মেদিনীপুর সার্কিট হাউসে ভিজিল্যান্স কমিটির বৈঠক। —নিজস্ব চিত্র।
বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে। টাকাও আসছে। কিন্তু বাস্তবে তার যথাযথ রূপায়ণ হচ্ছে কী? পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের ভিজিল্যান্স মনিটরিং কমিটির প্রথম বৈঠকে এই সব প্রশ্নই তুললেন বিরোধী বিধায়কেরা।
শুক্রবার মেদিনীপুর সার্কিট হাউসে কমিটির প্রথম বৈঠকে সব থেকে বেশি আলোচনা হয়েছে একশো দিনের কাজের প্রকল্প নিয়ে। কারণ, এই প্রকল্পে কাজ করেও অনেকে টাকা পাননি। পশ্চিম মেদিনীপুরে এই প্রকল্পে বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ১৮০ কোটি টাকা! বৈঠকে উপস্থিত কংগ্রেস বিধায়ক মানস ভুঁইয়া, সিপিএম বিধায়ক রামেশ্বর দোলুইরা বলেন, “এ ব্যাপারে বিধানসভাতেও সব দল মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে কেন্দ্রের কাছে টাকা চাওয়া হবে। জেলায় সমস্যা মেটাতে কী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কোনও পরিকল্পনার কথা কেউ শোনাতে পারেননি।” শুধু এটাই নয়, তফসিলি জাতি ও জনজাতির উন্নয়ন প্রকল্প, পানীয় জল প্রকল্প, ইন্দিরা আবাস যোজনা, প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা-সহ বিভিন্ন প্রকল্পের কাজের গতিই অতি শ্লথ বলে অভিযোগ করেন বিরোধীরা। কাজে গতি আনতে, তার সঠিক রূপায়ণ হচ্ছে কিনা দেখতে ব্লকে ব্লকে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন কমিটির চেয়ারপার্সন তথা ঝাড়গ্রামের সাংসদ উমা সরেন। মানসবাবু বলেন, “চেয়ারপার্সন ব্লক ঘুরে ঘুরে সব দেখবেন বলে জানিয়েছেন। আমরাও তা চাই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কী বাস্তবায়িত হবে? প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে।” এ ব্যাপারে কমিটির চেয়ারপার্সন উমা বলেন, “অনেক বিষয়েই আলোচনা হয়েছে। জেলাশাসক তা জানিয়ে দেবেন।” আর পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলাশাসক জগদীশপ্রসাদ মিনার বক্তব্য, “যা বলার চেয়ারপার্সন বলবেন।”
এ দিনের বৈঠকে বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিরোধীরা। এখন জেলার মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ বিশুদ্ধ পানীয় জল পান। এ ব্যাপারে প্রশাসন কী করছে, কতদিনে সর্বত্র বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া যাবে তা জানতে চান। তফসিলি জাতি ও জনজাতিদের উন্নয়নে কেন্দ্রীয় সাহায্য মেলে। ‘ট্রাইবাল সাব প্ল্যান’-এ জনসংখ্যার নিরিখে একটি জেলাও সম পরিমাণ টাকা পেতে পারে। কিন্তু পরিকল্পনা কি ঠিকমতো করা হচ্ছে, না কোনও গাফিলতি থাকছে, বিরোধীরা তা জানতে চান। কেশপুরের সিপিএম বিধায়ক রামেশ্বর দোলুই বলেন, “বিধানসভায় প্রশ্ন করায় বলা হয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরে ৪৫৪টি পিছিয়ে পড়া গ্রাম। পিছিয়ে পড়া গ্রামের অর্থ সেই এলাকা পানীয় জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা -সব দিক দিয়েই পিছিয়ে। দু’বেলা মানুষ ভাল করে খেতে পর্যন্ত পান না। অথচ, মুখ্যমন্ত্রী বলে চলেছেন জঙ্গলমহলে হাসির বন্যা বইছে।” উন্নয়নের জন্য কী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে জানতে চেয়ে এ দিন সদুত্তর পাননি বলেও অভিযোগ এই সিপিএম বিধায়কের।
নানা বিষয়েই এ দিনের বৈঠকে যথাযথ জবাব মেলেনি বলে অভিযোগ। বিরোধীরা জানান, জেলার বিদ্যুত্হীন মৌজার তালিকা চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট দফতরের আধিকারিকেরা দিতে পারেননি। জামবনি ও দাঁতন-২ ব্লককে ইন্দিরা আবাসে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি কেন? তারও সদুত্তর মেলেনি। বহু জায়গাতেই ইন্দিরা আবাস যোজনায় অর্ধেক বাড়ি হয়ে পড়ে রয়েছে। দ্বিতীয় কিস্তির টাকার অভাবে তা সম্পূর্ণ করা যায়নি। বরাদ্দ টাকায় ভাল বাড়ি তৈরি করা যাবে না বলেও শাসক ও বিরোধী বিধায়কেরা সহমত হন। তাই এই প্রকল্পে অর্থ বৃদ্ধির জন্য আবেদন জানানোর কথাও ওঠে। আর একটি বিষয়ে সকলে সহমত হন, তা হল প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনায় রাস্তা নির্মাণ। কারণ, কেন্দ্রীয় এই প্রকল্পে অর্থ থাকা সত্ত্বেও কাজ হচ্ছে না। যেখানে হচ্ছে সেখানেও গতি অতি শ্লথ। উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের নির্বাচিত সদস্যদের মতামত নেওয়া দূর, তাঁদের একেবারেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ। সবংয়ের কংগ্রেস বিধায়ক মানসবাবুর, “পঞ্চায়েত যদি নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে গুরুত্ব না দেয়, পঞ্চায়েত সমিতি গ্রাম পঞ্চায়েতকে ও জেলা পরিষদ পঞ্চায়েত সমিতিকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেদের মতো কাজ করে, তাহলে সার্বিক উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়ে।” সিপিএমের রামেশ্বরবাবুর আবার অভিযোগ, “মূলত সিন্ডিকেট রাজ ও স্থানীয় স্তরে শাসকদলের কিছু নেতার ভূমিকার জন্যই রাস্তা নির্মাণের কাজে ব্যাঘাত ঘটছে।”