এ ভাবেই চলছে বিদ্যুৎ চুরি।
এগরা-পটাশপুর সড়কে মংলামাড়ো এলাকায় রাস্তার প্রায় গা ঘেঁষে শাসক দলের পার্টি অফিস। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, সেখানে আলো-পাখা থেকে সবই চলে হুকিং করে। বিষয়টি অনেকে জানলেও কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস করেন না।
বিদ্যুৎ দফতরের কর্মীদের দাবি, হুকিং হচ্ছে জেনেও তাঁরা নিরুপায় কারণ বিভিন্ন মহলের চাপ রয়েছে। শুধু শাসক দল নয়, হুকিং করে বিদ্যুৎ চুরির ভুরি ভুরি অভিযোগ রয়েছে এগরা মহকুমার পটাশপুর, ভগবানপুর থেকে খেজুরি, নন্দীগ্রাম, পাঁশকুড়া-সহ জেলার প্রায় অধিকাংশ এলাকায়।
শুধু হুকিং করে বিদ্যুৎ চুরিই নয়, বিদ্যুতের বিলেও চুরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যুৎ দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন বৈদ্যুতিন সামগ্রী চালাতে কমপক্ষে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হওয়া উচিত তার চেয়ে খুবই কম বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে বলে দেখা গিয়েছে। বাড়িতে একাধিক আলো, টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার, পাখা, ওয়াশিং মেশিন রয়েছে। অথচ মাসের শেষে বাড়িতে লাগানো বিদ্যুতের মিটার যন্ত্রে বিদ্যুৎ খরচের পরিমাণ কোথাও শূন্য বা ৯ ইউনিট। জেলার পটাশপুর এলাকায় এমন বিদ্যুৎ খরচের গ্রাহক সংখ্যা এক আধজন নয়, প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার।
বিদ্যুৎ দফতর ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পটাশপুর-১ ব্লকের ব্রজলালপুর পঞ্চায়েত এবং পটাশপুর-২ ব্লকের শ্রীরামপুর পঞ্চায়েত এলাকায় বিদ্যুৎ চুরির বহর সবচেয়ে বেশি। ব্রজলালপুরের গাবডাঙা ছাড়াও মংলামাড়ো, গোকুলপুর, কৃষ্ণপুরে বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে বেশি। বাড়ির সামনে বিদ্যুৎ লাইন থেকে হুকিং বা মিটার বক্সের কারচুপির মাধ্যমে বিদ্যুৎ চুরি করে আলো, পাখা থেকে সেচের পাম্প চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ। অভিযোগ যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ পাওয়া গেল মংলামাড়োয়। রাস্তার ধারে বিদ্যুতের খুঁটি থেকে হুকিং করে তার টানা হয়েছে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে। এলাকার অন্যত্র একই ভাবে বিদ্যুতের খুঁটি থেকে বাঁশের সাহায্যে তার টেনে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন বাড়িতে।
দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, পটাশপুর এলাকায় বেআইনি প্রায় ১৬০০ ট্রান্সফরমার রয়েছে। যার বড় অংশ বিদ্যুৎ চুরির কাজে লাগানো হচ্ছে। সমস্যার কথা মেনে পটাশপুর-২ পঞ্চায়েত সমিতির বিদ্যুৎ কর্মাধ্যক্ষ বিজনবন্ধু বাগ বলেন, ‘‘হুকিং রোধ করতে বিদ্যুৎ দফতরের আধিকারিকদের সঙ্গে আমরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বাসিন্দাদের বোঝাচ্ছি।’’
খেজুরি ১ এবং ২ ব্লকের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গিয়েছে রমরম করে চলছে হুকিং। মাছের ভেড়ি থেকে জমিতে সেচের পাম্প চালাতে হুকিং করে টানা হয়েছে বিদ্যুতের তার। খেজুরি ২ ব্লকের নিজকসবা গ্রাম পঞ্চায়েতের দক্ষিণ আলিচক, কয়ালচক, সুন্দরপুর, লক্ষ্মণচক, থানাবেড়িয়া এবং জনকা গ্রাম পঞ্চায়েতের পূর্ব ভাঙনমারী, পশ্চিম ভাঙনমারী, অরকবাড়ি প্রভৃতি গ্রামে দেখা গেল অনায়াসে চলছে বিদ্যুৎ চুরি।
শুধু বিদ্যুৎ চুরি নয়, হুকিংয়ের জেরে বিপদ নেমে এসেছে বেশ কিছু পরিবারেও। কোথাও বিদ্যুৎ চুরি করতে গিয়ে, কোথাও অন্য কারও হুকিংয়ের জেরে পড়ে থাকা তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। পটাশপুর-সহ এগরা মহকুমার বিভিন্ন এলাকায় গত মে মাস থেকে জুলাই পর্যন্ত দুই শিশু-সহ পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। নন্দীগ্রামের ঠাকুরচকে গত ৪ অগস্ট এক সিভিক ভলান্টিয়ারের হুকিং করে বিদ্যুৎ চুরির জেরে সেই তারে জড়িয়ে বিদ্যুস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় সবিতা দাস নামে এক মহিলা ও একটি গরুর। তিনি গরু চরাতে গিয়েছিলেন। ৫ অগস্ট খেজুরি-১ ব্লকের বীরবন্দর এলাকায় হুকিং করে সেচের পাম্প চালাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয় তীর্থবাস কলা নামে এক বৃদ্ধের।
খেজুরি বিদ্যুৎ দফতরের স্টেশন ম্যানেজার প্রশান্ত বিশওয়াল বলেন, ‘‘এলাকায় বিদ্যুৎ চুরি রুখতে প্রায়ই অভিযান চালানো হয়। বিদ্যুৎ চুরির জেরে যে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে সে বিষয়েও সচেতন করা হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যুৎ চুরি আটকানো যাচ্ছে না।’’