নিজের বাড়ির সামনে নীলমণি সরেন। নিজস্ব চিত্র।
হিসেব বলছে তাঁরা ইন্দিরা আবাস যোজনায় ঘর পেয়েছেন। সেই মতো বিডিওর কাছে তথ্যও পাঠিয়েছেন পঞ্চায়েত প্রধান। কিন্তু ছিটে বেড়ার দেওয়ালের যে ঘরে বছর তেষট্টির নীলমণি সরেন থাকেন, সেখানে এখনও অ্যাজবেস্টের চালা। পাশের ততোধিক জীর্ণ ঘরে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকেন নীলমণিদেবীর এক ছেলে রবীন্দ্রনাথ। সেখানে থাকার আর জায়গা না থাকায় অন্য ছেলে থাকেন শ্বশুরবাড়িতে।
সত্তরের দশকের গোড়ায় দাঁতন-২ ব্লকের হরিপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বামনাসাই গ্রামের ব্যবর্তা পুকুর পাড়ের জমি পাট্টা দেওয়া হয়েছিল কয়েকটি পরিবারকে। এখন সেখানে বসতি ৩৬টি পরিবারের। এদের মধ্যে মাত্র ন’টি বাড়ি ইটের গাঁথনির। আর বাকি কাঁচা বাড়ির একটিতে রয়েছেন নীলমণিদেবীরা। কিন্তু পঞ্চায়েত ও প্রশাসন জানাচ্ছে, নীলমণিদেবী ইন্দিরা আবাস যোজনায় ঘর পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ জানান, অনেক আগে তাঁর মা ওই ঘর পাওয়ার জন্য আবেদন জানান পঞ্চায়েত ও প্রশাসনের কাছে। জানতে পারেন সম্ভাব্য প্রাপকদের তালিকায় তাঁর মায়ের নাম রয়েছে। কিন্তু, দীর্ঘ কয়েক মাস পরেও টাকা না মেলায় ফের খোঁজ নেন। ব্লক প্রশাসনে গিয়ে জানতে পারেন তাঁদের নাকি আগেই এই প্রকল্পের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। নীলমণিদেবী বলেন, “থায় যেন বাজ পড়ল। অনুরোধ করি কোথায় ভুল হচ্ছে তা দেখতে। বাধ্য হয়ে তথ্য জানার অধিকার আইনে (আরটিআই) আবেদন করি।”
গত ৬ নভেম্বর পঞ্চায়েতের সচিবকে, পরে ৯ নভেম্বর প্রধানের কাছে ওই আইনে আবেদন জানানো হয়। কিন্তু জবাব মেলেনি। তারপরই ২৮ ডিসেম্বর বিডিওর কাছে ইন্দিরা আবাস যোজনার অর্থপ্রাপ্তির সন, তারিখ ও প্রাপকের স্বাক্ষরিত নথি চেয়ে তথ্য জানার অধিকার আইনে আবেদন করা হয়। ২৭ জানুয়ারি বিডিওর স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ডাকযোগে আসে নীলমণি দাসের নামে। সেখানে উল্লেখ করা রয়েছে, তথ্যের নথি সরবরাহ করার জন্য প্রস্তুত। সঙ্গে একটি এক পাতার কাগজে রয়েছে পঞ্চায়েতের একটি নথি। সেখানে প্রধান ও একজিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্টের স্বাক্ষর করা একটি তালিকায় নীলমনি সরেনের নামের পাশে লেখা রয়েছে, ‘আগে পেয়েছে, পাবে না।’ ওই দিনই ব্লক অফিসে গেলে তাঁকে বলা হয় প্রশাসনের কাছে যে নথি ছিল তা দেওয়া হয়েছে। আর কোনোও নথি নেই।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এই যোজনায় কারা সুবিধে পেতে পারেন তার তালিকা নথিসহ ব্লক প্রশাসনের কাছে জমা দেয় পঞ্চায়েত। সেই নথি খতিয়ে দেখে সন্তুষ্ট হলে তবেই টাকা দেয় প্রশাসন। দু’টি পর্যায়ে দেওয়া হয় সেই টাকা। প্রথম পর্যায়ের টাকা দেওয়া হয় যথার্থ নথি দেখই। দ্বিতীয় পর্যায়ের টাকা দেওয়ার আগে প্রশাসনিক কর্মীরা সরেজমিন তদন্ত করে দেখেন প্রথম পর্যায়ের টাকা সঠিকভাবে খরচ করা হয়েছে কিনা। কাজ শেষ হলে প্রাপককে তার নতুন বাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলে কম্পিউটারে নথিবদ্ধ করাই নিয়ম। নীলমণিদেবী বলেন, “তাহলে ওই সমস্ত নথি রয়েছে প্রশাসনের কাছে। তারা দেখাক।”
ভুলের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন তৃণমূল পরিচালিত হরিপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান রুমা জানা। তিনি বলেন, “স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য যেভাবে তালিকা ও তথ্য পাঠিয়েছেন তাকে মান্যতা দিয়েই আমি প্রশাসনকে তথ্য দিয়েছি। তাহলে ওই তথ্যে ভুল রয়েছে।” তাহলে কি রাজনৈতিক কারণে ওই নাম বাদ দেওয়া হয়েছে? স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য তৃণমূলের সুরঞ্জিত সাউয়ের উত্তর, ‘‘যোগ্য হলে তিনি পাবেন। তবে ওই তালিকাটি একবার যাচাই করে দেখতে হবে।” দাঁতন ২ ব্লকের বিডিও রুনু রায় বলেন, “অভিযোগ পেলে তদন্ত হবে। তথ্য আইনেও কেন তথ্য দেওয়া হল না তাও খতিয়ে দেখছি।” আপাতত সেই অপেক্ষাতেই নীলমণি।