খড়্গপুর কলেজের অধ্যক্ষের ইস্তফা শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করে নিল পরিচালন সমিতি। যদিও অধ্যক্ষ নির্মলকুমার জানাকে আরও কিছু দিন কাজ সামলে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
সোমবার বৈঠকের পরে কলেজ পরিচালন সমিতির সভাপতি নির্মল ঘোষ বলেন, ‘‘অধ্যক্ষ ইস্তফা দিতে চেয়ে যে চিঠি দিয়েছিলেন বৈঠকে তা গৃহীত হয়েছে। তবে অধ্যক্ষকে আরও কিছুদিন কলেজে থাকতে অনুরোধ করা হয়েছে। উনি বিষয়টি ভেবে দেখবেন বলে জানিয়েছেন। তবে অসুস্থতার জন্য এখন কয়েকদিন ছুটি নেবেন। আপাতত অন্য কোনও শিক্ষক তাঁর দায়িত্ব সামলাবেন।’’ অধ্যক্ষেরও বক্তব্য, ‘‘৮ অক্টোবর পর্যন্ত আমাকে কলেজের দায়িত্ব সামলানোর কথা বলা হয়েছে। তবে আপাতত অসুস্থতার কারণে আমি কলেজে আসব না।’’ আগামী ৯ অক্টোবর পূর্ব মেদিনীপুরের এগরা কলেজের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেবেন বলেও জানান নির্মলবাবু। এ বিষয়ে পরিচলন সমিতির সভাপতির বক্তব্য, অধ্যক্ষকে কয়েকদিন দায়িত্ব সামলাতে বলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও দিনের কথা তাঁকে বলা হয়নি। পরে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গত ২ জুলাই কলেজ অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন কলেজ পরিচালন সমিতির প্রাক্তন সভাপতি নির্মলকুমার হাজরা। কলেজ পরিচালন সমিতির বর্তমান সভাপতি নির্মল ঘোষের সঙ্গে পূর্ব পরিচিতির সূত্রেই নির্মলবাবু অধ্যক্ষ হন বলেও একাধিক মহলে সেই সময় জল্পনা ছড়ায়। সংগঠনের এক সূত্রে খবর, পরিচালন সমিতি থেকে তৃণমূলের শহর সভাপতি দেবাশিস চৌধুরীর নাম বাদ যাওয়ায় তাঁর সঙ্গে নির্মল ঘোষের দূরত্ব বাড়তে থাকে। সেই থেকেই নির্মল ঘোষের সঙ্গে দেবাশিসবাবুর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত তৃণমূল ছাত্র পরিষদ (টিএমসিপি)-এর প্রাক্তন শহর সভাপতি রাজা সরকারের ঠাণ্ডা লড়াই চলছিল। দ্বন্দ্বের জেরেই একাধিকবার টিএমসিপি পরিচালিত কলেজের ছাত্র সংসেদর সাধারণ সম্পাদক সানি দত্তের অপসারণের দাবি তোলে হায়দায় গোষ্ঠী।
সম্প্রতি কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতির কাছ চিঠি পাঠিয়ে ইস্তফা দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন অধ্যক্ষ। অবশ্য এই ইস্তফার কারণ হিসাবে শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিক চাপ বেড়ে যাওয়ার কথাই বলেন তিনি। গত শনিবার এ বিষয়ে অধ্যক্ষ নির্মলকুমার হাজরা বলেন, “গত বছর একটি দুর্ঘটনার পর থেকে স্নায়ুর সমস্যায় ভুগছিলাম। এই কলেজে যোগ দেওয়ার পরে নতুন করে অসুস্থতা বেড়েছে। আসলে মানসিক চাপ বাড়ার ফলেই এই সমস্যা দেখা দিচ্ছে।” সেই মানসিক চাপের পিছনে কি রাজনৈতিক কোনও কারণ রয়েছে? অধ্যক্ষের জবাব, “এটা ঠিক আমাদের কলেজে ছাত্রদের দু’টি গোষ্ঠী রয়েছে। ভর্তি সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁদের একটা তো চাপ ছিলই। আমার অসুস্থতার পিছনে এটা একমাত্র কারণ নয় বটে, তবে একটা প্রভাব তো পড়ছেই।’’ ২০১৪ সালে পথ দুর্ঘটনার পরে অসুস্থ হন অধ্যক্ষ। তারপরেও কেন তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিলেন, রয়েছে প্রশ্ন।
আগেও একাধিকবার টিএমসিপি-এর গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে উত্তপ্ত হয়েছে খড়্গপুর কলেজ। সোমবার ফের প্রকাশ্যে এল কোন্দল। কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, এ দিন পরিচালন সমিতির সভা শুরুর পরেই সভা থেকে সানিকে বের করে দেওয়ার দাবিতে সভাকক্ষের বাইরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে হায়দায় অনুগামী কলেজ পড়ুয়ারা। অভিযোগ, হায়দার আলি কলেজ সভাপতি নির্মল ঘোষকে নিজেদের দাবির কথা জানান। তারপর সভাপতি ওই বৈঠক ছেড়ে সানিকে বেরিয়ে যেতে বলে বলে অভিযোগ। যদিও পরে সানিকে ফের বৈঠকে ডেকে পাঠানো হয়। সানির অভিযোগ, “আমি এখনও ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক। নিয়ম মতো আমি কলেজ পরিচালন সমিতির সদস্যও। কিন্তু দুষ্কর্মে জড়িত কলেজ ছাত্র হায়দার আলিকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন সভাপতি। ওঁর কথা শুনে এ দিন সভাপতি আমাকে সভা থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। পরে আমি সভায় ঢুকলেও আমাকে কিছু বলতে দেওয়া হয়নি।”
কলেজে টিএমসিপি-র গোষ্ঠীকোন্দল নতুন ঘটনা নয়। কলেজে আধিপত্য নিয়ে রাজা ও খড়্গপুরের প্রাক্তন পুরপ্রধান জওহরলাল পালের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হায়দার আলির অনুগামীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা আগেও ঘটেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষের পরদিনই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ থেকে ইস্তফা দেন অচিন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়। গত ৭ জুলাই কলেজ হস্টেলের মাঠে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। জখম হন তিনজন।
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, কলেজের ভর্তি প্রক্রিয়া চলাকালীন গণ্ডগোল বাধানোর উদ্দেশেই হস্টেলের মাঠে কেউ বোমা রেখে দিয়েছিল। ঘটনায় তদানীন্তন টিএমসিপি-র শহর সভাপতি রাজা সরকারকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। শহর সভাপতির পদ থেকে রাজাকে বহিষ্কার করার কথা ঘোষণা করেন টিএমসিপির
জেলা সভাপতি রমাপ্রসাদ গিরি। তারপরই রমাপ্রসাদের বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগ তুলে উষ্মা প্রকাশ করেন রাজা।
সোমবার নির্মল ঘোষের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রশ্ন তোলেন সানি। তাঁর কথায়, “আমাদের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, কলেজ পরিচালন সমিতির সভাপতিকে ন্যূনতম স্নাতক হতে হবে। কিন্তু নির্মলবাবু স্নাতক না হয়েও কী ভাবে এই সভাপতি পদে রয়েছেন তা দেখা উচিত। উনি কলেজে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জন্য দায়ী।” এ দিন রাজা সরকারও বলেন, “সানিকে যে ভাবে বৈঠক থেকে বের করা হয়েছে তা নিয়মবহির্ভূত। আমি এর নিন্দা জানাচ্ছি।”
এ বিষয়ে নির্মল ঘোষ বলেন, “কিছু ছাত্র বৈঠক চলাকালীন বিক্ষোভ দেখাচ্ছিল। তাই পরিস্থিতি সামলাতে প্রথমে সানি দত্তকে বের করা হয়েছিল। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি নিয়ে আমি নিজেই বৈঠকে সানিকে ডেকেছিলাম। আমি চাই না কলেজে ছাত্রদের মধ্যে গোষ্ঠী বিরোধ থাকুক। তাই দলের শহর সভাপতিকে মীমাংসা বৈঠকের জন্য বলেছি।” এ দিন কলেজ অধ্যক্ষ নির্মলকুমার হাজরাও বলেন, “কলেজের ছাত্রদের দুই গোষ্ঠীর জন্য যে অশান্তি হচ্ছে এটা প্রত্যাশিত নয়।” তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রসঙ্গে সানির বক্তব্য নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি নির্মলবাবু।