পূর্বে বাম-প্রচারে ঘুরেফিরে সেই লক্ষ্মণ-কথা

তিনি নেই। কিন্তু, তাঁকে কেন্দ্র করেই ঘুরপাক খাচ্ছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বাম-রাজনীতি। প্রায় সব নেতাকর্মী-সমথর্কদের ঘরোয়া বক্তব্যে, কর্মিসভায় আবর্তিত হচ্ছে তমলুকের প্রাক্তন সাংসদ লক্ষ্মণ শেঠ প্রসঙ্গ। শনি ও রবিবার হলদিয়ার সিপিএম প্রার্থীর সভাগুলিতে ধরা পড়ল এমনই ছবি।

Advertisement

অমিত কর মহাপাত্র

শেষ আপডেট: ৩১ মার্চ ২০১৪ ০২:৪০
Share:

হলদিয়ার রাজনগর গ্রামে বামেদের সভা। নিজস্ব চিত্র।

তিনি নেই। কিন্তু, তাঁকে কেন্দ্র করেই ঘুরপাক খাচ্ছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বাম-রাজনীতি। প্রায় সব নেতাকর্মী-সমথর্কদের ঘরোয়া বক্তব্যে, কর্মিসভায় আবর্তিত হচ্ছে তমলুকের প্রাক্তন সাংসদ লক্ষ্মণ শেঠ প্রসঙ্গ। শনি ও রবিবার হলদিয়ার সিপিএম প্রার্থীর সভাগুলিতে ধরা পড়ল এমনই ছবি।

Advertisement

বহিষ্কৃত লক্ষ্মণকে ‘অভিভাবক’ হিসাবে পরিচয় দিয়ে ভোট-প্রচার চালাচ্ছেন খোদ তমলুক লোকসভার সিপিএম প্রার্থী শেখ ইব্রাহিম আলি। ঠারেঠোরে স্বীকার করছেন, ‘লক্ষ্মণবাবু থাকলে ভাল হত।’ কেন এমন কৌশল নিতে হচ্ছে সিপিএমকে? রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, জেলায় লক্ষ্মণ-অনুগামীর সংখ্যা যেহেতু বেশি, তাই লক্ষ্মণবাবুর বিরুদ্ধে কথা বললে রাজনৈতিক ভাবে সিপিএমের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই এমন কৌশল। পরিস্থিতি দেখে ইতিমধ্যেই লক্ষ্মণ-জায়া তমালিকা-সহ লক্ষ্মণ অনুগামী নেতাদের ভোট প্রচারে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিয়েছেন সিপিএম নেতৃত্ব।

রবিবার চৈতন্যপুর কমিউনিটি হলে পূর্বের জেলা পর্যবেক্ষক রবীন দেবের উপস্থিতিতে লক্ষ্মণ প্রসঙ্গ টানেন লক্ষ্মণ-জায়া তমালিকা পণ্ডা শেঠ। তিনি বলেন, “দীর্ঘ দিন তিনি গভীর যন্ত্রণা ও মানসিক অস্থিরতার মধ্যে কাটিয়েছেন। অনেক দিনই তিনি একা।” তমালিকার কথায়, “নন্দীগ্রাম-কাণ্ডে যে ৮২ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল তাঁদের সকলেই বাড়ি ফিরেছেন। ব্যতিক্রম একমাত্র লক্ষ্মণ শেঠ। এখন তিনি আরও বেশি একা হয়ে গিয়েছেন। তবে, আমরা তাঁর কাছ থেকে আরও বেশি ধৈর্য্যশক্তির আশা করেছিলাম। কিন্তু, তিনিও তো রক্ত মাংসের মানুষ। তা হয়তো পারেননি। তাঁর যন্ত্রণা-একাকিত্ব-অসহায়তা আপনারা যদি এ সবের বিচার করেন তা হলে তিনি সুবিচারের দৃষ্টিভঙ্গি পাবেন আপনাদের কাছ থেকে।” তমালিকা বলেন, “তিনি এই এলাকার নেতা ছিলেন। তাঁকে আপনারা ভাল করে চেনেন। আশা করি, এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে আপনারা এ সব কিছু বিচার করবেন।”

Advertisement

শনিবারের প্রচারেও বারবার ফিরে ফিরে এসেছে লক্ষ্মণ প্রসঙ্গ। ওই দিন হলদিয়া ব্লকের বাড় উত্তর হিংলি ও চকদ্বীপা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় পাড়া বৈঠকের ঢঙে প্রচার চালান ইব্রাহিম। নিজেদের সমর্থক বেশি এমন এলাকার পাড়াগুলিতে বৈঠক আয়োজিত হয়। প্রার্থী-পরিচিতর সেই বৈঠকেই স্থানীয় লোকাল কমিটির সদস্য মৃগেন্দ্রনাথ মাইতি কার্যত স্বীকার করে নেন, ‘দলে সাংগঠনিক ত্রুটি আছে। এখন আর কোনও দিক দিয়েই পার্টির জোর নেই!’

এক সময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা লক্ষ্মণ শেঠ নেই প্রচারে বা প্রচার কর্মসূচির প্ল্যান তৈরিতে। এমনটা স্থানীয় মুরারিচক গ্রামের শেখ সোলেমানের অভিজ্ঞতায় প্রথম। প্রিয় নেতার বহিষ্কৃত হওয়ার খবরে দুঃখিত দলীয় কর্মী শেখ সোলেমান অকপটে স্বীকার করে নেন, “লক্ষ্মণবাবু নেই খারাপ লাগছে। তার তুলনায় এই নতুন প্রার্থী...। যাক, দল যা ভাল বুঝেছে।” এমন কথাবার্তা যে দলে চালু রয়েছে তা জানেন তমলুকের বামপ্রার্থী। অস্বস্তি ঢাকতে তাই কখনও বলছেন, “লক্ষ্মণবাবু পিতৃতুল্য অভিভাবক। তাঁর আশির্বাদ আমার সঙ্গে আছে।”

পরিস্থিতি দেখে দলের তিন বারের সাংসদ, বিধায়ক লক্ষ্মণবাবুর সাফল্যকে প্রচারে আনছেন নেতা-কর্মী-প্রার্থী। তাঁর অবদান কথায় কথায় স্বীকার করছে সিপিএম। মহিষাদল জোনাল কমিটির সম্পাদক শরৎ কুইল্যা বলেন, “লক্ষ্মণবাবু হলদিয়ায় ৪০টি শিল্পসংস্থা আনিয়েছেন। হাজার হাজার মানুষকে সেখানে কাজ দিয়েছেন। গ্রাম-শহরের উন্নতি করিয়েছেন সমান তালে। সেখানে গত পাঁচ বছরে হলদিয়া শিল্পাঞ্চল ধ্বংসের দিকে চলছে।” একই সুরে প্রার্থী ইব্রাহিম আলি বলেন, “বিধায়ক ও সাংসদ হিসাবে লক্ষ্মণবাবু হলদিয়ায় সার্বিক উন্নতি করেছেন। তিনি থাকলে ভাল হত।” নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গে লক্ষ্মণবাবুর পাশে দাঁড়িয়ে ইব্রাহিম বলেন, “নন্দীগ্রামের ঘটনায় শুভেন্দু অধিকারীর জেলে থাকার কথা। নন্দীগ্রামবাসীর প্রতি বঞ্চনার অভিযোগ তুলে বলেন, “নন্দীগ্রাম শহীদ-স্তম্ভ ছাড়া আর কিছুই পায়নি।”

এবিজি গোষ্ঠীর বিদায়ের পর নতুন শিল্প না-আসা, বন্দরের নাব্যতা করমে যাওয়া থেকে বন্দরের লোকসান প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দুর সমালোচনা করে লক্ষ্মণবাবুর প্রশংসা করেন ইব্রাহিম। সিপিএম প্রার্থীর দাবি, “লক্ষ্মণবাবুই হলদিয়ার রূপকার। তার সময়েই শিল্পে জোয়ার এসেছিল। কিন্তু, এখন শ্রমিক ও বেকাররা কাজ হারিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন।” তাঁর কটাক্ষ, “তৃণমূলের এক সাংসদ জাহাজ প্রতিমন্ত্রী হয়ে বন্দর নিয়ে ভাঁওতা দিয়ে গেছেন।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement