পরীক্ষা দিচ্ছে গুটিকয়েক পড়ুয়া। ছবি: দেবরাজ ঘোষ।
একবার বার্ষিক মূল্যায়ন হয়ে যাওয়ার পর ফের পড়ুয়াদের পরীক্ষায় বসতে হল। প্রধান শিক্ষিকা লম্বা ছুটিতে গিয়েছেন। অথচ সহশিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাউকেই তিনি দায়িত্ব দিয়ে যাননি। এর ফলে চূড়ান্ত পর্বের লিখিত মূল্যায়ন নিয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় এমন কাণ্ড! ঝাড়গ্রাম শহরের বাছুরডোবা এলাকার ‘ভারতমাতা হিন্দি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে’ কয়েকদিন আগেই বার্ষিক পরীক্ষা (তৃতীয় পর্বের লিখিত মূল্যায়ন) হয়ে গিয়েছে। কিন্তু মঙ্গলবার ফের পরীক্ষা দিতে হল পড়ুয়াদের। বস্তুতপক্ষে, এ দিনের ঘটনায় সরকারি প্রাথমিক স্কুলের বেহাল অবস্থার চিত্রটা ফের প্রকাশ্যে এল।
প্রাথমিক শিক্ষাবর্ষের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, এবার নভেম্বরের শেষ ও ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে তৃতীয় পর্বের মূল্যায়ন শেষ করে ফেলার কথা ছিল। কিন্তু ৩০ নভেম্বর জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের তরফে বিজ্ঞপ্তি জারি করে পরীক্ষার নির্ঘন্ট পিছিয়ে দেওয়া হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের সভাপতির স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে জেলার সমস্ত প্রাথমিক স্কুলগুলির তৃতীয় পর্বের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ১৪ থেকে ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে বলা হয়।
ঝাড়গ্রাম শহরের ভারতমাতা হিন্দি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা কৃষ্ণা ঘোষ গত ২৭ নভেম্বর থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত চাইল্ড কেয়ার লিভ (সিসিএল) নিয়েছেন। তার আগে বার্ষিক মূল্যায়নের রুটিন জারি করেন তিনি। সেই রুটিন অনুযায়ী ডিসেম্বরের ১, ২, ৩ ও ৭ তারিখ তৃতীয় পর্বের মূল্যায়ন হয়ে যায়। পরীক্ষা হয়ে যাওয়ায় পরে এখন স্কুল খোলা থাকলেও পড়ুয়াদের হাজিরার হার খুবই কম। ইতিমধ্যে প্রাথমিক সংসদের পরীক্ষা পিছনোর বিজ্ঞপ্তির বিষয়টি জানতে পেরে আতান্তরে পড়ে যান স্কুলের ‘সিনিয়র’ সহশিক্ষিকা মঞ্জুশ্রী শীট। ঝাড়গ্রাম পশ্চিম চক্রের অবর বিদ্যালয় পরিদর্শকের দফতরে যোগাযোগ করেন তিনি।
মঞ্জুশ্রীদেবীর দাবি, অবর বিদ্যালয় পরিদর্শকের দফতর থেকে তাঁকে মৌখিক ভাবে জানানো হয়, সংসদ সভাপতির নির্দেশ অনুযায়ী পরীক্ষা নিতে হবে। কিন্তু প্রধান শিক্ষিকা দায়িত্বভার দিয়ে না যাওয়ায় নতুন করে নোটিস ও রুটিন জারি কে করবেন তা নিয়ে মঞ্জুশ্রীদেবী-সহ তিনজন শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে চাপান উতোর শুরু হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত মঞ্জুশ্রীদেবী আগাম নোটিস ও রুটিন ছাড়াই মঙ্গলবার পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এদিন স্কুলে এসেছিল মাত্র ৯ জন পড়ুয়া। এদিন স্কুলে গিয়ে দেখা গেল, হাতে গোনা কয়েকজন পড়ুয়া পরীক্ষা দিচ্ছে। প্রথম শ্রেণির পীযূষ ঘোষ, দ্বিতীয় শ্রেণির সঞ্চিতা সর্দাররা জানায়, কয়েকদিন আগেই তারা পরীক্ষা দিয়েছে। তাদের কথায়, “দিদিমণি বললেন, আবার পরীক্ষা দিতে হবে। তাই পরীক্ষা দিচ্ছি।”
এভাবে পড়ুয়াদের ফের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে জেনে ক্ষুব্ধ হন অভিভাবকদের একাংশ। বিষয়টি নিয়ে হইচই শুরু হতেই এদিন স্কুলশিক্ষা দফতরের এক প্রতিনিধি স্কুলে গিয়ে সরজমিনে খতিয়ে দেখেন। এরপর বিকেলে ঝাড়গ্রাম পশ্চিম চক্রের অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক (এসআই) প্রকাশ সরকার পরীক্ষা বন্ধ করার নির্দেশ দেন। প্রকাশবাবু বলেন, “পড়ুয়াদের আর পরীক্ষা দিতে হবে না। আগের পরীক্ষাগুলিই গ্রাহ্য করা হবে। প্রধান শিক্ষিকা ছুটিতে যাওয়ার আগে পরবর্তী সিনিয়র টিচারকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে যাবেন এটাই নিয়ম। কেন তার ব্যতিক্রম হল তা দেখা হচ্ছে।”
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের সভাপতি নারায়ণ সাঁতরা বলেন, “এভাবে শিশুদের উপর মানসিক চাপ দেওয়া কোনও মতেই বরদাস্ত করা হবে না। এসআইকে কড়া পদক্ষেপ করতে বলেছি। প্রধান শিক্ষিকার লিখিত জবাব তলব করা হবে। দায়িত্বভার ছাড়াই আর এক শিক্ষিকা এ দিন ফের কেন পরীক্ষা নিলেন, সেটাও এসআইকে জানতে বলেছি।” প্রধান শিক্ষিকা কৃষ্ণা ঘোষের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি ছুটিতে আছি। যা জানার এসআইয়ের কাছে জানুন।”