স্কুলে হরেন্দ্রনাথবাবু। —নিজস্ব চিত্র।
অভাবকে সঙ্গী করেই তাঁর বড় হওয়া। আজ তিনি একজন জীবন যুদ্ধের জয়ী সৈনিক। যদিও জয়ও তাঁর চিন্তাভাবনা বদলাতে পারেনি। অর্থাভাবে যাতে কারও পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ না হয়ে যায়, সে জন্য তিনি গড়ে তুলেছেন গীতাঞ্জলি আশ্রম বিদ্যাপীঠ। ছোট মুখে হাসি ফোটাতে পেরে আজ খুশি বছর বাহাত্তরের প্রাক্তন শিক্ষক হরেন্দ্রনাথ মাইতি।
এগরা শহরের বাসিন্দা হরেন্দ্রনাথবাবু বর্তমানে একাধিক রোগে আক্রান্ত। ২০০৫ সালে শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৫ লক্ষ টাকা দিয়ে তিনি কিনে ফেলেন এক বিঘা জমি। চাকরিতে অবসর গ্রহণের পর ওই জমিতে নিজের টাকা দিয়ে একটি ঘরও তৈরি করেন তিনি। এরপর শুরু আসল লড়াই। এলাকার আদিবাসী, তফসিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত পরিবারের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিজের স্বপ্নের কথা বোঝানোর কাজ শুরু করেন তিনি। তাদের বাড়ির ছেলেমেয়েদের নিখরচায় পড়ার কথাও তিনি জানান।
প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে তিনি বোঝান, প্রতিদিন সকাল-সন্ধেয় ছেলেমেয়েদের আশ্রমে পাঠালেই চলবে। বই, টিফিন, পড়ার খরচ, আঁকার সরঞ্জাম সবই দেবেন তিনিই। প্রথমে তেমনভাবে কেউ হরেন্দ্রবাবুর আবেদনে সাড়া দেয়নি। তবে আস্তে আস্তে অবস্থা বদলায়। নতুন যুদ্ধে হরেন্দ্রবাবুর পাশে দাঁড়ান প্রাক্তন সরকারি কর্মীর স্ত্রী গৌরীদেবী, একমাত্র ছেলে ‘ওএনজিসি’র ভূতাত্ত্ববিদ কল্লোলবাবু, এমনকী শিক্ষিকা মেয়ে মীনাক্ষীরও। তাঁদের কথায়, ‘‘আমরা সব দিক থেকে তাঁর পাশে আছি। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এ ভাবে ব্যক্তিগত পরিসরে সাধ্যমতো কিছু করা উচিত।” এখন আশেপাশের তফসিলি জাতি-উপজাতির পরিবারগুলি থেকে নিয়মিত আসে কমপক্ষে ২০-২২ জন শিক্ষার্থী পড়তে আসে আশ্রমে।
প্রতিদিন সকাল-সন্ধেয় সাইকেল চালিয়ে বাড়ি থেকে প্রায় দু’কিলোমিটার দূরে আশ্রমে যান হরেন্দ্রনাথবাবু। নামমাত্র পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তাঁকে সহযোগিতা করতে আসেন স্থানীয় দুই শিক্ষিতা বধূ শিবানী শীট ও মিতা গিরি। তাঁরা বলেন, “উনি আমাদের পরিবারের পাশে রয়েছেন। আমরা তাঁর পাশে না থাকলে অধর্ম হবে।”
খাঁদি হাঁসদা, গুণাধর নায়েকরা বলেন, “আমরা সারাদিন মাঠে বা অন্যের বাড়িতে কাজে চলে যাই। নিজেরা লেখাপড়া জানি না। কারও কাছে পড়ানোরও সামর্থ্য নেই। ছেলে-মেয়েরা পড়ছিল না। ওরা যা শিখছে তা স্যারের জন্যই।” হরেন্দ্রনাথবাবুর মুখে অবশ্য একটাই কথা, ‘‘এরা শিক্ষিত হয়ে মানুষ হলে তবেই না আমরা শিক্ষিত মানুষ।”