২, পিংলা, দাসপুর-১, ২ সহ কয়েকটি ব্লকে ফুলের চাষ হচ্ছে।

চন্দ্রকোনার চাষি রবীন্দ্রনাথ পাত্র বলেন, ‘‘ফুল চাষে সরকার খরচের ৪০ শতাংশ টাকা দেয়, তাই তো জানা নেই। এ বার ভেবে দেখব।’’ উদ্যানপালন দফতরের সাফাই, তাঁদের পরিকাঠামো অতি দুর্বল। তাই কাজ করা যায় না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement