সেজে উঠেছে স্কুল। নিজস্ব চিত্র।
মাটি-নিকোনো উঠোনে সাবেকি আলপনা। মাঝখানের ঢ্যাঙা বাদাম গাছটার কাণ্ডটা রংবেরঙের কাপড় জড়িয়ে রঙিন হয়ে উঠেছে। সেই উঠোনে বসে বর্ষা, কৌশিক, রাজশ্রী, মলয়ের মতো শিশু পড়ুয়ারা একমনে কাগজের কারিকুরিতে ব্যস্ত। স্কুলের একটি ঘরে চলছে নাটকের কর্মশালা।
অন্য ঘরে আবৃত্তির কর্মশালা। স্কুল প্রাঙ্গণের এককোণে প্রাক্তনীদের বিজ্ঞান প্রদর্শনী। আর একদিকে মায়েদের ক্যান্টিন। লুচি, ঘুগনি, পিঠে, নারকেল নাড়ু তৈরির সুবাস ছড়াচ্ছে শীতের উত্তুরে হাওয়ায়। শনিবার এমনই উৎসবের আমেজে ঝাড়গ্রামের লবকুশ গ্রামের আংশিক বুনিয়াদি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শুরু হল ‘শিশু ও কিশোর বিকাশ মেলা’। তিন দিনের মেলা চলবে সোমবার পর্যন্ত। স্কুলের খুদে পড়ুয়ারাই মেলার আয়োজক। জঙ্গলে ঘেরা প্রত্যন্ত গ্রামের এই স্কুলটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন অভিভাবক, গ্রামবাসী ও প্রাক্তনীরা। তবে সার্বিক এই উৎসব পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে স্কুলের শিশুসংসদ। সেই সংসদের প্রধানমন্ত্রী ৯ বছরের হেমন্ত মাহাতোর কথায়, শুধু বার্ষিক এই উৎসব নয়, স্কুলের সব কিছুতেই পড়ুয়ারা জড়িয়ে আছি। প্রাক্তন দাদা-দিদি ও বাড়ির বড়রাও হাত মিলিয়ে উৎসবের সমস্ত কাজে আমাদের সাহায্য করছেন।”
জানা গেল, প্রত্যন্ত গ্রামের এই স্কুল কর্তৃপক্ষ আধুনিক চিন্তাধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পড়াশুনাকে আরও মনোগ্রাহী করে তোলার জন্য এমন উৎসবের আয়োজন করেছেন। চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়া ‘প্রধানমন্ত্রী’ হেমন্তের কথায়, “শিশু সংসদের সমস্ত মন্ত্রী ও সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা উৎসবের যাবতীয় পরিকল্পনা করেছি।” এদিন শিশু সংসদের এমন সার্থক বাস্তবায়ন দেখে দৃশ্যতই অভিভূত হন পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শক আমিনুল আহসান। সকাল দশটায় স্কুল প্রাঙ্গণে ঘুড়ি উড়িয়ে মেলার উদ্বোধন করে তিনি বলেন, “ইচ্ছেডানায় ভর করে মারের সাগরও পাড়ি দেওয়া যায়। ছোটরা সেটা করে দেখিয়েছে। কৃতিত্বটা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক, বর্তমান দুই শিক্ষক এবং গ্রামবাসী উভয়েরই প্রাপ্য।”
ঘটনা হল, এই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক রমণীমোহন মণ্ডল ২০১২ সালে রাজ্য সরকারের ‘শিক্ষারত্ন’ উপাধিতে ভূষিত হন। ২০১৩ সালে অবসর নেওয়ার পরেও এখনও নিয়মিত স্কুলে আসেন রমণীমোহনবাবু। প্রাক্তন শিক্ষকের মতোই স্কুলের বর্তমান দু’জন শিক্ষকও স্কুল পরিচালনার ক্ষেত্রে শিশু সংসদের মতামতকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। শিশুদের কাগজ দিয়ে হাতের কাজ তৈরি শেখাচ্ছেন ঝাড়গ্রাম আর্ট অ্যাকাডেমির অধ্যক্ষ সঞ্জীব মিত্র ও শিল্পী তুলি মিত্র সেনগুপ্ত। ঝাড়গ্রাম কথাকৃতির বিশিষ্ট দুই নাট্য ব্যক্তিত্ব কুন্তল পাল ও দেবলীনা পাল দাশগুপ্ত-র কাছে নাটকের তালিম নিচ্ছে ছোটরা। ঝাড়গ্রামের বাচিক শিল্পী সুমিতা বসাক শেখাচ্ছেন কেমন করে আবৃত্তি করতে হয়।
মায়েদের ক্যান্টিনের উমা মাহাতো, লতিকা মাহাতো, জ্যোৎস্না মাহাতোরা জানালেন, “ছেলেমেয়েদের আগ্রহে গ্রামের ১১ জন মহিলা মিলে মেলায় ক্যান্টিন খুলেছি। ভালই বিক্রি হচ্ছে।”