ফের হাতির হানায় মৃত্যু গড়বেতায়

ফের হাতির হামলার শিকার এক প্রৌঢ়। বৃহস্পতিবার ভোরে গড়বেতা থানার ভুলা গ্রামে বেড়াচ্ছিলেন বছর পঞ্চান্নর অঞ্জন কুণ্ডু। হঠাৎই হাতির পালের সামনে প়ড়ে যান তিনি। একটি হাতি তাঁকে শুঁড়ে পেঁচিয়ে মাটিতে আছড়ে ফেলে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় অঞ্জনবাবুর। আর এই নিয়ে চলতি মাসে হাতির আক্রমণের মৃত্যু হল এক শিশু-সহ চারজনের। জখম হয়েছে এক রেঞ্জার-সহ দু’জন।

Advertisement

অভিজিৎ চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০১৬ ০১:৪০
Share:

হাতির হামলায় সন্ত্রস্ত গ্রামের বাসিন্দারা। নিজস্ব চিত্র।

ফের হাতির হামলার শিকার এক প্রৌঢ়। বৃহস্পতিবার ভোরে গড়বেতা থানার ভুলা গ্রামে বেড়াচ্ছিলেন বছর পঞ্চান্নর অঞ্জন কুণ্ডু। হঠাৎই হাতির পালের সামনে প়ড়ে যান তিনি। একটি হাতি তাঁকে শুঁড়ে পেঁচিয়ে মাটিতে আছড়ে ফেলে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় অঞ্জনবাবুর। আর এই নিয়ে চলতি মাসে হাতির আক্রমণের মৃত্যু হল এক শিশু-সহ চারজনের। জখম হয়েছে এক রেঞ্জার-সহ দু’জন।

Advertisement

বুধবার ভোরেও গোয়ালতোড় থানা এলাকার আমলাশুলিতে হাতির হানায় প্রাণ হারিয়েছেন সাক্ষীগোপাল দাস (৫৬) নামে এক প্রৌঢ়। বন দফতর জানিয়েছে, ওই দিন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন সাক্ষীগোপালবাবু। এলাকায় হাতি ঢুকেছে বলে বুঝতে পারেননি। হঠাত্‌ দেখেন সামনে হাতি। ছুটে পালানোর আগেই শুঁড় দিয়ে আছাড় মারে একটি হাতি। পা দিয়ে বুকের উপর আঘাত করে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় বৃদ্ধের।

বেশ কয়েকদিন ধরে গোয়ালতোড় থানা এলাকার বিস্তীর্ণ এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হাতির পাল। মঙ্গলবার রাতেই ১৭টি হাতির একটি দল হাজির হয় আমলাশুলিতে। সারারাত ধরে মাঠের ফসল খেয়ে মাড়িয়ে নষ্ট করে বলে স্থানীয় মানুষের অভিযোগ। কয়েক বছর আগেও অগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ঝাড়গ্রামের নয়াগ্রাম হয়ে দলমা থেকে হাতির পাল জেলায় আসত। মাস তিন-চারেক বিভিন্ন জঙ্গলে থাকার পর ফের ঝাড়খন্ডের দলমা বা উড়িষ্যায় ফিরে যেত তারা। কিন্তু সম্প্রতি বিভিন্ন রেঞ্জ এলাকাতেই থাকতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করছে হাতির পাল।

Advertisement

কিন্তু কেন এমন বদল? বন দফতর সূত্রে খবর, জঙ্গলে পর্যাপ্ত খাবার না মেলায় জঙ্গলের পাশের গ্রামে হামলা চালাচ্ছে হাতির পাল। বাড়ছে জঙ্গল ঘেঁষা গ্রামের বাসিন্দাদের আতঙ্কও। বন দফতর জানিয়েছে, মদ ও হাঁড়িয়ার গন্ধে হাতি বেশি গ্রামে ঢোকে। তাই হাতি তাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত সার্চলাইট কেনার পাশাপাশি জঙ্গল লাগোয়া যে সমস্ত এলাকায় চোলাই মদ ও হাঁড়িয়া তৈরি করা হচ্ছে তা তৈরি বন্ধ রাখার জন্য পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত হয়েছে। মেদিনীপুর বনবিভাগের আধিকারিক বিজয় শালিমঠ বলেন, “মৃত ও ক্ষতিগ্রস্তদের শীঘ্রই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। হাতির দলকে অন্যত্র সরাতেও পদক্ষেপ করা হবে।”

দলমা থেকে নেমে আসা মরসুমি হস্তিকুলের দাপটে পশ্চিম মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গ্রামবাসীদের ত্রস্ত দিনযাপন নিয়ে শেষ পর্যন্ত বৈঠক করলেন বনকর্তারা। তবে, এই বৈঠকের প্রেক্ষিতে রয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের পড়শি জেলা বাঁকুড়ার ‘অসহয়োগিতা’।

সবিস্তার পড়তে ক্লিক করুন।

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের এমনই দাবি। বন দফতরের এক কর্তা জানাচ্ছেন, এ ব্যাপারে সরাসরি বনমন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ বর্মনের কাছেও নালিশ জানিয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা পরিষদ। তাদের অভিযোগ, দলমা থেকে রাঢ়বঙ্গে নেমে আসার পরে হাতিরা কিছু দিন মেদিনীপুরের জঙ্গলে কাটিয়ে পাড়ি দেয় বাঁকুড়ার দিকে। এ বার সেই পথেই কাঁটা তুলে দিয়েছে বাঁকুড়া সীমানা লাগোয়া গ্রামগুলি। হাতি-ঠেকাতে কোথাও নালা কেটে কোথাও বা কাঁটা তারের বেড়া তুলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ এবং সে ব্যাপারে বাঁকুড়া প্রশাসন তথা বন দফতরের ‘প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়’ও রয়েছে বলে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের এক কর্তার দাবি।

হাতির হানা থেকে জেলার মানুষকে আড়াল করতে প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন মদতের সঙ্গে রয়ে গিয়েছে শাসক দলের স্থানীয় নেতাদের মদত। এমনই দাবি পশ্চিম মেদিনীপুরের এক তাবড় তৃণমূল নেতার। যার ইঙ্গিত মিলেছে শাসক দলের পড়শি জেলার এক নেতার কথাতেও। যিনি স্পষ্টই কবুল করছেন, ‘‘আগে তো বাঁকুড়া জেলার মানুষের নিরাপত্তা, তার পরে অন্য কেউ। হাতিদের রুখতে তাই গ্রামের মানুষকে আমরাই বেড়া তুলতে বলেছি।’’কিন্তু তা হাতিদের চলাচলের পথে (করিডরে) কেন?

দুই প্রশাসন এবং শাসক দলের দুই জেলা নেতাদের মাঝে পড়ে গিয়েছে দলমার দামালরা। বাঁকুড়ার জঙ্গলে পাড়ি দিতে না পারায় প্রায় দেড়শো হাতির ওই দলটি ভেঙে গিয়েছে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কিছুটা এলোমেলো ভাবেই তারা এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে পশ্চিম মেদিনীপুরের বিভিন্ন এলাকায়। এ দিকে, শীতের জঙ্গলে খাবার ক্রমে ফুরিয়ে আসায় তারা এ বার পা বাড়াচ্ছে লোকালয়ে। আর তার জেরেই নিরন্তর প্রাণহানির ঘটনা। চলতি বছরে মারা গিয়েছেন অন্তত ৪২ জন।

এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই বনমন্ত্রীর কাছে নালিশ জানিয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পরিষদ। আগামী ১৯ তারিখ পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে দুই জেলাই ঘুরে দেখবেন মন্ত্রী। বিনয়বাবু বলছেন, ‘‘হাতিরা কেন এক জেলাতেই রয়ে গিয়েছে তা জানতে চেয়েছি বনকর্তাদের কাছে। আমি নিজেও যাচ্ছি, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে।’’ এ দিন খড়্গপুরে আলোচনায় বসেন বন দফতরের অতিরিক্ত প্রধান মুখ্য বনপাল আর কে মহাতোলিয়া, এবং মুখ্য বনপাল (বন্যপ্রাণ-সদর) কল্যাণ দাস।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement