কেনাকাটার ভিড়। —নিজস্ব চিত্র।
ব্যাগ হাতে লক্ষ্মীপুজোর বাজারে গিয়ে হাত পুড়ছে মধ্যবিত্তের। যেখানেই হাত দেওয়া হোক, বাজার চড়া। সব্জি থেকে ফল- ফুল, সমস্ত কিছুরই। পুজোয় প্রায় প্রতি বাড়িতেই খিচুড়ি হয়। শহরের বাজারে এখন ডালের দাম কেজি প্রতি ১৭০- ২০০ টাকা। সরষের তেলের দাম ১৩০- ১৪০ টাকা। আজ, সোমবার কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। রবিবার দিনভর সরগরম ছিল পুজোর বাজার। কিন্তু, বাজারে গিয়ে মাথায় হাত পড়েছে কমবেশি সব মধ্যবিত্তেরই। অনেকে ছাঁচের প্রতিমা এনে পুজো করেন। সেই প্রতিমারও দাম চড়া! অগত্যা আয়োজনে কিছুটা কাঁটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকেই।
শহরের গৃহবধূ কৃষ্ণা দে- র কথায়, “বাড়িতে বহুদিন ধরে লক্ষ্মীপুজো হয়ে আসছে। এ বার সব্জি থেকে ফল- ফুল, সব কিছুরই দাম চড়া। তারমধ্যেই সব আয়োজন করতে হচ্ছে।” গৃহবধূ মানসী গিরি- র কথায়, “পুজোর সঙ্গে তো আর আপোষ করা যায় না। আয়োজনে কিছু কম করলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। মনে হয়, কোথাও একটা ফাঁক থেকে গেল। ফলে, সাধ্যের মধ্যে সব আয়োজনই করতে হচ্ছে।” শহরের বাসিন্দা শ্রীকান্ত সাহার কথায়, “বাজারের যা অবস্থা, তাতে পকেটের টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। তবু ব্যাগ ভরছে না!” পুজোর প্রসাদে বেশ কিছু ফল লাগে। গেল বার যে আপেল বিক্রি হয়েছে ৮০- ৯০ টাকায়, এ বার সেই আপেলই বিক্রি হচ্ছে ১১০- ১২০ টাকায়। কলা ২৫- ৩০ টাকা ডজন (চাপা), ৪৫- ৫০ টাকা (কাঁঠালি)। আঙুরের দাম কেজি প্রতি ১৫০ ছুঁয়েছে। নাসপাতি ৮০- ১০০ টাকা কেজি। খেজুর ৮০ টাকা কেজি। শশা ২০ টাকা। শাঁখআলু ১০০ টাকা। পানিফলও ৪০ টাকা। কমলালেবু এক- একটা ১০ টাকা। মুসুম্বি ২০ টাকায় তিনটে। আনারস ৫০ টাকা। এক- একটি নারকেল বিকোচ্ছে ১৫- ৩০ টাকা দরে। ফল বিক্রেতারা অবশ্য জানাচ্ছেন, পুজোর সময় এমনিতেই দাম একটু বাড়ে। এ বার কিছু ফলের আমদানিও কম হয়েছে। ফলে, দাম উর্ধ্বমুখী। মেদিনীপুরের ফল ব্যবসায়ী গোপাল সাহা, রঞ্জিত দাসদের কথায়, “গেল বারের থেকে এ বার দাম একটু বেড়েছে।”
খিচুরি- তরকারিতে সব্জি লাগেই। সব্জির বাজারেও যেন আগুন! গড়বেতা, ঘাটাল, দাসপুর প্রভৃতি এলাকা থেকে মেদিনীপুরে সব্জি আসে। পাশের পূর্ব মেদিনীপুর থেকেও কিছু সব্জি আসে। এ বার বন্যার জেরে অনেক এলাকায় চাষ মার খেয়েছে। তার প্রভাব পড়েছে বাজারে। শহরের বাসিন্দা সাধন দে- র কথায়, “বেগুন- ঢেঁড়শ- ঝিঙে, সবকিছুই দাম চড়া।” ১০০ টাকার নীচে ছাঁচের ছোট প্রতিমা নেই বললেই চলে। শাড়ি পরানো মাটির ছোট প্রতিমার দাম ৩০০ টাকা। সোমবার মেদিনীপুরের কোতয়ালিবাজার, এলআইসি মোড়, রাজাবাজার প্রভৃতি এলাকায় এই দামে প্রতিমা বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে, এক- একটি গাঁদা ফুলের মালার দাম ৮- ১০ টাকা। রজনীগন্ধা ফুলের মালার দাম ১৫-২০ টাকা। আকারে যত বড় হবে, দামও তত চড়বে। মধ্যবিত্ত বাড়িতেও পুজোর দিনে খিচুড়ি খাওয়ানো হয়। প্রতিবেশী- পরিজনদের অনেকে ঘরে ডাকেন। কোথাও ২০০ জনকে খাওয়ানো হয়, কোথাও বা ৩০০ জনকে। বছর কয়েক আগেও যেখানে লক্ষ্মীপুজোর সব আয়োজন এবং ২০০ জনকে খিচুড়ি খাওয়াতে ১২-১৫ হাজার টাকা খরচ হত, এখন সেখানে খরচ বেড়ে ২৫- ৩০ হাজার হচ্ছে। শহরের এক বাসিন্দার কথায়, “মুদি দোকানেই তো ১০-১২ হাজার বিল হয়ে যাচ্ছে। ডাল-তেলের যা দাম! এরপরে ফল- ফুলের বাজার আছে। ফলের বাজারে ৫ হাজার টাকার কমে বিল হচ্ছে না। সঙ্গে ডেকোরেটরের খরচ আছে। বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো সেই কবে থেকে হয়ে আসছে। ফলে, রীতি মেনে সব আয়োজনই করতে হয়। যতই সমস্যা হোক না কেন!”
লক্ষ্মীপুজোর আনন্দে মেতেছে দাসপুরও। এলাকার বিভিন্ন এলাকায় বারোয়ারি লক্ষ্মীপুজো হয়। দুর্গাপুজোর মতো কয়েক মাস আগে থেকেই চলে মণ্ডপ তৈরির কাজ। শনিবার থেকেই দাসপুরের খুকুড়দহ, সোনামুই,গৌরা, সাগরপুর-সহ বিভিন্ন এলাকায় মণ্ডপে ভিড়ও হচ্ছে। চন্দননগরের আলোয় ঝলমল করছে মণ্ডপ। প্রশাসন সূত্রের খবর, দাসপুর থানা এলাকায় ১২টি বারোয়ারি লক্ষ্মীপুজো হচ্ছে।
জেলার দাসপুরে দুর্গাপুজোর বেশ নামডাক রয়েছে। কোথাও উড়িষ্যার মন্দিরের আদলে কোথাও বা রাজবাড়ির আদলে তৈরি হয়েছে মণ্ডপ। চন্দননগরের আলোয় ফুটে উঠছে নেপালের ভূমিকম্প থেকে গ্রাম বাংলার হারিয়ে যাওয়া নানা সংস্কৃতি। যেমন খুকুড়দহ লক্ষ্মীবাজার পুজো কমিটি এবার ৫৬ বছরে পড়ল। আসাম থেকে বাঁশ কিনে এনে তৈরি করেছে মন্দিরের আদলে বড় মণ্ডপ।
সোনামুই হাট সবর্জনীন লক্ষ্মীপুজো কমিটি ৫৯ বছরে পা দিল। এবার এই পুজোর থিম সরনাথ মন্দির। খুকুড়দহ পুজো কমিটির সম্পাদক শক্তিপদ আদক বলেন, “এ বার আমরা স্বাস্থ্য মেলারও আয়োজন করেছি। নিখরচায় চিকিৎসা থেকে ওষধ পাবেন রোগীরা।” গৌরা সবর্জনীন রাজবাড়ির আদলে মন্ডপ তৈরি করেছে। দুর্গাপুজোর মতো একে অপরকে টেক্কা দিতে মণ্ডপ, আলো থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অভিনবত্ব এনেছে কমিটিগুলি। আবার দুর্গাপুজোর মতো মণ্ডপ, প্রতিমা, পরিবেশ-সহ নানা বিষয়ের পুরস্কার দিতে বিভিন্ন সংস্থাও মণ্ডপগুলিতে ভিড় করেন।
সূত্রের খবর, দাসপুরের একাধিক এলাকায় ফি বছর লক্ষ্মীপুজোর জন্যে অপেক্ষা করেন বাসিন্দারা। নতুন জামা কাপড় থেকে ভাল খাওয়া-দাওয়া লক্ষ্মীপুজোতেই পুষিয়ে নেন সাগরপুর, গৌরা থেকে খুকুড়দহের বাসিন্দারা। সোনামুই হাট সবর্জনীন পুজো কমিটির পক্ষে অজিত মণ্ডল বলেন, “বাঙালির সেরা পুজো দুর্গাপুজো। কিন্তু এখানে লক্ষ্মীপুজো হয় বেশ রমরমিয়ে। ফি বছরই পুজো উপলক্ষে মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে সেমিনার সবই থাকছে।”