ধান কাটার ব্যস্ততা মেদিনীপুরের কনকাবতীতে। নিজস্ব চিত্র।
ধান উঠেছে বেশ কিছু দিন হল। তবে দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। সরকার নির্ধারিত মূল্য থেকে কুইন্টাল প্রতি সাড়ে চারশো থেকে পাঁচশো টাকা কম দামে ফোড়েদের কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা।
এই পরিস্থিতিতে আজ, শুক্রবার আনুষ্ঠানিক ভাবে পশ্চিম মেদিনীপুরে সহায়ক মূল্যে ধান কেনা শুরু করছে সরকার। লালগড়ের বৈতা ও ঝাড়গ্রামের সেবায়তনের কাছে যমনিকাটাতে ধান কেনার শিবিরের উদ্বোধন করতে আসছেন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। তবে এ দিন নেহাতই আনুষ্ঠানিক ধান কেনা হবে। জেলার অন্যত্র শিবির শুরু হতে আরও দিন পনেরো লাগবে। জেলা খাদ্য নিয়ামক পার্থপ্রতিম রায় জানান, ১ ডিসেম্বর থেকে আগামী অগস্ট মাস পর্যন্ত টানা স্থায়ী শিবির করা হবে। কিন্তু এর মধ্যে তো অভাবী বিক্রি আরও বাড়বে। সঙ্কটে পড়বেন চাষিরা।
প্রশাসনিক কর্তাদের দাবি, সবে ধান কাটা শুরু হয়েছে। মাঠ থেকে ধান তোলার পর তা ঝেড়ে বিক্রি করেন চাষিরা। ফলে সমস্যা হবে না। বাস্তবটা অবশ্য সর্বত্র তা নয়। জেলার যে বিস্তীর্ণ এলাকায় ধান কেটে আলু চাষ হয়, সেখানে বেশিরভাগ জমি থেকেই ধান উঠে গিয়েছে অনেক দিন। কারণ, ধান কাটার পরেই সেই জমিতে আলুর বীজ বোনা হয়। আর এই সময় গরিব চাষিদের ঠিক দামে ধান বিক্রির প্রয়োজন হয় বেশি। কারণ, তাঁরা ধান বিক্রি করে আলু বীজ ও সার কেনেন। যাঁরা একটু সম্পন্ন চাষি তাঁরা দাম বৃদ্ধির আশায় ধান বাড়িতে রাখতে পারেন। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের পক্ষে তা রাখা সম্ভব নয়। ফলে, কম দামে ধান বিক্রিতে বাধ্য হন তাঁরা। জেলা খাদ্য দফতরের এক আধিকারিকও মানছেন, এটা ঠিক যে, সরকার সহায়ক মূল্যে ধান কেনা শুরু না করায়, ফড়েরা নিজেদের খুশি মতো দামে ধান কিনছে।
খোলাবাজারে ধানের দাম কত?
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, সাধারণ ধান বিক্রি হচ্ছে কুইন্টাল প্রতি ৮৩০ থেকে সাড়ে ৮০০ টাকায়। আর সরু ধান বিক্রি হচ্ছে ৯৭০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা কুইন্টাল। অথচ সরকার নির্ধারিত সহায়ক মূল্য সাধারণ ধানের ক্ষেত্রে কুইন্টাল প্রতি ১৪১০ টাকা ও সরু ধানের ক্ষেত্রে সাড়ে ১৪০০ টাকা। ব্লকে ব্লকে যে স্থায়ী শিবির করা হবে সেখানে ধান বিক্রি করলে কুইন্টাল প্রতি আরও ১৫ টাকা বেশি দাম মিলবে। পরিবহণ খরচ বাবদ চাষিদের এই বাড়তি টাকা দেওয়া হবে। ধান কিনবে ইসিএসসি।
এই সব সুবিধা পেতে জেলার চাষিদের অপেক্ষা করতে হবে সেই ডিসেম্বরের গোড়া পর্যন্ত। কিন্তু অনেক চাষিই তার আগে ধান বিক্রিতে বাধ্য হচ্ছেন। মেদিনীপুর সদর ব্লকের নেপুরা গ্রামের চাষি রঞ্জিত পাত্রের কথায়, “লালস্বর্ণ এক হাজার টাকা কুইন্টালে বিক্রি করছি। আর সাধারণ ধান বড় জোর সাড়ে ৮০০ টাকা কুইন্টাল। সরকার সব জেনেও যদি আগে থেকে সহায়ক মূল্যে ধান কেনা শুরু না করে তাহলে তো আমাদের ক্ষতি হবেই।’’ তিনি আরও জানালেন, এক বিঘে ধান চাষ করতে প্রায় ৪২০০ টাকা খরচ। সাড়ে ৫ কুইন্টালের বেশি ফলন হয় না। ফলে, ধানের দাম না চড়লে চাষির কপাল পুড়বেই। আর এক চাষি বনমালী বেরারও এক বক্তব্য। তাঁর কথায়, “প্রতি বছরই বাধ্য হয়ে কম দামে ফড়েদের কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হই। সরকার তা জেনেও ধান কেনার শিবির করতে দেরি করে।
ফড়েদের দামেও নানা রকমফের রয়েছে। দাম ৯০০ টাকা কুইন্টাল বলা হলেও সব ক্ষেত্রে চাষিকে তা দেওয়া হচ্ছে না। ধান নিয়ে যাওয়ার পরে তাতে রস বেশি রয়েছে বলে দাম দিচ্ছে কম। চন্দ্রকোনার চাষি সিরাজুল খান বলেন, “ধান কেটে মাঠে ফেরে রেখেছি। রোদে শুকিয়েছে। ধান ঝাড়ার ৭-৮দিন পর বিক্রি করছি। তবু বলছে, ধানে রস বেশি। সরকার ধান না কেনায় আমাদের ঠকতে হচ্ছে।’’
পরিত্রাণের আশায় সকলেই এখন তাকিয়ে কবে সহায়ক মূল্যে ধান কেনা শুরু হবে সে দিকে। প্রশাসন জানিয়েছে, ২৭ নভেম্বর এ নিয়ে জেলায় বৈঠক রয়েছে। বৈঠকেই সিদ্ধান্ত হবে কী ভাবে জেলা জুড়ে শিবির করে ধান কেনা শুরু হবে। ১ ডিসেম্বর থেকেই শুরু হবে ধান কেনা।